https://www.prothomalony.com/

18204

new-york

নিউইয়র্ক

সিভিল সোসাইটির সমাধিক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে: বাংলাদেশের এক অসমাপ্ত আত্মজিজ্ঞাসা

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০০:৩০

বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসেছি কয়েকদিন হলো। শরীরটা নিউইয়র্কে, কিন্তু মনটা এখনো দেশের রাস্তায় হাঁটছে।

এবারের সফরে অনেক কিছু দেখেছি। অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ঢাকা থেকে সিলেট, টাঙ্গাইলের চরাঞ্চল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার—শহর থেকে গ্রাম, মানুষের ভিড় থেকে একেবারে প্রান্তের জনপদ—যতটা সম্ভব কাছ থেকে বাংলাদেশকে দেখার চেষ্টা করেছি।

প্রবাসে বসে বাংলাদেশকে আমরা অন্যভাবে দেখি। খবরের কাগজ, টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব—সব মিলিয়ে একটি বাংলাদেশ প্রতিদিন আমাদের সামনে তৈরি হয়। সেই বাংলাদেশে ঘটনা আছে, পরিসংখ্যান আছে, রাজনৈতিক বক্তব্য আছে, তর্ক আছে।

কাছে গিয়ে মানুষের ভাষাটা শুনতে হয়। মানুষকে পাঠ করতে হয়।

দেখেছি। শুনেছি।

একটি বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানুষের মধ্যে একধরনের মিশ্র অনুভূতি বিরাজমান। সামাজিক স্বস্তি এবং অস্বস্তির ভেতরেই একধরনের অনিশ্চয়তা টের পেয়েছি—আগামীকাল কী হবে, দেশ কোন পথে যাবে?

একটা জিনিস দেখে ভালো লেগেছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখনো বেঁচে থাকার অদ্ভুত এক জেদ ধরে রেখেছে।

ছোট দোকানদার তার দোকান খুলেছে। তরুণ তার ছোট ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। কৃষক মাঠে গেছে। রিকশাওয়ালা রিকশা চালাচ্ছে। কেউ বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, কেউ দেশে থেকেই কিছু করার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের মানুষকে যতবার ভাঙা হয়েছে, ততবারই তারা কোনো না কোনোভাবে নিজেদের জোড়া লাগিয়েছে।

এই মানুষগুলোর ওপর আস্থা রাখার কোনো বিকল্প নেই আজও।

দেশ থেকে ফিরে এবার একটি জিনিস আমাকে ভীষণভাবে ভাবিয়েছে।

একটি শূন্যতা।

বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি কোথায়?

প্রশ্নটি খুব সরল। কিন্তু উত্তরটি অস্বস্তিকর।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার সময় আমরা শিখেছিলাম, রাষ্ট্রের বাইরে সমাজেরও একটি শক্তি আছে। রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। সরকার তার ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে। কিন্তু এর মাঝখানে থাকবে একটি স্বাধীন সামাজিক পরিসর—যেখানে শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী, চিন্তাশীল মানুষ এবং সমাজের নানা স্তরের বিবেকবান নাগরিকরা নিজেদের কথা বলবেন।

এই জায়গাটাই সিভিল সোসাইটি। একসময় বাংলাদেশে এই জায়গাটি ছিল।

হয়তো খুব শক্তিশালী ছিল না। হয়তো সবসময় নিরপেক্ষও ছিল না। কিন্তু ছিল।

কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁদের কাছে গেলে মনে হতো—এঁরা কোনো দলের নন। এঁদের নিজের একটা অবস্থান আছে। ক্ষমতাসীনরা তাঁদের পছন্দ না করলেও শুনত। বিরোধীরা তাঁদের সঙ্গে একমত না হলেও পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারত না।

সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণ মানুষ তাঁদের কথা বিশ্বাস করত।

আজ সেই মানুষগুলো কোথায়?

অনেকেই নেই। সময় তাঁদের নিয়ে গেছে। আর যাঁরা আছেন, তাঁদের অনেককেই আমরা নিজেরাই ভাগ করে ফেলেছি। কেউ আওয়ামী, কেউ বিএনপি, কেউ জামায়াত, কেউ বাম, কেউ ডান। কেউ সরকারপন্থী, কেউ সরকারবিরোধী। কেউ কোনো একটি মতাদর্শের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছেন যে তাঁর অন্য কোনো পরিচয় আর অবশিষ্ট নেই। এমনকি সম্পাদক বা সাংবাদিকও আর সাংবাদিক থাকলেন না—হয়ে গেলেন কোনো পক্ষের লোক।

শিক্ষক শিক্ষক থাকলেন না—তিনি হয়ে গিয়েছেন কোনো এক শিবিরের বুদ্ধিজীবী।

আইনজীবী বা সাংস্কৃতিক কর্মী—সবই যেন হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতিনিধি।

এমন অবস্থা যখন হয়, তখন সমাজের মাঝখানের জায়গাটা ধীরে ধীরে খালি হয়ে যায়।

আমার কাছে এবারের বাংলাদেশ সফরের সবচেয়ে বেদনাদায়ক উপলব্ধি এটাই।

আমরা রাজনৈতিকভাবে যত বেশি বিভক্ত হয়েছি, সামাজিকভাবে তত বেশি একা হয়ে গেছি।

সবাই কথা বলছে। কিন্তু সবাই নিজের পক্ষের কথা বলছে।

সবাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

কিন্তু অন্যায়টা যদি নিজের পক্ষের হয়, তখন কণ্ঠস্বরটা একটু নিচু হয়ে যায়।

সবাই গণতন্ত্র চায়। কিন্তু গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা—নিজের অপছন্দের মানুষের কথা বলার অধিকার—সেটা আমরা কতটা মানতে প্রস্তুত?

এই জায়গাতেই সিভিল সোসাইটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ সিভিল সোসাইটির কাজ কারও পক্ষ নেওয়া নয়। আবার নিরপেক্ষতার নামে সবকিছুকে সমান করে দেখাও নয়। তার কাজ হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। বিবেকের মুখোমুখি দাঁড় করানো।

যে ক্ষমতায় থাকুক। যে অন্যায় করুক, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। যে সত্য অস্বস্তিকর, সেটিও বলা। প্রয়োজন হলে নিজের পক্ষকেও প্রশ্ন করা।

এই শেষ কাজটাই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন।

বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটির পতনের দায় তাই শুধু রাজনীতিবিদদের ওপর চাপিয়ে দিলে সত্যের অর্ধেক বলা হবে।

যাঁরা ‘সুশীল সমাজ’ শব্দটিকে বিদ্রূপের শব্দে পরিণত করেছেন, তাঁদের দায় আছে।

যাঁরা স্বাধীন নাগরিক কণ্ঠকে দুর্বল করেছেন, তাঁদের দায় আছে।

কিন্তু সিভিল সোসাইটির ভেতরের মানুষদেরও প্রশ্ন করতে হবে নিজেদের।

ক্ষমতার কাছে গিয়ে আমরা কতটা স্বাধীনতা হারিয়েছি?

কতবার সুবিধার বিনিময়ে নীরব থেকেছি?

কতবার নিজের পক্ষের অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে ঢেকে দিয়েছি?

কতবার সত্য জানলেও বলিনি?

ক্ষমতা শুধু মানুষকে ভয় দেখায় না। ক্ষমতা মানুষকে পুরস্কৃতও করে।

আর পুরস্কারের রাজনীতিও কখনো কখনো বিবেককে খুব নিঃশব্দে কিনে নেয়। আজ বাংলাদেশে সেই নীরবতার ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি।

একসময় যে সমাজে নানা মতের মানুষ পাশাপাশি বসে কথা বলতেন, সেখানে এখন মানুষ আগে জানতে চায়—আপনি কোন পক্ষের?

তারপর আপনার কথার মূল্য নির্ধারণ করে। কথাটা সত্য কি না, সেটা পরে। এই জায়গাটি ভয়ংকর।

কারণ একটি সুস্থ সমাজে মানুষের পরিচয় তার দল দিয়ে শেষ হয়ে যায় না। মানুষের নিজেরও একটি বিবেক থাকে। নিজস্ব ইতিহাস থাকে। নিজস্ব অভিজ্ঞতা থাকে। নিজস্ব ভুল থাকে।

নিজস্ব সত্য থাকে।

রাজনীতি সেই জায়গাটুকু পুরোপুরি দখল করে নিলে সমাজ আর সমাজ থাকে না—তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক শিবিরের সমষ্টি।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি এখানেই।

আমরা কি শুধু সরকার বদলাতে চাই? নাকি সমাজের ভেতরের সম্পর্কটাও বদলাতে চাই?

নতুন নির্বাচন হবে। নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। সংস্কারের কথা হবে। নতুন আইন হবে। নতুন নেতৃত্ব আসবে। এসব প্রয়োজনীয়।

কিন্তু এগুলোর কোনোটিই যথেষ্ট নয়, যদি মানুষের মধ্যে পরস্পরের কথা শোনার জায়গাটি তৈরি না হয়।

একটি দেশ শুধু সংসদ দিয়ে চলে না। শুধু সরকার দিয়ে চলে না। শুধু নির্বাচন দিয়েও চলে না। একটি দেশ শেষ পর্যন্ত মানুষের পারস্পরিক আস্থা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

আর সেই আস্থা তৈরি করার জন্য দরকার একটি স্বাধীন, সাহসী, আত্মমর্যাদাশীল নাগরিক সমাজ।

আমি জানি না সেই সমাজ আবার কবে তৈরি হবে। হয়তো দ্রুত হবে না। হয়তো আমাদের প্রজন্ম সেই পূর্ণ পরিবর্তন দেখবেও না। কিন্তু শুরুটা তো কোথাও থেকে করতে হবে।

আমাদের নতুন করে এমন মানুষ তৈরি করতে হবে, যাঁদের পরিচয় কোনো দলের চেয়ে বড়।

এমন সাংবাদিক, যিনি নিজের পছন্দের মানুষের বিরুদ্ধেও সত্য লিখবেন। এমন শিক্ষক, যিনি ছাত্রকে নিজের মত শেখাবেন না, বরং প্রশ্ন করতে শেখাবেন। এমন আইনজীবী, যিনি মক্কেলের পরিচয়ের আগে আইনের কথা ভাববেন।

এমন সাংস্কৃতিক কর্মী, যিনি সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সিঁড়ি বানাবেন না। এমন নাগরিক, যিনি নিজের পক্ষের ভুল দেখেও বলতে পারবেন—এটা ভুল।

সিভিল সোসাইটি আসলে একটি সামাজিক চরিত্র।

একটি নৈতিক অভ্যাস।

একটি সাহস।

সেই সাহসটাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি।

দেশ থেকে ফিরে আমার মনে হয়েছে—বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটির মৃত্যু নিয়ে শোক করার চেয়ে এখন তার পুনর্জন্মের কথা ভাবা জরুরি।

কবরের পাশে বসে থাকলে মৃতেরা ফিরে আসে না।

সমাধিক্ষেত্র সরিয়ে সেখানে আবার মানুষকে দাঁড় করাতে হয়।

হয়তো আমাদের এখনকার কাজ সেটাই।

এই লেখাটি কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়। কোনো দলের পক্ষেও নয়।

এটি আমার নিজের সঙ্গে আমার নিজের কথোপকথন।

স্বাধীন বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ হিসেবে, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে কয়েক দশক ধরে পথ চলার অভিজ্ঞতা থেকে ফিরে আসা একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

আমরা কি সত্যিই নতুন বাংলাদেশ চাই? নাকি শুধু পুরোনো জায়গাগুলোতে নতুন মানুষ বসাতে চাই?

আমি উত্তর জানি না।

কিন্তু প্রশ্নটি করতে চাই।

একটি সমাজের সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তার চেয়েও বড় বিপদ—

যখন কথা বলার মতো স্বাধীন মানুষই আর অবশিষ্ট থাকে না।

বাংলাদেশের সেই মানুষগুলোকে আমাদের আবার খুঁজে বের করতে হবে।

হয়তো তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছোট কক্ষে আছেন।

হয়তো কোনো জেলা শহরের অখ্যাত আইনজীবী। হয়তো কোনো গ্রামের স্কুলশিক্ষক।

হয়তো কোনো তরুণ সাংবাদিক। হয়তো কোনো সাংস্কৃতিক কর্মী, যিনি বহুদিন ধরে কোনো মঞ্চের অপেক্ষা না করে নিজের মতো করে কাজ করে যাচ্ছেন।

সিভিল সোসাইটির সমাধিক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে তাই আমার শেষ প্রশ্নটি অন্য কারও কাছে নয়—নিজের কাছেই:

আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করতে পারব, যেখানে মানুষ প্রথমে কোনো দলের মানুষ নয়—প্রথমে একজন নাগরিক?

উত্তরটা সময় দেবে। কিন্তু প্রশ্নটা আজই করতে হবে।

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন