https://www.prothomalony.com/
18386
opinion
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লাগানোর ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি প্রতিকৃতি বিকৃত করা সম্ভব, দেয়ালে আঁকা ছবি কালিতে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাংলা সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি ও মানুষের মননে রবীন্দ্রনাথ যে স্থায়ী আসন তৈরি করেছেন, তা কি এভাবে মুছে ফেলা যায়?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু একজন কবি নন; তিনি বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও চিন্তার জগতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও গানে তাঁর সৃষ্টিশীলতার যে বিস্তার, তা বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর সাহিত্য নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, তাঁর চিন্তার সমালোচনাও হতে পারে। সময়ের পরিবর্তনে ইতিহাসের ব্যক্তিত্বদের নতুনভাবে মূল্যায়ন করাও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতভেদ প্রকাশের পথ হওয়া উচিত যুক্তি, আলোচনা ও মুক্তচিন্তার চর্চা—সৃষ্টিকে বিকৃত করা নয়।
মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, ইতিহাসের কোনো ব্যক্তিত্বকে নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু কালি দিয়ে কোনো সাহিত্যিকের অবদান মুছে ফেলা যায় না। কোনো ব্যক্তির চিন্তা বা আদর্শের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে, সেই দ্বিমত প্রকাশের ভাষা কি তাঁর প্রতিকৃতি বিকৃত করা হতে পারে?
রবীন্দ্রনাথকে ভালো লাগতেই হবে, তাঁর প্রতিটি চিন্তার সঙ্গে একমত হতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একজন পাঠক তাঁর কোনো লেখা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, তাঁর দর্শনের সমালোচনা করতে পারেন, এমনকি তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে পাঠে, গবেষণায়, যুক্তিতে ও মুক্ত আলোচনায়। কোনো প্রতিকৃতিতে কালি লাগিয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করা যায় না; বরং এমন আচরণ ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতারই প্রকাশ ঘটায়।
একটি সুস্থ সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের মত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মানও জরুরি। সংস্কৃতি কোনো একটি গোষ্ঠী বা মতাদর্শের একক সম্পত্তি নয়। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা মানুষের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও ইতিহাসের অংশ। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়, তার সমালোচনা করা যায়; কিন্তু বিকৃতির মাধ্যমে তাকে অস্বীকার করার চেষ্টা সমাজকে আরও সংকীর্ণ করে তোলে।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্ক থাকলে তা হোক তাঁর সাহিত্য, দর্শন, চিন্তা ও ঐতিহাসিক অবস্থানকে ঘিরে। তাঁর লেখা পড়ে, তাঁর বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এবং তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেই নিজের অবস্থান তুলে ধরা সম্ভব। এটাই মুক্তবুদ্ধির চর্চা, এটাই সাংস্কৃতিক দায়িত্বশীলতা।
দেয়ালে কালি লাগানো যায়, প্রতিকৃতি বিকৃত করা যায়, বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলা যায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি ও মননে যে সাহিত্য জায়গা করে নিয়েছে, তাকে মুছে ফেলা এত সহজ নয়। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে মূল্যায়ন করবে সময়, পাঠক ও ইতিহাস। কোনো দেয়ালে কালির দাগ তাঁর সৃষ্টির আলো নিভিয়ে দিতে পারবে না।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন