https://www.prothomalony.com/
18428
new-york
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এখন নির্বাচনের বাজার গরম। সোসাইটির ভোট নিয়ে কত ব্যস্ততা, কত হিসাব-নিকাশ, কত দরদ! কে কার প্যানেলে, কে কার প্রতিপক্ষ। এছাড়াও কে কাকে বিমানবন্দরে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেন, আর কে সেই প্রশ্নের প্রতিবাদে দুই কথা বলবেন —এসব নিয়ে আমাদের ঘুম নেই। ফেসবুক সরগরম, অভিনন্দন, নিন্দা আর বিবৃতির বন্যা। প্রতিবাদের মহড়া। কমিউনিটির নেতৃত্ব নিয়ে আমাদের এতই মাথাব্যথা যে, সেই নেতৃত্বের কাছে মানুষের প্রত্যাশা কী, সে প্রশ্ন তোলার ফুরসত নেই।
এই কোলাহলের মধ্যে একটি নাম মনে পড়ে। উইন রোজারিও।
উইনও আমাদের সন্তান। মানসিক সংকটে থাকা এক তরুণ। সাহায্যের জন্য পুলিশ ডাকা হয়েছিল। পুলিশের কাজ ছিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, একজন বিপর্যস্ত তরুণকে নিরাপদ রাখা। অথচ মায়ের চোখের সামনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ গেল ছেলেটির। যে সাহায্যের জন্য ফোন করেছিল, সেই সাহায্যই শেষ পর্যন্ত মায়ের বুক খালি করে দিল।
একজন মা নিজের সন্তানকে বাঁচাতে সাহায্য চেয়েছিলেন। সেই সাহায্যের পরিণতি কী হয়েছে, তা নিয়ে আজও তাঁকে লড়তে হচ্ছে। এর চেয়ে নির্মম পরিহাস আর কী হতে পারে!
ঘটনাটি ঘটেছে নিউইয়র্কে। আমাদেরই বসবাসের শহরে। অথচ আমাদের কমিউনিটির কোলাহলে উইন রোজারিও যেন এক অনাহূত নাম। তাঁকে নিয়ে ভোট নেই, প্যানেল নেই, প্রচারণার ব্যানার নেই। তাঁকে ঘিরে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাও নেই। যেন একজন তরুণের মৃত্যু আর একজন মায়ের বিচারপ্রার্থনা আমাদের কমিউনিটির কোনো বিষয়ই নয়।
নিউইয়র্ক সিটির সিভিলিয়ান কমপ্লেইন্ট রিভিউ বোর্ড (সিসিআরবি) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের অভিযোগ এনেছে। টেজার ব্যবহারকারী কর্মকর্তা সালভাতোর আলংগি বিভাগীয় বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই অবসরে গেছেন। পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ এ ঘটনাকে ‘মানবিক ত্রুটি’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। আরেক কর্মকর্তা মাথিউ চিয়ানফ্রোকো এখনো চাকরিতে বহাল। তাঁর বিভাগীয় বিচারের তারিখও নির্ধারিত হয়নি।
অবশ্যই, অভিযোগ আর চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ এক বিষয় নয়। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা, জবাবদিহির এই দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কোথায়?
একজন পুলিশ কর্মকর্তা অবসরে চলে গেলেন। আরেকজন চাকরিতে বহাল রইলেন। মাঝখানে পড়ে রইল একটি প্রাণহানির ঘটনা, এক মায়ের কান্না আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষা।
একটি প্রশ্ন খুব সাধারণ: বিচার চাইতে একজন শোকার্ত মাকে কেন বারবার সংবাদ সম্মেলন করতে হবে? কেন তাঁকে সিটি হলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশাসনকে তার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিতে হবে? কেন তাঁর সন্তানের মৃত্যুর প্রশ্নটি বাঁচিয়ে রাখার দায়ও তাঁকেই বহন করতে হবে?
আমাদের কমিউনিটির নেতারা কোথায়?
আমরা তো নেতার অভাবে ভুগি না। সংগঠনের অভাব নেই, পদ-পদবির অভাব নেই, উপদেষ্টা আর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকেরও অভাব নেই। নির্বাচনের সময় সবাই জনদরদি। সবাই কমিউনিটির অভিভাবক। মানুষের অধিকার রক্ষায় সবাই আপসহীন। অথচ একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণের মৃত্যুর বিচারপ্রক্রিয়া যখন প্রশ্নের মুখে, তখন সেই অভিভাবকদের কণ্ঠ এত ক্ষীণ কেন?
উইন রোজারিও কি আমাদের কমিউনিটির সন্তান নয়? তাঁর মায়ের কান্না কি আমাদের কান্না নয়? নাকি এ নিয়ে একটি সন্তানহারা পরিবারের দুঃখের কোনো মূল্য নেই আমাদের কাছে ! সেই দুঃখ নিয়ে রাজনীতি করতেও আমাদের অনীহা?
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, সংগঠনের নির্বাচন আর পুলিশের জবাবদিহি এক বিষয় নয়। ঠিক কথা। কিন্তু যে সংগঠন মানুষের অধিকার, মর্যাদা আর কল্যাণের কথা বলে, তার কাছে সব অন্যায়ের বিচার চাওয়া না হোক, অন্তত একজন বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা কি করা যায় না? একটি বিবৃতি, একটি সংহতি সমাবেশ, পরিবারের পাশে থেকে কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দাবি—এতটুকুও কি অসম্ভব?
ড্রামসহ কিছু মানবাধিকার সংগঠন পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের ভূমিকা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্নটি বৃহত্তর বাংলাদেশি কমিউনিটিকে নিয়ে। আমাদের সামাজিক সংগঠন, নির্বাচনী প্যানেল, পরিচিত মুখ আর কথিত নেতৃত্ব—তাঁরা কোথায়?
আমরা বিমানবন্দরের একটি প্রশ্ন নিয়ে দিনের পর দিন তর্ক করতে পারি। কে কাকে অপমান করলেন, কে কার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলেন, কে কার পাশে দাঁড়ালেন—এসবের চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে। অথচ একটি পরিবারের বিচারপ্রার্থনার পাশে দাঁড়ানো নিয়ে আমাদের এত নীরবতা কেন?
একজন মায়ের সন্তানকে কারা কীভাবে কেড়ে নিল, সেই ঘটনার জবাবদিহি নিয়ে কি তার সামান্য অংশও আগ্রহ আছে?
সোসাইটির সভাপতি হবেন কে, সেই চেয়ারে বসে কী করবেন—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা মানুষের বিপদের সময়। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কমিউনিটির সেবা করার ঘোষণা দেওয়া সহজ। একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াই কঠিন।
আমরা কেমন কমিউনিটি গড়ছি? আমাদের নেতৃত্ব কাদের জন্য? আর মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে না পারলে এত সংগঠন, এত পদ-পদবি, এত নির্বাচনী আয়োজনের অর্থ কী? উইন রোজারিওর জন্য ন্যায়বিচার চাই। তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। একজন সন্তানহারা মায়ের পাশে দাঁড়ানোর জন্য শুধু মানুষ হতে হয়।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন