https://www.prothomalony.com/
18214
science-tech
প্রশ্ন, প্রমাণ ও সংশোধনের সামাজিক অবকাঠামো
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:২৬
১৬৩৩ সালের জুন। রোমে ইনকুইজিশনের সামনে দাঁড়িয়েছেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল সূর্যকেন্দ্রিক মতের সমর্থন, পৃথিবী স্থির নয়, তা গতিশীল। তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং পরে গৃহবন্দী রাখা হয়। গ্যালিলিওর ঘটনা শুধু একজন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত পরিণতির গল্প নয়; এটি জ্ঞান, প্রমাণ এবং প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের সম্পর্ক নিয়েও একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা।
তবে ঘটনাটিকে শুধু 'বিজ্ঞান বনাম ধর্ম' কিংবা 'প্রশ্ন বনাম নিষেধাজ্ঞা'র সরল গল্পে নামিয়ে আনা যায় না। সেই সময়ের ধর্মীয় কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রচলিত জ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক বিতর্ক—সব মিলেই তৈরি হয়েছিল সংঘাতটি। তবু একটি শিক্ষা স্পষ্ট: প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে পরীক্ষা করার সুযোগ সংকুচিত হলে নতুন জ্ঞান তৈরির পথও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিজ্ঞান কেবল সূত্র, যন্ত্র কিংবা গবেষণাগারের সমষ্টি নয়। এটি প্রশ্ন করার, অনুমান গড়ার, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করার, প্রমাণ যাচাই করার এবং প্রয়োজন হলে নিজের সিদ্ধান্ত সংশোধন করার একটি পদ্ধতি। তাই বিজ্ঞানের শক্তি শুধু বিজ্ঞানীর মেধায় নয়; এর পেছনে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে প্রশ্ন করা যায়, ভুল স্বীকার করা যায় এবং প্রমাণের কাছে নিজের ধারণা বদলানো যায়।
বিজ্ঞানের ইতিহাস তাই শুধু আবিষ্কারের ইতিহাস নয়; প্রশ্নেরও ইতিহাস। কোন প্রশ্ন করা হবে, কোন পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কোন প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হবে এবং পুরোনো ব্যাখ্যা কখন সংশোধন করা হবে—এসবের মধ্য দিয়েই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিকশিত হয়েছে।
উনিশ শতকের লন্ডনের কলেরা-সংকট তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৮৫৪ সালের প্রাদুর্ভাবের সময় চিকিৎসক জন স্নো রোগের বিস্তারের সঙ্গে পানির উৎসের সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান করেন। আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তিদের অবস্থান মানচিত্রে চিহ্নিত করে তিনি ব্রড স্ট্রিটের একটি পানির পাম্পের সঙ্গে রোগের বিস্তারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখতে পান। প্রচলিত 'দূষিত বায়ু' ধারণার বাইরে গিয়ে তথ্যের ভিতর থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা খোঁজার এই চেষ্টা আধুনিক মহামারিবিদ্যার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শুধু স্নোর সিদ্ধান্ত নয়; তার পদ্ধতি—প্রশ্ন, তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ, তুলনা এবং প্রচলিত ব্যাখ্যাকে পরীক্ষা। বিজ্ঞান এভাবেই নিজের ভিতরে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে। নতুন প্রমাণ পুরোনো ধারণাকে দুর্বল করতে পারে, আবার পুরোনো ধারণাকেই নতুন প্রমাণ আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিজ্ঞানের শক্তি এখানেই—সে কোনো সিদ্ধান্তকে শুধু প্রতিষ্ঠিত বলে সত্য ধরে রাখে না।
প্রশ্নহীনতা এই জায়গাতেই বিজ্ঞানের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কোনো সমাজ যদি ধরে নেয়, 'যা প্রচলিত, সেটিই সত্য' কিংবা 'যা বলা হয়েছে, তা যাচাই করার প্রয়োজন নেই', তাহলে নতুন প্রশ্নের জায়গা সংকুচিত হয়। আর প্রশ্নের জায়গা সংকুচিত হলে প্রমাণের প্রয়োজনও ধীরে ধীরে কমে আসে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু প্রবণতা এ ক্ষেত্রে ভাবার মতো। পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবেশে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে 'কেন' প্রশ্নের চেয়ে পরীক্ষায় 'কী লিখতে হবে'—এই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে শিক্ষা কখনো কখনো অনুসন্ধানের বদলে তথ্য মনে রাখার অনুশীলনে সীমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। অথচ বিজ্ঞান শুধু জানা তথ্যের পুনরাবৃত্তি চায় না; জানতে চায় তথ্যটি কীভাবে জানা গেল, তার প্রমাণ কী এবং অন্য ব্যাখ্যার সম্ভাবনা কোথায়।
প্রশ্নের সংস্কৃতির আরেকটি পরীক্ষা এখন ডিজিটাল জনপরিসরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের গতি বেড়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে 'রিউমর স্ক্যানার' ৩ হাজার ২১০টি অপতথ্যের ঘটনা শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু তথ্যের সংকট নয়; তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস ও উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করার সংস্কৃতিরও প্রশ্ন তোলে।
তবে অপতথ্যের বিস্তারকে শুধু মানুষের অজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমরা কীভাবে তথ্য গ্রহণ করি, কোন উৎসকে বিশ্বাস করি এবং নিজের পূর্বধারণার সঙ্গে মিললে কোনো তথ্যকে কত সহজে সত্য বলে মেনে নিই। বিজ্ঞান এখানে একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়: কোনো তথ্য আমার বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে কি না, সেটি তার সত্যতার মানদণ্ড নয়; প্রমাণ কী বলছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম পার্থক্য জরুরি। বিজ্ঞান মানে সবকিছুকে সন্দেহ করা নয়। বৈজ্ঞানিক সংশয় এবং ভিত্তিহীন অস্বীকার এক জিনিস নয়। পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কোনো দাবিকে গ্রহণ না করা বৈজ্ঞানিক সংশয়ের অংশ। কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণ থাকার পরও শুধু পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করা বৈজ্ঞানিক সংশয় নয়। বিজ্ঞান প্রশ্ন করে, কিন্তু সেই প্রশ্নকে প্রমাণ ও পদ্ধতির পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেয়।
অর্থাৎ, প্রশ্ন করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন প্রশ্নের শৃঙ্খলা। একটি প্রশ্ন করলেই তা বিজ্ঞান হয়ে যায় না। বিজ্ঞানের পথ হলো—প্রশ্ন, অনুমান, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, প্রমাণ, বিশ্লেষণ, যাচাই এবং সংশোধন। প্রশ্নের স্বাধীনতা এবং পদ্ধতির শৃঙ্খলা—দুটির সমন্বয়েই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তৈরি হয়।
এখানেই আসে বিজ্ঞানের সামাজিক অবকাঠামোর প্রশ্ন। একজন গবেষককে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দেওয়া হলো, কিন্তু তিনি যদি প্রয়োজনীয় তথ্য না পান, গবেষণার অর্থায়ন না পান, ফলাফল প্রকাশের সুযোগ না পান, ভিন্নমত প্রকাশে ভয় পান কিংবা তার গবেষণা স্বাধীনভাবে যাচাই করা না যায়, তাহলে শুধু ব্যক্তিগত কৌতূহল দিয়ে বিজ্ঞান শক্তিশালী হয় না।
তাই বিজ্ঞানচর্চার সামাজিক অবকাঠামো বলতে শুধু গবেষণাগার বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীন চিন্তার পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা, তথ্য পাওয়ার সুযোগ, গবেষণার স্বাধীনতা, সমালোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ, গবেষণার অর্থায়ন, ফল প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভুল সংশোধনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। বিজ্ঞানীর হাতে আধুনিক যন্ত্র থাকতে পারে; কিন্তু প্রশ্ন করার পরিবেশ না থাকলে সেই যন্ত্রের ক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায়।
প্রশ্ন করার সংস্কৃতি শুরু হয় আরও আগে—পরিবার ও বিদ্যালয়ে। একটি শিশু যখন জিজ্ঞাসা করে, 'আকাশ নীল কেন?' কিংবা 'এটা সত্যি—আমরা কীভাবে জানি?'—তখন তার প্রশ্নকে বিরক্তি হিসেবে না দেখে জ্ঞানচর্চার সূচনা হিসেবে দেখা দরকার। সব প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকাও সমস্যা নয়। বরং কখনো কখনো সবচেয়ে সৎ এবং বৈজ্ঞানিক উত্তর হতে পারে—'আমি জানি না, চলো দেখি।'
কারণ বিজ্ঞান সবকিছুর উত্তর জানা থাকার নাম নয়। বরং কোনো উত্তরকে চূড়ান্ত মনে না করে নতুন প্রমাণের জন্য উন্মুক্ত থাকার নামও বিজ্ঞান। এই কারণেই প্রশ্নহীনতা শুধু জ্ঞানচর্চার সমস্যা নয়; এটি আত্মসংশোধনের সমস্যাও। যে সমাজ নিজের ধারণাকে পরীক্ষা করতে চায় না, সে সমাজ ভুল ধারণাকেও দীর্ঘদিন সত্য বলে ধরে রাখতে পারে। আর যে সমাজ প্রশ্ন, সমালোচনা ও প্রমাণের জন্য জায়গা তৈরি করে, সে সমাজ নিজের ভুল থেকে শেখার সুযোগ পায়।
বিজ্ঞানকে শক্তিশালী করার কাজ তাই শুধু বড় গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্র কিংবা বেশি বিজ্ঞানী তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসব অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে প্রশ্ন করা অসম্মান নয়, 'আমি জানি না' বলা দুর্বলতা নয়, ভুল স্বীকার করা পরাজয় নয় এবং প্রমাণের কাছে নিজের ধারণা বদলানো পরিপক্বতার পরিচয়।
বিজ্ঞান শুধু বড় বড় যন্ত্রের নাম নয়; আবার শুধু ভাবনার স্বাধীনতার নামও নয়। বিজ্ঞান হলো স্বাধীন প্রশ্নকে শৃঙ্খলিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে প্রমাণের কাছে নিয়ে যাওয়ার এক চলমান প্রক্রিয়া। তাই বিজ্ঞানকে শক্তিশালী করতে হলে প্রশ্ন করার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ প্রশ্ন করা শুধু বিজ্ঞানীর কাজ নয়; একটি সমাজের নিজের ভুলকে চিনতে, নতুন সত্যকে গ্রহণ করতে এবং ভবিষ্যৎকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারার ক্ষমতার সঙ্গেও প্রশ্ন করার স্বাধীনতা গভীরভাবে যুক্ত।
শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান আমাদের যে শিক্ষা দেয়, তা কোনো নির্দিষ্ট সূত্রে সীমাবদ্ধ নয়: সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে শুধু সঠিক উত্তর খোঁজা নয়; নিজের উত্তর ভুল হতে পারে—এই সম্ভাবনাটিও খোলা রাখা।
লেখক: জহিরুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, কক্সবাজার।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে আরো পড়ুন