https://www.prothomalony.com/
17936
opinion
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ ০২:২৩
একসময় আমেরিকান তরুণদের বড় হয়ে ওঠার গল্পটা ছিল অনেকটা সরলরেখার মতো। স্কুল শেষ হবে, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, তারপর চাকরি। চাকরি পাওয়ার পর বাবা-মায়ের বাড়ি ছেড়ে নিজের একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্ট। এরপর বিয়ে, সংসার এবং একসময় নিজের একটি বাড়ি।
স্বাধীনভাবে বসবাস করাটাই যেন ছিল প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার অন্যতম প্রতীক। সেই চেনা ছবিটাই এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ৩০ বছরের কম বয়সী আমেরিকানদের প্রায় ৪৯ শতাংশ বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করছিলেন। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুই তরুণের একজন এখনো বাবা-মায়ের বাড়িতে।
আরও বিস্ময়কর হলো, এটি শুধু বেকার তরুণদের গল্প নয়। রিয়েল্টর ডটকমের গবেষণা অনুযায়ী, বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাসকারী ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের প্রায় ৭০ শতাংশই কর্মজীবী। তারা চাকরি করছেন, নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। তারপরও আলাদা একটি সংসার শুরু করা তাঁদের অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আজকের একজন আমেরিকান তরুণ হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে ভালো একটি চাকরি শুরু করছেন। কিন্তু কর্মজীবনের প্রথম দিন থেকেই তাঁর সঙ্গে রয়েছে কয়েকটি অদৃশ্য বোঝা। শিক্ষাঋণ, গাড়ির কিস্তি, ক্রেডিট কার্ডের ঋণ, স্বাস্থ্যবিমা, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ক্রমবর্ধমান মূল্য—এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আকাশছোঁয়া বাড়ির দাম ও ভাড়া।
রিয়েল্টর ডটকমের হিসাবে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাড়ির মধ্যম মূল্য ছিল প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার ডলার। ২০১৯ সালের তুলনায় যা ৩৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
বাড়ি কেনা সম্ভব না হলে ভাড়া? সেখানেও স্বস্তি নেই। ২০২৫ সালে দেশটিতে মধ্যম চাহিদাভিত্তিক ভাড়া ছিল মাসে প্রায় ১ হাজার ৬৭৩ ডলার—২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট, খাবার, গাড়ি ও বিমার খরচ যোগ করলে কর্মজীবনের শুরুতে থাকা একজন তরুণের জন্য একা একটি সংসার চালানো কতটা কঠিন, সেটি সহজেই অনুমান করা যায়। অর্থনীতির একটি নতুন বাস্তবতা তাই আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে— চাকরি থাকা আর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আলাদা সংসার চালানোর সামর্থ্য থাকা এখন আর একই কথা নয়।
আগের প্রজন্মের সঙ্গে আজকের তরুণদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো ঋণের ধরন। বয়স্ক আমেরিকানদের ঋণের বড় অংশ সাধারণত গৃহঋণ। সেই ঋণের বিপরীতে অন্তত একটি সম্পদ তৈরি হয়। কিন্তু তরুণদের ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষাঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণ। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে প্রথম চাকরির বেতন পাওয়ার আগেই ভবিষ্যতের আয়ের একটি অংশের ওপর দাবি তৈরি হয়ে গেছে।
তাই কাগজে একজন তরুণের আয় মোটামুটি ভালো মনে হলেও তাঁর হাতে খরচ করার মতো অর্থ অনেক কম থাকতে পারে।
তাহলে কি এই প্রজন্ম ব্যর্থ? - আমার কাছে এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা একজন ২৮ বছরের তরুণকে দেখে আমরা খুব সহজেই বলতে পারি—‘এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি।’ কিন্তু বাস্তবতা হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি প্রতিদিন কাজে যাচ্ছেন। নিজের শিক্ষাঋণ পরিশোধ করছেন। বাবা-মায়ের গৃহঋণে সাহায্য করছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নিজের বাড়ির প্রাথমিক অর্থের জন্য সঞ্চয় করছেন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা তরুণদের ৭২ শতাংশই পরিবারের খরচে কোনো না কোনোভাবে আর্থিক অবদান রাখেন। তাঁদের একটি বড় অংশ বাড়ির ভাড়া বা গৃহঋণের কিস্তি পরিশোধেও সাহায্য করেন। তাই বাবা-মায়ের বাড়িতে থাকা মানেই বাবা-মায়ের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটানো—এই ধারণা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
আমাদের বাঙালি সমাজে ছবিটি অবশ্য নতুন নয়। একজন বাঙালি হিসেবে এই পরিবর্তন আমার কাছে আরেকটি কারণে বেশ আকর্ষণীয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকবে—এটি কখনোই অস্বাভাবিক ছিল না। চাকরি করার পরও সন্তান একই পরিবারে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের পরও কয়েক প্রজন্ম একই ছাদের নিচে বসবাস করে।
আমেরিকায় বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে ভিন্ন। এখানে ১৮ বছর বয়সের পর থেকে নিজের জীবন নিজে গড়ে তোলাকে ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। নিজের অ্যাপার্টমেন্ট, নিজের গাড়ি, নিজের বিল—এগুলো শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এগুলো ছিল প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সাংস্কৃতিক প্রতীক। কিন্তু অর্থনীতি এখন সেই সংস্কৃতিকেও বদলে দিচ্ছে। এক অর্থে আমেরিকান পরিবার হয়তো আবার কিছুটা বহু-প্রজন্মের পরিবারের দিকে ফিরে যাচ্ছে।
একসঙ্গে থাকা কখন আশীর্বাদ হতে পারে। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা সব সময় নেতিবাচক নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি একজন তরুণের জীবনে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। ধরা যাক, একজন তরুণ আলাদা বাসায় থেকে মাসে দুই হাজার ডলার ব্যয় না করে কয়েক বছর বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকলেন। পরিবারের খরচে নিজের ন্যায্য অংশ দিলেন, পাশাপাশি শিক্ষাঋণ দ্রুত পরিশোধ করলেন, ক্রেডিট কার্ডের ঋণ কমালেন, জরুরি তহবিল তৈরি করলেন এবং নিজের ভবিষ্যৎ বাড়ির জন্য সঞ্চয় করলেন। তাহলে এই কয়েক বছর তাঁর স্বাধীনতা হারানোর সময় নয়। বরং ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার ভিত তৈরির সময়। এমনকি একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে গৃহঋণ ও পারিবারিক খরচ বহন করলে পরিবারের সম্পদও পরিবারের মধ্যেই থেকে যেতে পারে।
তবে একটি প্রশ্ন জরুরি। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা ভালো না খারাপ—আমার মনে হয় প্রশ্নটি এভাবে করা ঠিক নয়।বরং প্রশ্ন করা উচিত— তরুণটি কোথায় থাকছেন, সেটি নয়; তিনি কোথায় যাচ্ছেন? তাঁর কি একটি পরিকল্পনা আছে? তিনি কি ঋণ কমাচ্ছেন? সঞ্চয় করছেন? নিজের কর্মদক্ষতা বাড়াচ্ছেন? ভবিষ্যতে স্বাধীন হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন? নাকি কোনো লক্ষ্য ছাড়াই বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘায়িত করছেন?
প্রথমটি একটি বুদ্ধিমান অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। দ্বিতীয়টি অবশ্যই উদ্বেগের।
এখানে বাবা-মায়েরও দায়িত্ব আছে। সন্তান বাড়িতে থাকলে পারিবারিক খরচে তার ভূমিকা কী হবে, সে কতটা সঞ্চয় করবে, নিজের দায়িত্ব কতটা নেবে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী—এসব নিয়ে পরিবারের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা থাকা প্রয়োজন।
এটি শুধু তরুণদের সমস্যা নয়। এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। ৩০ বছরের কম বয়সী প্রায় অর্ধেক মানুষ বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন—এটিকে শুধু একটি প্রজন্মের আচরণ হিসেবে দেখলে আমরা বড় ছবিটা হারিয়ে ফেলব। এটি একই সঙ্গে আবাসন সংকট, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষাঋণ, আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের গল্প। যখন একজন পূর্ণকালীন কর্মজীবী তরুণও একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে কিংবা ছোট একটি বাড়ি কিনতে হিমশিম খান, তখন শুধু তাঁকে ‘স্বাবলম্বী হও’ বললে সমস্যার সমাধান হয় না।
প্রশ্ন তুলতে হবে—একজন কর্মজীবী মানুষের আয়ের তুলনায় আবাসনের মূল্য কতটা বেড়েছে? উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে তরুণেরা কতটা ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন? পর্যাপ্ত নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে কি না? এবং একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়ির মালিক হওয়া ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে কি না?
আমাদের প্রজন্মের কাছে সাফল্যের একটি পরিচিত সংজ্ঞা ছিল—পড়াশোনা শেষ করো, চাকরি নাও, নিজের বাড়ি করো, সংসার শুরু করো। নতুন প্রজন্ম হয়তো একই গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইছে, কিন্তু পথটি তাদের জন্য অনেক বেশি দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। তাই ২৮ বা ৩০ বছর বয়সে একজন তরুণ বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন শুনেই তাঁকে ব্যর্থ ভাবার সময় সম্ভবত শেষ হয়েছে।
আজকের বাস্তবতায় বাবা-মায়ের বাড়ি কখনো কখনো আশ্রয় নয়, হতে পারে একটি অর্থনৈতিক কৌশল; পিছিয়ে যাওয়ার জায়গা নয়, হতে পারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির জায়গা। তবে শর্ত একটাই—সেই থাকার মধ্যে থাকতে হবে দায়িত্ব, সঞ্চয়, পরিকল্পনা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য। কারণ শেষ পর্যন্ত একজন তরুণ কোন বাড়িতে থাকছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ— তিনি তাঁর জীবনটাকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
# ডাঃ বি এম আতিকুজ্জামান - কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হাসপাতাল, ফ্লোরিডা, ইউএসএ। শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক
অভিমত থেকে আরো পড়ুন