https://www.prothomalony.com/

18050

bangladesh

বাংলাদেশ

জনসংখ্যা: বাংলাদেশের বোঝা, নাকি সম্পদ?

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:০৯

বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে কথা উঠলেই আমাদের সামনে একটি পরিচিত ছবি ভেসে ওঠে—অল্প আয়তনের দেশ, অথচ বিপুল মানুষ। শহরের রাস্তায় যানজট, বাসে-ট্রেনে মানুষের ভিড়, হাসপাতালের শয্যার সংকট, স্কুলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, আবাসনের উচ্চমূল্য, কৃষিজমি কমে যাওয়া, বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের চাপ—সবকিছুর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জনসংখ্যার প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বাংলাদেশে জনসংখ্যা এখনো বাড়ছে, কিন্তু আগের গতিতে নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ এবং বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ২ শতাংশ। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলও বলছে, বাংলাদেশের মোট প্রজনন হার এখন প্রায় ২ দশমিক ৩—অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি অনেকটাই কমে এসেছে।

তাই “বাংলাদেশে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ঘটছে”—এমন সরলীকৃত বক্তব্য এখন আর পুরোপুরি সঠিক নয়। কিন্তু সমস্যাটি এখানেই শেষ হয়ে যায় না। কারণ বাংলাদেশের জন্য শুধু মোট মানুষের সংখ্যা নয়, কোথায় কত মানুষ বাস করছে, তাদের জন্য কী পরিমাণ অবকাঠামো আছে এবং সেই মানুষগুলো কতটা উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারছে—এই প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩৫০ জন। ([UNSD][2]) পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় এই ঘনত্ব অসাধারণ রকম বেশি। আমাদের জমি বাড়ছে না। নদী, জলাভূমি, কৃষিজমি, বনাঞ্চল ও বসবাসযোগ্য ভূমির ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে মানুষের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও তার প্রভাব অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। এখানেই জনসংখ্যার সঙ্গে অবকাঠামোর সম্পর্কটি সামনে আসে।

একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে শুধু একটি নতুন মুখ যোগ হয় না; ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন হয় একটি স্কুল, একজন শিক্ষক, চিকিৎসাসেবা, টিকা, পুষ্টি, পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, কর্মসংস্থান এবং শেষ পর্যন্ত একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ।

আজ যে শিশুটি জন্ম নিচ্ছে, ২০ বছর পর তাকে কাজ দিতে হবে। তাকে যদি দক্ষ করে তুলতে না পারি, তাহলে জনসংখ্যা তখন সম্পদ নয়—বেকারত্বের সংখ্যা হয়ে দাঁড়াবে। আবার একটি শহরে মানুষ বাড়লে শুধু আরও কয়েকটি বাড়ি নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন রাস্তা, গণপরিবহন, ড্রেনেজ, পয়োনিষ্কাশন, হাসপাতাল, স্কুল, খেলার মাঠ, পার্ক, নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পরিকল্পনা ছাড়া জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে শহর বড় হয়, কিন্তু বসবাসযোগ্যতা ছোট হতে থাকে।

ঢাকার দিকে তাকালেই আমরা এর একটি বড় উদাহরণ দেখতে পাই। বাংলাদেশে নগরায়ণ দ্রুত বাড়ছে; বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ শহরে বসবাস করছিল। কিন্তু আমাদের নগর পরিকল্পনা কি সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে? মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে কাজের সন্ধানে, অথচ শহর তাদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, পরিবহন ও নাগরিক সুবিধা তৈরি করতে পারছে না। ফল—বস্তি, যানজট, দূষণ, জলাবদ্ধতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।

তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আছে। বিশ্বের উন্নত ও অনেক মধ্যম আয়ের দেশে এখন উল্টো সমস্যা দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, ২০২৪ সালের মধ্যেই ৬৩টি দেশ ও অঞ্চলের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে; এর মধ্যে চীন, জার্মানি, জাপান ও রাশিয়াও রয়েছে। এই দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা আগামী ৩০ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

অর্থাৎ একদিকে বাংলাদেশকে ভাবতে হচ্ছে—কীভাবে বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়; অন্যদিকে পৃথিবীর অনেক দেশ ভাবছে—কাজ করার মতো তরুণ মানুষ কমে গেলে তাদের অর্থনীতি কে চালাবে?

এই বৈপরীত্য আমাদের জন্য একটি শিক্ষা বহন করে।

জনসংখ্যা নিজে কোনো অভিশাপ নয়। অদক্ষ, অস্বাস্থ্যকর ও কর্মহীন জনসংখ্যা সমস্যা; আর শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানুষ সম্পদ।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এখন আমাদের জনসংখ্যা নীতির ভাষাও বদলানো প্রয়োজন। শুধু “কম সন্তান নিন”—এই প্রচারণার সময় অনেকটাই পেরিয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন পরিবারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি শিশুকে মানসম্মত শিক্ষা ও পুষ্টি দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

 জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কোনো জবরদস্তির বিষয় হতে পারে না। এটি হতে হবে সচেতনতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের নিজের সিদ্ধান্তের বিষয়। আরেকটি বিষয় আমাদের বিশেষভাবে ভাবতে হবে—বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠী এখন মোট জনসংখ্যার বড় অংশ। এই সময়টিই আমাদের জন্য জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ। কিন্তু তরুণদের দক্ষতা না বাড়ালে এই সুবিধা দ্রুতই বোঝায় পরিণত হতে পারে।

 জনসংখ্যা নীতিকে বিচ্ছিন্ন কোনো সরকারি কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, কৃষি, শিল্প, পরিবহন, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান নীতিকে। আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি দেশ শুধু তার জমির আয়তন দিয়ে বড় হয় না; মানুষের দক্ষতা দিয়েও বড় হয়।

বাংলাদেশের সমস্যা তাই কেবল “মানুষ বেশি”—এ কথা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, এই বিপুল মানুষকে আমরা কীভাবে শিক্ষিত, দক্ষ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলব। জনসংখ্যা কমানোর চিন্তার পাশাপাশি আমাদের ভাবতে হবে—একজন মানুষকে কতটা মূল্যবান করে তোলা যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো কোনো সেতু, মহাসড়ক বা ভবন নয়— মানুষ নিজেই।

বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত নীতি নিতে হবে এবং একই সঙ্গে মানুষের জন্য এমন অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে বাড়তি মানুষ বাড়তি সমস্যা না হয়ে বাড়তি শক্তিতে পরিণত হয়। মানুষ বেশি—এটি বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য নয়। মানুষকে কাজে লাগাতে না পারাটাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন