https://www.prothomalony.com/

17938

opinion

অভিমত

স্যাটানিক ডিজাইন ভার্সেস মেটিকুলাস ডিজাইন অশুভ ও শুভের লড়াই

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০০:৪৪

সব বিতার্কিক যদি এতই বুদ্ধিমান হতো তাহলে রাষ্ট্রক্ষমতা-ব্যবস্থার সবখানেই বিতার্কিকরাই থাকতো। হ্যাঁ, আব্দুন নূর তুষার সাহেবের কথা বলছি। তিনি অহংকার করেন বিতার্কিক হিসেবে, বিশাল বিতার্কিক এবং তার সমীকরণে বিতার্কিক মানেই বুদ্ধিজীবী। বিপরীতে তুষার সাহেব এতই বাজে লজিক ব্যবহার করছেন ইদানিং, যা অনেকটা স্কুল লেভেলের। স্কুলের বাচ্চারাই তার লজিকের জবাব দেয়ার জন্য 'মোর দ্যান অ্যানাফ'। আব্দুন নূর তুষার সাহেবের প্রতি আমি কিছুটা দুর্বল ছিলাম। কারণ তিনি আমার পুত্রহত্যার বিচারের দাবীতে একটা টকশোতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি বড়ভাই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের স্নেহধন্য। আর যাই হোক, মানুষ হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একজন খাঁটি মানুষ। তার সাথে আমার মত ও পথের পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু তারপরেও তার সততাকে আমি শ্রদ্ধা করি। বয়সে বড় হিসেবে তুষার সাহেবকেও সেই শ্রদ্ধার ভাগ দেয়া যেত, যদি তিনি মত ও পথের পার্থক্য সত্ত্বেও চিন্তায় এবং কর্মে সৎ থাকতেন। 

 

তুষার সাহেব এখন হাত ধুয়ে লেগেছেন ড. ইউনূসের পেছনে। তুষার সাহেবদের একটা গ্যাং গড়ে উঠেছে এই কর্মের জন্য। এখানে সিনিয়র বিশেষণযুক্ত 'সাংবাদিক' ও 'বুদ্ধিজীবী'রা রয়েছেন। এই গ্যাংয়ের এক সদস্য কদিন আগে তিনজনের একটা ছবি পোস্ট করে মন্তব্য করেছেন, এতে নাকি অনেকের জ্বালা ধরবে। কথাটা মিথ্যা নয়, সন্তানহানা পিতা, পিতাহারা পুত্র, ভাইহারা বোনদেরএমন ছবি দেখলে জ্বালা ধরবেই। এতে লুকোছাপার কিছু নেই। হত্যাকারী, তাদের দোসর, হত্যার বৈধতা উৎপাদনকারীদের দেখলে না জ্বালা ধরাটাই অস্বাভাবিক। নবারুণ ভট্টাচার্য যেমন বলেছিলেন, 'যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়/ আমি তাকে ঘৃণা করি- যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে/ আমি তাকে ঘৃণা করি- যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী/ প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না/ আমি তাকে ঘৃণা করি'। সুতরাং জ্বালা ধরাটাই সঙ্গতই, না হলে তারা ঘৃণার যোগ্য। তবে, রাষ্ট্রব্যবস্থার এখানে একটা দায়িত্ব রয়েছে। জ্বালা ধরানো এমন ছবির বারবার প্রদর্শনে যে ক্ষোভ তা বিস্ফোরিত হবার আগেই ব্যবস্থা নেয়া সেই দায়িত্বের একটা ভাইটাল অংশ। 

 

জুলাইকে যারা মেটিকুলাস ডিজাইন বলেন, তাদের সাথে বরাবরই আমি একমত। কারণ নিখুঁত পরিকল্পনা ছাড়া জগদ্দল পাথরের মতন চেপে বসা একটা ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন কোনোভাবেই সম্ভব না। মেটিকুলাস শব্দটিই ইতিবাচক। এবিষয়ে আমার লেখা রয়েছে, তাই নতুন করে লিখতে চাচ্ছি না। কিন্তু এই যে ড. ইউনূস এবং তার অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রপাগান্ডা তারও একটা নির্দিষ্ট ডিজাইন রয়েছে। সেই ডিজাইন অবশ্যই মেটিকুলাস তথা ইতিবাচক নয়। সে ডিজাইন স্যাটানিক ডিজাইন, নেতিবাচক ডিজাইন, অশুভ ডিজাইন। 

 

কী সেই ডিজাইন এবং তার মূল লক্ষ্য কী? এই ডিজাইনের মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান বিএনপি সরকার ও তার প্রধান তারেক রহমান। অনেকে বলবেন, কই তারা তো তারেক রহমানের বিরোধীতা করেন না, করেন ড. ইউনূসের, জুলাইয়ের। ডিজাইনটা এইখানেই। বিএনপি আজকে সরকারে, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী তার প্রায়োগিক কারণ হলো জুলাই। জুলাই বিপ্লব না ঘটলে বিএনপি সরকারে থাকতো না তারেক রহমানও প্রধানমন্ত্রী হতেন না। এটা অস্বীকারের কোনো জো নেই। সুতরাং তারেক রহমানের বৈধতা টিকে আছে জুলাইয়ের উপর। যেটা আওয়ামী লীগ স্বীকার করে না। তারা ড. ইউনূসকে অবৈধ সরকার বলে এবং বিএনপি সরকারকেও তাই। সুতরাং ওই গ্যাংয়ের প্রথম কাজ হলো, ড. ইউনূস এবং জুলাইয়ের তরুণ তুর্কিদের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ তৈয়ার করা। আর তাদের অনুগত মিডিয়ার মাধ্যমে সেই ন্যারেটিভকে প্রতিষ্ঠিত করা। অনুগত মিডিয়া নিয়ে আর কথা না বলি। আমরা জানি এসব মিডিয়া কাদের এবং তারা কারা। প্রমাণিত বিষয় নিয়ে শব্দ বাড়াই না। জোসেফগোয়েবলস মানে হিটলারের তথ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, 'একটা মিথ্যাকে একশবার বললে তা সত্য বলে বিশ্বাস করে মানুষ'। গোয়েবলস'র এর নয়া সংস্করণ হচ্ছে গ্যাংয়ের অনুগত মিডিয়া। মিডিয়া জানে, গ্যাংস্টাররা মিথ্যা বলছেন, তারপরও তাদের জায়গা করে দেয়। কারণ গোয়েবলস'র সেই সূত্র, মিথ্যাকে বারবার বলা। শুভ'র বিপরীতে অশুভকে প্রতিষ্ঠা করা। 

 

এই মিথ্যা বলেই তারা জুলাইয়ের তরুণ তুর্কি আর ড. ইউনূসকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জুলাইয়ের সমুখযোদ্ধারা এবং জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সরকার বিতর্কিত হলে জুলাই বিপ্লব বিতর্কিত হবে। জুলাই বিপ্লব বিতর্কিত হলে বর্তমান সংসদ যে নির্বাচনে গঠিত তা বিতর্কিত হবে এবং বৈধতা সংকটে পড়বে। সাথে বৈধতা সংকট হবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর। এটা কঠিন কোনো বিষয় নয়। এটা বুঝতে জাফর ইকবাল হতে হয় না। খুব সরল কিন্তু কুটিল একটি সমীকরণ। একটি স্যাটানিক ডিজাইন। জুলাইয়ের মেটিকুলাস ডিজাইনের শুদ্ধতার বিপরীতে একটি অশুদ্ধ, অশুভ স্যাটানিক ডিজাইন। 

 

গ্যাং আর গ্যাংস্টারদের কথা থাক। আসি 'আমি তো এমনি এমনি খাই'দের আলাপে। একসময় হরলিকসের একটি জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন ছিল, যাতে একজন শিশুকে বলতে শোনা যেত 'আমি তো এমনি এমনি খাই'। অর্থাৎ শিশুটি হরলিকসের উপাদান বিষয়ে জানে না, কিন্তু খেতে ভালো লাগে বলে খায়।আমাদের এমনি একটি 'শিশুগোষ্ঠী' তৈরি হয়েছে, যারা এমনি এমনি জুলাইয়ের সমালোচনায় নেমেছে। এরা নেমেছে মূলত হীনম্মন্যতা থেকে। কারণ জুলাইয়ে এদের কোনো ভূমিকা ছিলো না। বিপ্লবের কোনো দৃশ্যচিত্রে তাদের দেখা যায়নি। কিন্তু জুলাই পরবর্তীতে 'মোর দ্যান জুলাই' সাজতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। ফলে তারা সেই হীনম্মন্যতা থেকেই জুলাইকে ওউন করতে পারছে না। বরং জুলাই বিপ্লবীদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে অক্ষম ঈর্ষা থেকে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, তাদের অংশগ্রহণ না থাক, তারা সেসময় ফ্যাসিজমের বিপক্ষে ছিল। সমুখ সমরে হয়তো ছিল না, কিন্তু মনে মনে তো বিরুদ্ধে ছিল। যদিও এটা দুর্বল ঈমানের অংশ, তবুও তো ছিল। সুতরাং সেই সমর্থনটাও তো গৌরবের। নিজেদের এই গৌরব প্রকাশ না করে, 'উল্টো বুঝলিরে রাম' অবস্থা হলে তো, নিজেদের বৈধতারও সংকট তৈরি হবে। ইতোমধ্যে সেই সংকটের আভাসই পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

 

যারা এই বৈধতার সংকট তৈরি করতে চাচ্ছেন, তাদের মূল লক্ষ্য হলো বিএনপি এবং তারেক রহমান, এর বাইরে কোনো সত্য নেই। জামায়াত-এনসিপি জোট বিএনপির জন্য বড় কোনো থ্রেট নয়। এই জোট নিজেরাও জানে, বিএনপি ফেল করলে পুরো দেশটাই সংকটে পড়বে। আরেক লেখায় হয়তো লিখবো সেই সংকটের কথা। বিরোধী জোট বিরোধীতা করবে, মিছিল করবে, সমাবেশ করবে এর পুরোটাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। বরং এতে সরকারের বৈধতা উৎপাদন হবে। বিশ্ব জানবে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলমান। কিন্তু স্যাটানিক ডিজাইনে জুলাইয়ের বৈধতাকে যারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে, তাদের সেই পরিকল্পনা সফল হলে, সরকারিদল বা বিরোধীদল সবাই বৈধতা সংকটে পড়বে। হ্যাঁ, বিরোধীদলও পড়বে বৈধতার সংকটে। কারণ তারা জুলাই, জুলাই পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এবং সেই সরকারের দেয়া নির্বাচনের মাধ্যমেই বিরোধীদল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। এই প্রক্রিয়া চালুল থাকলে তারাও হয়তো সরকারে যেতে পারবে এবং সেই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সুতরাং জুলাইয়ের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং তা নিজেদের স্বার্থেই। দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এই ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নাই। 

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন