https://www.prothomalony.com/

18239

science-tech

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

নিরাপত্তা পরিষদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিতর্ক: নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত বিশ্বশক্তি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:২১

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভাষণ দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতারা—ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও হাগিং ফেস। তাঁরা এই উদীয়মান প্রযুক্তির সম্ভাবনা যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি তুলে ধরেছেন এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকির দিকগুলোও। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত এই প্রযুক্তি নিয়ে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ঠিক কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে পরিষদের সদস্যদের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গেছে।

অধিকাংশ দেশ মনে করে, দ্রুত বিকশিত হতে থাকা এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটা ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এর বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। অগ্রবর্তী সুপারইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তিতে নিজেদের নেতৃত্বের দাবি করে দেশটির প্রতিনিধি এ বিষয়ে কোনো আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই প্রযুক্তির আরেক শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী চীন অবশ্য ভিন্ন সুরে কথা বলেছে—দেশটি সতর্ক করে দিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন কেবল ধনী দেশগুলোর খেলায় পরিণত না হয়।

মতভেদ থাকলেও একটি জায়গায় প্রায় সব বক্তা একমত হয়েছেন—শিল্পক্ষেত্রের প্রতিনিধিরাসহ অনেকেই এই প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন, পাশাপাশি এর অব্যাহত ও দ্রুতগতির বিকাশের মধ্যেও স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন।

আলোচনায় লাইবেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি লুইস গার্সিডাহ ব্রাউন দ্বিতীয় এক তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, মানবজাতির সবচেয়ে বড় রূপান্তরগুলো কখনোই একা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না—সক্ষমতার প্রতিটি মৌলিক লাফের সঙ্গে সমান তালে প্রয়োজন হয় শাসনব্যবস্থারও একটি লাফ।

১৯৪৫ সালে যাঁরা জাতিসংঘের জন্ম দিয়েছিলেন, তাঁরা নিউরাল নেটওয়ার্ক বা অগ্রবর্তী কম্পিউটিং মডেলের কথা কল্পনাও করতে পারেননি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে তাঁর মতে, যুদ্ধের ধরন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নতুন রূপ দিতে সক্ষম যেকোনো প্রযুক্তিই আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা এই পরিষদের মূল এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে।

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কোনো পদ্ধতিগত ব্যর্থতা বা বিপর্যয়কর ভুল হিসাব-নিকাশ ঘটে যাওয়ার আগেই সম্মিলিত সুরক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে বিশ্ব সম্প্রদায়কে। তাঁর হুঁশিয়ারি—আজকের দ্বিধার মূল্য যেন আগামী দিনের বিপর্যয়ে রূপ না নেয়। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং বিপজ্জনক আত্মতুষ্টি—উভয় প্রান্তিকতা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উন্নত কম্পিউটিং যখন বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর সাইবার হামলা, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা কিংবা ভূকৌশলগত প্রতিযোগিতার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তা সরাসরি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষায়, পরিষদের এই সম্পৃক্ততা কোনো পুনরাবৃত্তি নয়—এটি সংঘাত প্রতিরোধের একটি পদক্ষেপ।

চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি ফু চোং প্রযুক্তি খাতে ‘সংকীর্ণ পক্ষ-বিপক্ষ শিবির’ গড়ে তোলার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন, যা তাঁর ভাষায় নির্দিষ্ট কিছু বৃহৎ শক্তির একচেটিয়া আধিপত্যের মাধ্যমে নিজেদের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার প্রচেষ্টা মাত্র। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা শুধু বৈশ্বিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করে না—বিশেষত ছোট দেশগুলোর জন্য—বরং প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের বিভাজন ও সিস্টেমগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেই গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলে।

সব দেশকে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা, উন্মুক্ত সোর্স বাস্তুতন্ত্র প্রসারিত করা এবং বৈশ্বিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো—বিশেষত বড় প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো—নিজেদের দায়বদ্ধতা পালন করবে, ভুল তথ্য ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য ছড়ানো রোধ করবে এবং আইন ও জনসাধারণের তদারকির আওতায় নিজেদের সমর্পণ করবে বলেও তিনি প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।

তাঁর ভাষায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির সম্মিলিত সম্পদ, এটি ধনী দেশ কিংবা ধনী মানুষের খেলায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। বৈশ্বিক এআই গভর্ন্যান্সের জন্য নিজ দেশের একটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরে অন্য দেশগুলোকে তাতে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানান তিনি।

জাতিসংঘের ডিজিটাল ও উদীয়মান প্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ দূত অমনদীপ সিং গিল বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রবল গতিতে এগিয়ে চলেছে, বদলে দিচ্ছে সমাজ ও অর্থনীতির চেহারা। বৈশ্বিক আহ্বায়ক ক্ষমতার সুবাদে জাতিসংঘ এই নতুন প্রযুক্তির বৈশ্বিক শাসনকাঠামো গঠনে ক্রমেই সম্পৃক্ত হচ্ছে।

এ পর্যন্ত জাতিসংঘের গৃহীত কয়েকটি উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে—২০২৩ সালে গঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা পরিষদ; ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট, যা ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআই পরিচালনায় বৈশ্বিক সহযোগিতার একটি ব্যাপক কাঠামো; এবং ২০২৫ সালে গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল, যা বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া শক্তিশালী করতে এবং বৈশ্বিক আলোচনাগুলো যেন সর্বোত্তম প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করতে গঠিত হয়েছে।

জাতিসংঘের গ্লোবাল অ্যাডভোকেট ও অভিনেতা জোসেফ গর্ডন-লেভিট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের প্রতি জবাবদিহি রাখতে কঠোরতর বিধিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। শিশুদের ওপর এই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং মানুষের মনোযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে আরো পড়ুন