https://www.prothomalony.com/

17955

bangladesh

বাংলাদেশ

নিবন্ধন ও স্বাধীনতার সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০০:৩৩

সাংবাদিকতার পেশাগত মান, পরিচয়ের অপব্যবহার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাংবাদিক নিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিছক একটি প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই সাংবাদিক নিবন্ধন থাকবে কি থাকবে না, বিতর্কটিকে শুধু এই সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়। মূল প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকের পেশাগত স্বীকৃতি কি রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হবে, নাকি সাংবাদিকতা তার নিজস্ব স্বাধীন ও পেশাগত কাঠামোর মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করবে?

গত ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন যুগোপযোগী করে প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও গণমাধ্যমবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং বার কাউন্সিলের আদলে সাংবাদিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও নীতি নৈতিকতাবিরোধী সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানাসহ কার্যকর বিধান এবং প্রেস কাউন্সিলের স্বতঃপ্রণোদিত তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

প্রস্তাবগুলোর পেছনে যে বাস্তব সংকট রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশে নামসর্বস্ব সংবাদমাধ্যম, অনিয়মিত প্রকাশনা, মালিকানা ও পরিচয় অস্পষ্ট অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে। সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব বিস্তার কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগও নতুন নয়। এসব কারণে সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদেরও নানা ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

কিন্তু এখানেই মূল উদ্বেগের জায়গাটি তৈরি হয়। একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যদি এমন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভবিষ্যতে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, তাহলে সেই সমাধানই নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে। রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। নিবন্ধন যদি কেবল প্রশাসনিক রেকর্ড বা পেশাগত স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা এক ধরনের ব্যবস্থা। কিন্তু সেই নিবন্ধন যদি প্রত্যাহার, স্থগিত, প্রত্যাখ্যান কিংবা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিবেচনায় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে সেটি আর নিছক নিবন্ধন থাকে না; তা হয়ে উঠতে পারে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো।

তাই প্রশ্নটি সাংবাদিক নিবন্ধনের ধারণাকে সরাসরি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার নয়। প্রশ্ন হলো, নিবন্ধনের কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, তার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের স্বাধীন প্রতিকার কী থাকবে। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি সাংবাদিকের পেশাগত বৈধতার চূড়ান্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে, তাহলে রাষ্ট্রের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। সেই ক্ষমতার অপব্যবহার না হলেও ভবিষ্যতে অপব্যবহারের সম্ভাবনাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

সাংবাদিকতা একই সঙ্গে একটি পেশা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারচর্চার ক্ষেত্র। একজন সাংবাদিক পেশা হিসেবে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করেন এবং এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পেশাগত অধিকার নয়। এটি নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারকেও কার্যকর করে। একজন সাংবাদিক যখন কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জনস্বার্থের বিষয় অনুসন্ধান করেন, তখন তার কাজের সুফল ভোগ করেন বৃহত্তর সমাজের মানুষ।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত। বাংলাদেশ ২০০০ সালে এই চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। ফলে সাংবাদিকতার পেশাগত মান নির্ধারণের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা হলে, যার মাধ্যমে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার কিংবা সাংবাদিকের স্বাধীন অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হয়, সেটি অবশ্যই গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

ডিজিটাল যুগে সাংবাদিক কে, সেই প্রশ্নটিও আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। একসময় সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে কর্মরত ব্যক্তিকেই সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত করা তুলনামূলক সহজ ছিল। এখন স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, ফ্রিল্যান্সার, ব্লগার, পডকাস্টার, নাগরিক সাংবাদিক এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করা কনটেন্ট নির্মাতাদের কারণে সাংবাদিকতার পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে।

একজন সাধারণ নাগরিক দুর্নীতির কোনো ঘটনা নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলেন। পরে সেটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল। সেই ব্যক্তিকে কি সাংবাদিক হিসেবে নিবন্ধিত হতে হবে? কোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিক যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত না থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করেন, তার পেশাগত পরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হবে? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।

এ কারণেই সাংবাদিকের একটি কঠোর ও রাষ্ট্রনির্ধারিত সংজ্ঞা তৈরি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ আজ যে সংজ্ঞা একটি প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে তৈরি হবে, ভবিষ্যতে সেটিই কারও সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার বৈধতা নির্ধারণের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

এখানে প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের প্রস্তাব এবং জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের খসড়াকে এক করে দেখা উচিত নয়। দুটি পৃথক উদ্যোগের ভিন্ন প্রেক্ষাপট রয়েছে। প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের প্রস্তাবের কথা ২০২৬ সালের ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের খসড়া অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকাশ করেছিল।

জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের খসড়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল ১৯ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে কমিশনের কাঠামো, কমিশনারদের দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের ঝুঁকি রয়েছে। এর ফলে কমিশন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মুখে পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। খসড়ায় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের সাংবাদিকের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

এ ধরনের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকের স্বাধীনতা নয়। এর অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে। প্রথমত, সাংবাদিকের প্রশ্ন করার, অনুসন্ধান করার এবং তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা। দ্বিতীয়ত, সম্পাদকের স্বাধীনতা, যাতে মালিক, সরকার, রাজনৈতিক পক্ষ কিংবা বিজ্ঞাপনদাতার অযাচিত চাপ সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে। তৃতীয়ত, নাগরিকের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার অধিকার।

এই তিনটির মধ্যে কোনো একটি দুর্বল হলে অন্য দুটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাংবাদিক স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সংকুচিত হলে নাগরিক নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে বঞ্চিত হন। ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকের ব্যক্তিগত সুবিধার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার রক্ষার অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত।

আবার এটাও সত্য যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকলেই গণমাধ্যম স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন হয়ে যায় না। সংবাদমাধ্যমের মালিকানা কার হাতে, বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা কতটা, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ কীভাবে সম্পাদকীয় নীতিকে প্রভাবিত করে, সাংবাদিকের চাকরির নিরাপত্তা কেমন এবং সংবাদমাধ্যম অর্থনৈতিকভাবে কতটা টেকসই, এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন মালিকানার কেন্দ্রীভবন কমানোর জন্য ‘ওয়ান হাউস, ওয়ান মিডিয়া’ নীতিসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছে। এসব বিষয়ে কার্যকর সংস্কার না হলে সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নিবন্ধন থাকলেও মালিকানা ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বহু গণতান্ত্রিক দেশে সাংবাদিকতার জন্য রাষ্ট্রীয় লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সেখানে সাংবাদিকতার কোনো জবাবদিহি নেই। বরং আইন, আদালত, মানহানি সংক্রান্ত প্রতিকার, পেশাগত নৈতিকতা, সম্পাদকীয় নীতি, স্বনিয়ন্ত্রণ, প্রেস কাউন্সিল এবং পাঠকের কাছে সংশোধনের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়।

এখানে অ্যাক্রিডিটেশন ও সাংবাদিক নিবন্ধনের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সরকারি অনুষ্ঠান, নিরাপত্তাসংবেদনশীল এলাকা বা নির্দিষ্ট স্থানে সাংবাদিকদের প্রবেশের জন্য অ্যাক্রিডিটেশন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেটিকে সাংবাদিক হওয়ার পূর্বশর্তে পরিণত করা উচিত নয়। সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে প্রবেশের অনুমতি এবং সংবাদ সংগ্রহের মৌলিক অধিকার এক বিষয় নয়।

তাহলে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধ হবে কীভাবে?

এর জন্য সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে একটি স্বাধীন, স্বশাসিত ও বহুপক্ষীয় পেশাগত কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় মন্ত্রণালয় বা নির্বাহী বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, আইন বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্বে একটি স্বাধীন কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। এর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীন শুনানি ও আদালতে আপিলের সুযোগ থাকতে হবে।

সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন এবং সাংবাদিকের নিবন্ধনকেও আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। একটি সংবাদমাধ্যম আইনগতভাবে নিবন্ধিত হওয়া এবং সেখানে কর্মরত প্রত্যেক সাংবাদিকের রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স থাকা এক বিষয় নয়। সংবাদমাধ্যমের মালিকানা, প্রকাশনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে যে আইনগত কাঠামো রয়েছে, সেটিকে কার্যকর করেই অনেক অনিয়ম মোকাবিলা করা সম্ভব।

পেশাগত মান বাড়ানোর জন্য বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় লাইসেন্সের পরিবর্তে স্বেচ্ছামূলক পেশাগত সার্টিফিকেশনও চালু করা যেতে পারে। সাংবাদিকতার নৈতিকতা, তথ্য যাচাই, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, মানহানি আইন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে সাংবাদিকরা স্বেচ্ছায় সার্টিফিকেট নিতে পারেন। এতে পেশাগত দক্ষতা বাড়বে, কিন্তু রাষ্ট্রের হাতে সাংবাদিকতার বৈধতা নির্ধারণের অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে না।

সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনো অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত ফৌজদারি বা দেওয়ানি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো সাংবাদিকতা পেশার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন যুক্তিযুক্ত নয়, তেমনি সাংবাদিক পরিচয়কে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ভুল সংবাদ, নৈতিক লঙ্ঘন কিংবা হয়রানির অভিযোগের জন্য একটি স্বাধীন ও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও জরুরি। সেখানে সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক, আইন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে। অভিযোগের তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর। একই সঙ্গে অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত সাংবাদিক উভয়ের ন্যায়সংগত শুনানির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

আর যদি শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের সাংবাদিক নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করতেই হয়, তাহলে তার জন্য কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। কোনো মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়। রাজনৈতিক সরকারের হাতে নিবন্ধন বাতিলের একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান বা বাতিলের ক্ষেত্রে লিখিত কারণ জানানো এবং স্বাধীন শুনানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। আদালতে আপিলের সুযোগ থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির নিবন্ধন না থাকা কখনোই তার সংবাদ সংগ্রহ বা মতপ্রকাশের অধিকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধে পরিণত করতে পারবে না।

একই সঙ্গে ‘মিথ্যা’, ‘হয়রানিমূলক’ কিংবা ‘নৈতিকতাবিরোধী’ সংবাদ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তার সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট আইনগত সংজ্ঞা থাকা জরুরি। কারণ এসব শব্দের অস্পষ্ট ব্যবহার প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সাংবাদিকতার সংকট বাস্তব। পেশায় অনুপ্রবেশ, পরিচয়ের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ভুয়া সংবাদ এবং অনৈতিক সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয়, যার ফলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার চেয়ে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রের কাজ সাংবাদিককে ‘অনুমোদিত কণ্ঠে’ পরিণত করা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে অপরাধ ও পেশাগত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি থাকবে, আবার সত্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থের সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতাও সুরক্ষিত থাকবে।

সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ তাই নিবন্ধিত সাংবাদিকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং বিচার করতে হবে, সাংবাদিক কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারছেন, কতটা নির্ভয়ে ক্ষমতাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারছেন এবং জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশের কারণে তার স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত থাকছে।

জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু জবাবদিহির নামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হলে তা শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার জন্য যেমন ক্ষতিকর হবে, তেমনি নাগরিকের জানার অধিকার এবং গণতন্ত্রের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই রাষ্ট্রের ভূমিকা হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রকের নয়, বরং এমন একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ পরিবেশের প্রহরীর, যেখানে সাংবাদিকতা নিজের পেশাগত মান, নৈতিকতা ও জবাবদিহির কাঠামো নিজেই শক্তিশালী করতে পারে।

সাংবাদিকতার প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে তিনি রাষ্ট্রের অনুমোদিত ব্যক্তি কি না, তা নয়; বরং তিনি সত্য অনুসন্ধান করতে, প্রশ্ন করতে এবং জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশ করতে স্বাধীন কি না।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন