https://www.prothomalony.com/

18128

opinion

অভিমত

ক্যানসার চিকিৎসায় দ্বিতীয়

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৩:৩৭

 

বাংলাদেশে একজন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় ২৬ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেল। কয়েক দফা জীবাণু পরীক্ষা, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি এই সবই হলো। চিকিৎসাও চলল একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞের অধীনে। কিন্তু এত কিছুর পর একদিন অন্য একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞের সামনে বসে জানতে হলো, 'অনেক দেরি হয়ে গেছে।'

কথাটি শুধু একটি পরিবারের জন্য দুঃসংবাদ নয়; আমার কাছে এটি একটি বড় প্রশ্নও। এত বড় একটি অসুখের চিকিৎসায় দ্বিতীয় একজন বিশেষজ্ঞের মতামত কি আগে নেওয়া যেত না? রোগীর পরিবারকে কি বলা যেত না, 'আপনারা চাইলে আরেকজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞের কাছ থেকেও মতামত নিতে পারেন।' চিকিৎসকের সেই পরামর্শটি না পাওয়ায় আমার পরিবার আজকে বিপর্যস্ত।

কিছুদিন আগে আমার ছোট ভাইকে নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানসার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ছয়ফউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। ভাইয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজপত্র তিনি দেখলেন। সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে তিনি আমাদের খুব আশাবাদী হওয়ার মতো কথা শোনাতে পারলেন না। বরং জানালেন, রোগটি অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছে।

আমার ভাইয়ের চিকিৎসা হচ্ছিল ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞের অধীনে। কয়েক দফা জীবাণু পরীক্ষা হয়েছে, রেডিওথেরাপি হয়েছে, কেমোথেরাপি হয়েছে। চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে আরও নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ২৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ চিকিৎসার কোনো পর্যায়েই আমাদের বলা হয়নি, 'আরেকজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে দ্বিতীয় মতামত নিয়ে নিন।'

পরে যখন নিজেরা উদযোগী হয়ে অন্য একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বললাম, তিনি এমন একটি কথা বললেন, যা আজও আমার কানে বাজে; "আমি যদি এখন কিছু বলি, তাহলে কথাগুলো আপনার আগের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যাবে।"

আমি কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চাই না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে জটিলতা থাকে, রোগের ধরন ভেদে চিকিৎসার ফলও ভিন্ন হয়। একজন চিকিৎসক তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেন, সেটিরও নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু একজন রোগী ও তার পরিবারের অধিকার আছে কি না; আরেকজন বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে একই রোগের বিষয়ে আরেকটি মতামত জানার? আমার মনে হয়, অবশ্যই আছে। কারণ ক্যানসার এমন একটি রোগ, যেখানে সময়ের মূল্য অনেক। রোগটি শরীরের কোথায়, কতটা ছড়িয়েছে, কী ধরনের ক্যানসার, কোন চিকিৎসা আগে প্রয়োজন, অস্ত্রোপচার করা যাবে কি না, ওষুধ, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির কোনটি কখন দরকার, এসব বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গাতেই সম্প্রতি আমার ই-মেইলে আসা একটি বিজ্ঞপ্তি আমাকে থমকে দিয়েছে। ভারতের হায়দরাবাদভিত্তিক স্টার হাসপাতালের বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র 'স্টার ক্যানসার সেন্টার বাংলাদেশি ক্যানসার রোগীদের জন্য বিনামূল্যে দ্বিতীয় চিকিৎসা-পরামর্শ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।' বিজ্ঞপ্তিটি ঢাকা থেকে পাঠানো হয়েছে। প্রথমে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে 'স্টার হাসপাতাল' নামে কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র হয়তো আছে। পরে পুরো বিজ্ঞপ্তি পড়ে বুঝলাম, এটি ভারতের হায়দরাবাদের হাসপাতাল।

তাদের বিজ্ঞপ্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, "বাংলাদেশি ক্যানসার রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য বিনামূল্যে 'সেকেন্ড ওপিনিয়ন' বা দ্বিতীয় চিকিৎসা-পরামর্শ এবং চিকিৎসা-নির্দেশনা সেবা চালু করেছে ভারতের হায়দরাবাদভিত্তিক স্টার হাসপাতালের বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসা ইউনিট স্টার ক্যানসার সেন্টার।" আরও বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশি রোগীরা ভারতে যাওয়ার আগে তাদের রোগ নির্ণয়, বর্তমান চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং পরবর্তী চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বিনামূল্যে বিশেষজ্ঞ মতামত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-নির্দেশনা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ক্যানসার চিকিৎসা নিয়ে রোগী ও পরিবারের অনিশ্চয়তা কমানো, চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ করা এবং রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী অঙ্গভিত্তিক ও আধুনিক চিকিৎসার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করা।

স্টার ক্যানসার সেন্টারের দেওয়া তথ্যে আরও বলা হয়েছে, "বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ১ লাখ ৬৭ হাজার থেকে ১ লাখ ৮৭ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হন।" স্তন, ফুসফুস, জরায়ুমুখ, খাদ্যনালি ও পরিপাকতন্ত্রের ক্যানসারের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

তারা আরও জানিয়েছে, রোগীরা ভারতে যাওয়ার আগেই তাদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও রোগের নথি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করাতে পারবেন। অঙ্গভিত্তিক চিকিৎসা, শল্যচিকিৎসা ও রেডিয়েশন ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রোগীর নথি পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশে চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ, হাসপাতালে থাকার সময়কাল, ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং ভিসা-সংক্রান্ত সহায়তার কথাও বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

এটি তাদের ব্যবসায়িক কৌশল কি না, তা আমি জানি না। একটি হাসপাতাল বিদেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে চাইবে, এটি স্বাভাবিক। রোগী ভারতে গেলে হাসপাতালের ব্যবসাও হবে। কিন্তু তার মধ্যেও যদি একজন ক্যানসার রোগী সঠিক সময়ে একজন বিশেষজ্ঞের মতামত পান, তার পরিবারের অনিশ্চয়তা কমে এবং চিকিৎসার পথটি কিছুটা পরিষ্কার হয়, তাহলে মানবিক দিকটিও অস্বীকার করা যায় না। তবে আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে, বাংলাদেশি রোগীদের দ্বিতীয় মতামত দেওয়ার জন্য ভারতে যাওয়ার প্রয়োজনটাই বা কেন থাকবে? ভারতে যাওয়ার আগে যদি কাগজপত্র দেখে মতামত দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশে বসেই কি এমন একটি ছোট পরিসরের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়?

স্টার ক্যানসার সেন্টার যদি সত্যিই বাংলাদেশি রোগীদের সহযোগিতা করতে চায়, তাহলে ঢাকায় বা দেশের অন্য কোনো বড় শহরে একটি ছোট দ্বিতীয় চিকিৎসা-পরামর্শ কেন্দ্র চালু করতে পারে। সেখানে তাদের ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট দিনে সরাসরি রোগী দেখতে পারেন। অথবা বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে রোগীর প্রতিবেদন ও পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করতে পারেন। এতে রোগী ও পরিবার প্রথমেই বুঝতে পারবে যে, তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত।

কারও যদি ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয়, সে সিদ্ধান্তও তখন আরও পরিষ্কারভাবে নিতে পারবেন। আর যদি বাংলাদেশেই চিকিৎসা সম্ভব হয়, তাহলে শুধু দ্বিতীয় মতামতের জন্য একজন রোগী ও তার পরিবারকে বিপুল টাকা খরচ করে বিদেশে যেতে হবে না।

আমার নিজের জীবনেও 'মানবিক চিকিৎসা' কথাটির একটি বাস্তব উদাহরণ আছে। আমি একটি চক্ষু হাসপাতালে স্বেচ্ছাশ্রম দিই। হাসপাতালটির নাম মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মী মিলিয়ে এখানে দুই শতাধিক মানুষ কাজ করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তো আসেনই, ভারতের অনেক রোগীও এখানে চোখের চিকিৎসা নিতে আসেন। আমাদের হাসপাতাল একটি পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেই কমিটির একটি সিদ্ধান্ত আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্তটি হলো; "কেউ চোখের অসুখ নিয়ে হাসপাতালের সীমানার ভেতরে প্রবেশ করার পর তার টাকা থাকুক বা না থাকুক, হাসপাতালের যে সামর্থ্য আছে, সেই সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা দিতে হবে।"

আমরা চেষ্টা করি সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে। প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ আমাদের হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পান। শুধু ছানি অপারেশন নয়, চোখের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাই বিনামূল্যে করার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ একজন মানুষ চিকিৎসার দরজায় এসে দাঁড়ানোর পর তার পকেটে টাকা আছে কি না, সেটি যেন তার চিকিৎসা পাওয়ার একমাত্র শর্ত না হয়। এমন একটি মানবিক চিন্তা থেকেই আমাদের হাসপাতাল কাজ করে।

ক্যানসারের ক্ষেত্রেও আমাদের দেশে এমন মানবিক উদ্যোগ আরও বেশি প্রয়োজন। বিশেষ করে দ্বিতীয় মতামতের ব্যবস্থা। কারণ অনেক রোগী জানেনই না যে, ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর প্রয়োজনে আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া যায়। অনেক পরিবার মনে করে, একজন বড় চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা শুরু হয়ে গেলে অন্য কারও কাছে যাওয়া হয়তো চিকিৎসকের প্রতি অবিশ্বাস দেখানো। আসলে বিষয়টি তা নয়।একজন চিকিৎসকের প্রতি সম্মান রেখেও আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া যায়। বরং জটিল রোগের ক্ষেত্রে সেটি অনেক সময় চিকিৎসা-সিদ্ধান্তকে আরও পরিষ্কার করতে পারে।

আমার ছোট ভাইয়ের ঘটনাটি আমাকে এই বিষয়টি খুব নির্মমভাবে বুঝিয়েছে। এখন তার ফুসফুসের ক্যানসার জটিল আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা এখনও আশা হারাইনি। চিকিৎসা চলছে। শেষ পর্যন্ত যতটা সম্ভব চেষ্টা করে যেতে চাই। প্রয়োজনে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার কথাও ভাবছি। ফলাফল কী হবে জানি না। কিন্তু একজন ভাই হিসেবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা না করে বসে থাকতে পারি না।

আমাদের এই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই বলছি; দ্বিতীয় মতামত যদি আরও আগে নেওয়া যেত, তাহলে হয়তো আজ আমাদের সামনে প্রশ্নটি অন্যরকম হতে পারত। হয়তো ফলাফল বদলাত, হয়তো বদলাত না। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। কিন্তু অন্তত সিদ্ধান্তটি আরও তথ্যভিত্তিক হতে পারত।

আমাদের দেশে ক্যানসার চিকিৎসায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো রোগী ও পরিবারের মানসিক চাপ। ক্যানসার শব্দটি শুনলেই অনেক পরিবার ভেঙে পড়ে। একদিকে রোগের ভয়, অন্যদিকে চিকিৎসার খরচ, তার সঙ্গে নানা ধরনের পরীক্ষা, হাসপাতাল, চিকিৎসক, ওষুধ। সব মিলিয়ে পরিবার অনেক সময় এমন অবস্থায় পড়ে যে, কোন সিদ্ধান্তটি সঠিক, সেটিই বুঝতে পারে না।সেই জায়গায় দ্বিতীয় একজন বিশেষজ্ঞের নিরপেক্ষ মতামত একজন রোগীর জন্য শুধু চিকিৎসা-পরামর্শ নয়, মানসিক শক্তিও হতে পারে।

আমাদের দেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কথাও এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে। তিনি কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার চিকিৎসা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও তাকে বাঁচাতে পারেনি। অসুখটি শনাক্ত ও চিকিৎসার সময় নিয়ে পরবর্তীকালে নানা আলোচনা ও আফসোস হয়েছে। একজন মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়; ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময়কে অবহেলা করার সুযোগ খুব কম।

অন্যদিকে আমাদের সিলেট বিভাগের প্রবীণ সাংবাদিক এম এ সালামের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর তিনি দ্রুত চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ক্যানসার শনাক্ত হয়। এরপর তিনি একের পর এক চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন। এক অর্থে তার দ্বিতীয় মতামত, তৃতীয় মতামত, সবই হয়ে গেছে।

তিনি অস্থির প্রকৃতির মানুষ। সামান্য বিষয়েও অস্থির হয়ে পড়েন। ক্যানসার ধরা পড়ার পরও সেই অস্থিরতা তাকে এক জায়গায় বসে থাকতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে তার সন্তানরা তাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন হয়। আজ দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি সুস্থ জীবনযাপন করছেন।

হুমায়ূন আহমেদ ও এম এ সালামের রোগ, চিকিৎসা, শারীরিক অবস্থা কিংবা চিকিৎসার পরিবেশ এক ছিল না। তাই তাদের দুজনের পরিণতিকে সরাসরি তুলনা করাও ঠিক হবে না। একজন কেন বাঁচলেন আর অন্যজন কেন বাঁচলেন না, শুধু 'সময়মতো চিকিৎসা' দিয়ে এর পুরো ব্যাখ্যা করা যায় না। তবু তাদের জীবনের দুটি ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। সেটা হচ্ছে ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট না করা এবং চিকিৎসা নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয় মতামত মানেই প্রথম চিকিৎসক ভুল, এমন নয়। দ্বিতীয় মতামত মানে নিজের রোগ সম্পর্কে আরও একজন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করা। প্রয়োজন হলে তৃতীয় মতামত নেওয়াও অন্যায় নয়। বরং রোগী ও পরিবারের চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে এটি আরও শক্তিশালী করে।

ভারতের স্টার ক্যানসার সেন্টারের উদ্যোগ তাই আমাকে শুধু একটি হাসপাতালের বিজ্ঞপ্তি হিসেবে ভাবায়নি। এটি আমাকে আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়েও ভাবিয়েছে। তারা যদি বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিনামূল্যে দ্বিতীয় মতামতের কথা ভাবতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে থেকেই এমন একটি উদ্যোগ কেন গড়ে উঠবে না?

দেশের বড় হাসপাতালগুলো, ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র, চিকিৎসক সংগঠন, সমাজসেবী প্রতিষ্ঠান কিংবা বিত্তবান মানুষ; সবাই মিলে চাইলে এমন একটি সেবা চালু করা সম্ভব। রোগী তার সব প্রতিবেদন নিয়ে আসবে। বিশেষজ্ঞরা সেগুলো দেখবেন। প্রয়োজন হলে অনলাইনে বিদেশি বিশেষজ্ঞের মতামতও নেওয়া যেতে পারে। রোগীকে বলে দেওয়া হবে, আপনার চিকিৎসার সম্ভাব্য পথ কী, কোথায় চিকিৎসা করা সম্ভব, কোন পরীক্ষা সত্যিই দরকার, কোনটি এখনই দরকার নেই এবং কখন অন্য বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় কথা, এই সেবাটি যদি দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা অত্যন্ত কম খরচে করা যায়, তাহলে তার মূল্য আরও বেড়ে যাবে। কারণ ক্যানসার শুধু একজন মানুষের শরীরকে আক্রান্ত করে না। একটি পরিবারকে আক্রান্ত করে। একটি পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দিতে পারে। স্বজনদের মানসিকভাবে ভেঙে দিতে পারে। সেখানে একটি সঠিক পরামর্শ কখনো কখনো শুধু চিকিৎসার সিদ্ধান্ত বদলায় না; একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারে।

আমার ভাইয়ের চিকিৎসা এখনো চলছে। আমরা জানি না সামনে কী অপেক্ষা করছে। তবু আমরা চেষ্টা করছি। হয়তো এই চেষ্টার ফল আশানুরূপ হবে, হয়তো হবে না। কিন্তু এখন অন্তত একটি বিষয় বুঝতে পেরেছি, ক্যানসারের মতো কঠিন রোগে শুধু একজন চিকিৎসকের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা ঠিক নয়। চিকিৎসকের প্রতি আস্থা থাকবে, কিন্তু প্রয়োজন হলে প্রশ্নও করতে হবে। প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। আর সেই দ্বিতীয় মতামত পাওয়ার পথটি যদি রোগীর বাড়ির কাছেই তৈরি করা যায়, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে মানবিক উদ্যোগ।

ভারতের কোনো হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের জন্য এমন সেবা দিতে চাইলে আমরা তাকে স্বাগত জানাব। কিন্তু আমার আবেদন থাকবে, শুধু ভারতে যাওয়ার আগে নয়, বাংলাদেশে থাকতেই একজন রোগীকে দ্বিতীয় মতামত পাওয়ার সুযোগ করে দিন। কারণ একজন ক্যানসার রোগীর জন্য বিদেশে যাওয়ার টিকিট জোগাড় করা কঠিন হতে পারে, চিকিৎসার টাকা জোগাড় করা আরও কঠিন হতে পারে। কিন্তু তার হাতে যদি চিকিৎসার পথটি পরিষ্কার করে দেওয়ার মতো একটি নির্ভরযোগ্য মতামত তুলে দেওয়া যায়, সেটি হতে পারে সবচেয়ে বড় সাহায্য।

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা হয়তো সবাইকে বাঁচাতে পারব না। কিন্তু অন্তত কাউকে যেন ভুল সিদ্ধান্তের অন্ধকারে একা হাঁটতে না হয়; এটুকু ব্যবস্থা কি আমরা করতে পারি না? আমার মনে হয়, পারি। আর এই কাজটি শুরু হওয়া উচিত বাংলাদেশ থেকেই। এই মুহূর্তে একটি কথা বলে লেখা শেষ করতে চাই। যারা ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন, কিংবা নিতে শুরু করবেন; তারা অবশ্যই আরেকজন অর্থাৎ দ্বিতীয় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে মতামতটি নিয়ে নেবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন