https://www.prothomalony.com/
18426
new-york
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:১০
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক উৎসাহ ও প্রত্যাশা। দীর্ঘদিন পর দলের শীর্ষ নেতাকে কাছ থেকে দেখা, প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে গণসংবর্ধনার আয়োজন এবং বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণার আশায় ছিলেন নেতাকর্মীরা। কিন্তু সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে যাওয়ার পর সেই প্রত্যাশা রূপ নিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভে। প্রত্যাশিত সংবর্ধনা, সরাসরি সাক্ষাৎ কিংবা সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ঘোষণা না আসায় প্রবাসী নেতাকর্মীদের একটি অংশ নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতাকর্মীদের কাছে এবারের সফর ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা, নতুন কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা এবং প্রবাসে দলের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার প্রত্যাশার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল, নিউইয়র্কে অবস্থানকালে তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাংগঠনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি খোঁজখবর নেবেন এবং দীর্ঘদিনের কমিটি সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো নির্দেশনা দেবেন। তবে সফরকালে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা না আসায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে।
প্রবাসী বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আন্দোলন, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সমাবেশ ও আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের নানা কর্মসূচিতে তাঁরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বছরের পর বছর রাজপথে থেকেছেন অনেকে। সেই নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ আশা করেছিলেন, সরকারপ্রধান হিসেবে নিউইয়র্কে এসে তাঁদের সঙ্গে অন্তত একবার মতবিনিময় করবেন। এতে যেমন দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দূরত্ব কমত, তেমনি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও নতুন দিকনির্দেশনা পাওয়া যেত।
নিউইয়র্ক সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে গণসংবর্ধনার আয়োজন না হওয়াও নেতাকর্মীদের আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। অতীতে বাংলাদেশ থেকে আসা বিভিন্ন সরকারপ্রধানের সম্মানে নিউইয়র্কে প্রবাসীদের উদ্যোগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে প্রবাসী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বাংলাদেশিরা অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এবারও তেমন একটি আয়োজনের প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে মনে করছেন অনেক প্রবাসী।
এদিকে সফরকালে নিউইয়র্কে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন না হওয়ার বিষয়টিও প্রবাসী মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অতীতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আসা বাংলাদেশের সরকারপ্রধানদের অনেকেই স্থানীয় বাংলা সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় বা সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। এসব আয়োজনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রবাসীদের সমস্যা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছেন সাংবাদিকেরা।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরের সঙ্গে তুলনা টেনে প্রবাসী সাংবাদিকদের একটি অংশ বলছেন, সরকারপ্রধানের সফরে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ না থাকলে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নই অনুত্তরিত থেকে যায়। বিশেষ করে প্রবাসীদের অধিকার, বিনিয়োগ, দূতাবাসের সেবার মান, ভোটাধিকার এবং বাংলাদেশের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্ক জোরদারের মতো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান সরাসরি জানার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নেতাকর্মীদের সরাসরি সাক্ষাৎ না হওয়ার পেছনে ভিন্ন একটি কারণের কথাও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, নিউইয়র্কে অবস্থানকালে তারেক রহমানের প্রবাসী নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ ছিল। কিন্তু হোটেলের লবিতে তাঁকে ঘিরে ছবি তোলার প্রতিযোগিতা, বিশৃঙ্খল চলাফেরা এবং একে অপরকে ধাক্কাধাক্কির মতো পরিস্থিতি দেখে তিনি শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তবে এ দাবির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা তাঁর সফরসঙ্গীদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে সাক্ষাৎ বাতিলের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেতাকর্মীদের একাংশের মতে, প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা ও নির্ধারিত কর্মসূচির বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে ছবি তোলার জন্য অতিরিক্ত ভিড় তৈরি করা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। বিশেষ করে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে আসা সরকারপ্রধানের হোটেলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্যও তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক নেতার প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলা এবং দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখা জরুরি।
অন্যদিকে নেতাকর্মীদের আরেকটি অংশ মনে করছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কারণে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া দুঃখজনক। তাঁদের যুক্তি, পূর্বনির্ধারিত স্থান, নির্দিষ্ট সময় এবং সাংগঠনিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সীমিত পরিসরেও একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা যেত। এতে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেই দীর্ঘদিনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতো।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তাও এ সফরের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে দলটির যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতৃত্ব নিয়ে প্রত্যাশা ও প্রতিযোগিতা রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সাংগঠনিক দায়িত্ব পাওয়ার আশায় সক্রিয় থাকলেও নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসায় তাঁদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। অনেকের ধারণা ছিল, তারেক রহমানের সফরের মধ্য দিয়ে এ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে। কিন্তু সফর শেষেও কমিটি নিয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় বিষয়টি আবারও অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঝুলে গেল বলে মনে করছেন তাঁরা।
তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেবল প্রবাসী নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণের নিরিখে মূল্যায়ন করতে নারাজ অনেকে। তাঁদের মতে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ ছিল একটি রাষ্ট্রীয় সফর। সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সহযোগিতাই প্রধান অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা।
উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি। সফরকালে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্ক ত্যাগ করে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন তিনি।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন