https://www.prothomalony.com/
18131
opinion
একজন নারী সন্ধ্যার পর একা রাস্তায় বের হলে আমাদের সমাজে প্রায়ই প্রথম প্রশ্ন হয়, তিনি কেন বের হলেন? কী পোশাক পরেছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কখন ফিরবেন; এসব নিয়েও শুরু হয় বিচার। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই প্রথম প্রশ্নটি হয় রাস্তাটি তার জন্য নিরাপদ নয় কেন? হয়রানিকারীকে থামানো যাচ্ছে না কেন? আইন ও প্রতিষ্ঠান তাকে সুরক্ষা দিতে পারছে না কেন?
প্রশ্নের এই পার্থক্যের মধ্যেই নারীর স্বাধীনতা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের গভীর দ্বন্দ্বটি ধরা পড়ে।
নিরাপত্তার উদ্বেগ অবশ্যই বাস্তব। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি, নিপীড়ন ও অনিরাপদ জনপরিসর কোনো কল্পিত সমস্যা নয়। কিন্তু সেই বাস্তবতার সমাধান যদি নারীর চলাফেরা, পোশাক, শিক্ষা, কাজ কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়, তাহলে 'রক্ষা' কখন 'নিয়ন্ত্রণে' পরিণত হয়, সেটিই হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নারীকে বন্দি করে রাখে শুধু লোহার শিকল নয়। অনেক সময় শিকল তৈরি হয় সামাজিক বিধিনিষেধ, ভয়, কুসংস্কার, রক্ষণশীলতা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দিয়ে। আরও গভীর বিষয় হলো, এই শিকল সব সময় বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় না। দীর্ঘ সামাজিকীকরণের ফলে মানুষ কখনো কখনো এমন কিছু সীমারেখাকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, যেগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তার থাকে না। সেখানেই অদৃশ্য শিকলের শক্তি।
স্বাধীনতা: অনুমতি নয়, স্বায়ত্তশাসন
স্বাধীনতা কোনো লিঙ্গের বিশেষ সুবিধা নয়। এটি মানুষের মর্যাদা ও ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষা গ্রহণ, কাজ করা, মতপ্রকাশ, চলাফেরা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ একজন মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে এসব অধিকার প্রায়ই 'অনুমতি'র ভাষায় হাজির হয়। কোথায় যাবে, কী পড়বে, কোন পেশা বেছে নেবে, কখন বাড়ি ফিরবে, কাকে বিয়ে করবে; এসব সিদ্ধান্তে নারীর নিজের মতামতের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের অনুমোদনকে অনেক সময় চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা হয়।
এখানে স্বাধীনতার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধ কর্তৃত্ব কার?
স্বাধীনতার অর্থ দায়িত্বহীনতা নয়। নারী-পুরুষনির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষেরই নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি বিবেচনা করার দায়িত্ব আছে। কিন্তু দায়িত্বশীলতার শিক্ষা আর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এক বিষয় নয়। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ মানুষকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দেয়; তার হয়ে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় না।
নারীর স্বাধীনতার প্রশ্ন তাই শুধু দরজা খোলা না বন্ধ এত সরল নয়। দরজা খোলা থাকলেও যদি তাকে শেখানো হয় কোন পথ 'ভদ্র', কোন পোশাক 'গ্রহণযোগ্য', কোন পেশা 'নারীর উপযোগী', কোন স্বপ্ন 'অতিরিক্ত' তবে স্বাধীনতার বাহ্যিক পরিসর বাড়লেও সিদ্ধান্তের ভেতরের স্বাধীনতা সংকুচিত থাকতে পারে।
অর্থাৎ নারীমুক্তির প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত শুধু চলাফেরার স্বাধীনতার নয়; এটি স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন, নিজের জীবনকে নিজের বিবেচনা, ইচ্ছা ও যুক্তির ভিত্তিতে পরিচালনা করার সক্ষমতার প্রশ্ন।
নিরাপত্তা কখন নিয়ন্ত্রণ হয়ে ওঠে?
পরিবারের উদ্বেগকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে নারীর প্রতি সহিংসতার বাস্তবতা যখন রয়েছে, তখন স্বজনদের ভয় পাওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু নিরাপত্তার নামে যদি সমাধান হয়, 'বাইরে যেও না', 'এটা পরো না', 'ওর সঙ্গে কথা বলো না', 'রাতে বের হয়ো না', তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ বদলানোর পরিবর্তে ঝুঁকির বোঝা নারীর ওপরই চাপানো হয়।
এখানেই রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের পার্থক্য।
রক্ষা মানে ঝুঁকি কমানো; নিয়ন্ত্রণ মানে ঝুঁকি এড়াতে ব্যক্তির স্বাধীনতা সীমিত করা। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হওয়া উচিত প্রথমটি।
একজন নারী রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন, এটি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিরাপদ সড়ক, কার্যকর গণপরিবহন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত প্রতিকার। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধ করতে প্রয়োজন কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা। জনপরিসরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অপরাধীর জবাবদিহি।
নারীকে আরও বেশি সতর্ক ও সীমাবদ্ধ করাই যদি নিরাপত্তার প্রধান কৌশল হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজ আসলে ঝুঁকির উৎসকে বদলানোর দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।
পোশাকের দায় দিয়ে অপরাধ ব্যাখ্যা করা যায় না
নারীর পোশাক নিয়ে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত পছন্দ ভিন্ন হতে পারে। এসব ভিন্নতাকে সম্মান করা বহুত্ববাদী সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কোনো পোশাকই হয়রানি বা সহিংসতার অনুমতি নয়।
কোনো নারী কী পোশাক পরেছেন, সেটিকে যৌন হয়রানি বা সহিংসতার কারণ হিসেবে দেখালে অপরাধীর দায় আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সম্মতি ছাড়া স্পর্শ, যৌন হয়রানি, নিপীড়ন কিংবা সহিংসতার দায় সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর, যারা এমন আচরণ করেছে।
এখানে একটি মৌলিক নৈতিক নীতি মনে রাখা দরকার: কোনো মানুষের স্বাধীনতা অন্য মানুষের সহিংসতার অনুমতি নয়।
আর নারীর নিরাপত্তাকে শুধু পোশাক বা জনপরিসরের আচরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার বড় অংশই আমাদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপির ২০২৪ সালের জাতীয় 'ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে'র তথ্য অনুযায়ী, কখনো বিবাহিত হয়েছেন এমন নারীদের ৭৫.৯ শতাংশ জীবনের কোনো এক পর্যায়ে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন; গত ১২ মাসেও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৪৮.৭ শতাংশ। এই তথ্য নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
নারীর জন্য বিপদ শুধু রাস্তায় নয়; ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও পারিবারিক পরিসরেও থাকতে পারে।
ভুক্তভোগীকে দায়ী করার সহজ যুক্তি
সহিংসতার ঘটনা ঘটলে সমাজের একটি অংশ প্রায়ই জানতে চায়, তিনি সেখানে কেন গিয়েছিলেন? এমন পোশাক পরেছিলেন কেন? কার সঙ্গে ছিলেন?
পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা এবং ভুক্তভোগীকেই ঘটনার জন্য দায়ী করা এক বিষয় নয়। সমস্যা হয় তখন, যখন প্রশ্নগুলো অপরাধীর আচরণ, ক্ষমতার সম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে আড়াল করে।
ভুক্তভোগীকে দায়ী করার প্রবণতা শুধু নৈতিকভাবে অন্যায় নয়; এটি একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক শর্টকাট। অপরাধের সামাজিক কারণ, ক্ষমতার অসমতা, অপরাধীর মানসিকতা এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে তখন সহজ প্রশ্ন করা হয়, ভুক্তভোগী কী ভুল করেছিলেন?
এর বাস্তব ক্ষতিও আছে। সামাজিক কলঙ্ক ও অপমানের আশঙ্কায় নির্যাতনের শিকার নারী অনেক সময় ঘটনা প্রকাশ করতে চান না, প্রতিকার চাইতে দ্বিধা করেন। ফলে অপরাধী আরও নিরাপদ বোধ করতে পারে।
তাই প্রশ্নের কেন্দ্র বদলানো জরুরি। 'নারী কী করেছিলেন', এই প্রশ্নের পাশাপাশি বরং তার আগে জানতে হবে: অন্য ব্যক্তি কেন এমন আচরণ করার সাহস পেলেন? প্রতিষ্ঠান কেন তা প্রতিরোধ করতে পারল না? আইন কেন কার্যকর হলো না?
অংশগ্রহণ বাড়লেই স্বাধীনতা পূর্ণ হয় না
বাংলাদেশে কয়েক দশকে নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তন এনেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, গবেষণা, গণমাধ্যম, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমসহ নানা ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এতে শুধু নারীর জীবন নয়, পরিবার ও অর্থনীতিও বদলেছে।
কিন্তু অংশগ্রহণ আর ক্ষমতায়ন এক জিনিস নয়।
একজন নারী কাজ করছেন, কিন্তু নিজের উপার্জন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না; শিক্ষিত হয়েছেন, কিন্তু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার মতামতের মূল্য নেই; বাইরে যাচ্ছেন, কিন্তু প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার ভয় নিয়ে চলছেন, তাহলে স্বাধীনতার প্রশ্নটি এখনো অসম্পূর্ণ।
তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো নয়; তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
পরিবর্তন শুধু নারীর দায়িত্ব নয়
নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নকে 'নারী বনাম পুরুষ' এর দ্বন্দ্বে পরিণত করলে সমাধানের পথ সংকুচিত হয়। পুরুষদেরও এই পরিবর্তনের অংশ হতে হবে।
ছেলেশিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে সম্মতি কী, সমতা কী, অন্যের ব্যক্তিসীমার মর্যাদা কী এবং ক্ষমতা মানে অধিকার হরণ নয়। একইভাবে মেয়েশিশুকে শেখাতে হবে যে নিজের মত প্রকাশ করা অপরাধ নয় এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবার অধিকার তারও আছে।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র; সব জায়গায় একই নীতির প্রতিফলন প্রয়োজন। কারণ সামাজিক মানসিকতা শুধু আইন দিয়ে বদলায় না; আবার আইন ছাড়া সামাজিক পরিবর্তনও টেকসই হয় না।
নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা পরস্পরের শত্রু নয়
নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতাকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং প্রকৃত নিরাপত্তার লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাধীনতার পরিসর বাড়ানো।
একজন নারী রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন, এটি নিশ্চিত করা স্বাধীনতার শত্রু নয়; স্বাধীনতার শর্ত। একজন নারী কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ছাড়া কাজ করতে পারবেন, এটি স্বাধীনতার অতিরিক্ত সুবিধা নয়; মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ভিত্তি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নারীকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং যে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান নারীর অধিকার লঙ্ঘন করে, তাকে জবাবদিহির মধ্যে আনা।
শেষ পর্যন্ত নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নটি শুধু নারীর প্রশ্ন নয়। এটি একটি সমাজ তার সদস্যদের কতখানি মানুষ হিসেবে স্বীকার করে, তারও পরীক্ষা।
যে সমাজ প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের হয়ে তার জীবন সম্পর্কে সব সিদ্ধান্ত নিতে চায়, সে সমাজ হয়তো শৃঙ্খলা দিতে পারে, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে; কিন্তু স্বাধীনতা দিতে পারে না।
অদৃশ্য শিকল ভাঙার অর্থ তাই শুধু নারীর মুক্তি নয়, মানুষের মর্যাদার পরিসরকে বিস্তৃত করা। কারণ স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো, ভয়, সামাজিক অনুমোদন কিংবা অযৌক্তিক বিধিনিষেধের কাছে নত না হয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে নিজের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
একটি সমাজ সত্যিকার অর্থে নিরাপদ তখনই, যখন নারীকে নিরাপদ রাখতে তার স্বাধীনতা কমাতে হয় না।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন