https://www.prothomalony.com/
17935
north-america
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ ০২:১৮
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বুধবার প্রকাশিত নতুন তথ্য-উপাত্তে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অভিবাসন পথে মৃত্যুর সংখ্যা তীব্রভাবে বেড়েছে। সংস্থাটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চরম আবহাওয়া, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন। এই কয়েকটি কারণ মিলিয়েই বঙ্গোপসাগর থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে ভালো জীবনের খোঁজে বেরোনো মানুষদের যাত্রাপথ নতুনভাবে পাল্টে দিয়েছে। যাদের অনেকেই পথে পাচারকারী বা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
আইওএমের উপমহাপরিচালক উগোচি ড্যানিয়েলস বলেন, বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৩০ কোটির বেশি আন্তর্জাতিক অভিবাসীর প্রায় অর্ধেকই মূলত নিজ অঞ্চলের মধ্যেই কাজ, পরিবার, শিক্ষা বা নিরাপত্তার খোঁজে চলাচল করেন। যদিও গণমাধ্যমের নজর সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু পথের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সঠিক তথ্য-উপাত্ত নিজে থেকে সমাধান নয়। কিন্তু তথ্য ছাড়া কোনো সমাধানও সম্ভব নয়। মানুষের জীবন বাঁচানো কোনো একক দেশের একার দায়িত্ব নয়, বরং তা যৌথ দায়িত্ব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু পথে অভিবাসীর সংখ্যা কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা বরং বেড়েছে। যা থেকে আইওএম কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, কম মানুষ পৌঁছানো মানেই যাত্রাপথ নিরাপদ হয়ে ওঠা নয়। মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে ৮২১ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। যা আগের তুলনায় ১১১ শতাংশ বেশি। যদিও এই পথে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা কমেছে ৪৬ শতাংশ। দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৭৭ জনে। এই মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি ঘটেছে শুধু জানুয়ারি মাসেই। যখন ওই অঞ্চলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় হ্যারি। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথেও মৃত্যুর সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৪ জনে। যার অনেকটাই ক্রিট দ্বীপের কাছাকাছি দুর্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথ দিয়ে স্পেনে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। মূলত সেউতা ও মেলিয়ায় স্থলপথে পারাপারের সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায়। অন্যদিকে পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক পথে স্পেনে পৌঁছানোর সংখ্যা ইউরোপের যেকোনো পথের তুলনায় সবচেয়ে বেশি কমেছে। ৭৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৭৬ জনে, কারণ যাত্রা শুরুর স্থান আরও দক্ষিণে সরে যাওয়ায় পথ দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া হর্ন অব আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলীয় পথ দিয়ে ইয়েমেনে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৯ শতাংশ। আর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে লেবাননে নতুন করে বড় ধরনের বাস্তুচ্যুতি এবং সিরিয়ায় সীমান্ত পেরিয়ে ফেরার সংখ্যাও বেড়েছে।
এই প্রতিবেদনের পাশাপাশি জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের নিযুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সহায়তায় জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। জুন মাসের শেষ দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রওনা হওয়া দুটি নৌকা মিয়ানমারের উপকূলে ডুবে যাওয়ার খবরের পর এই আহ্বান আসে। যেখানে ৫০০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন বলে জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়েছিলেন। যারা প্রায়ই মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে। এরমধ্যে আনুমানিক ৯০০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যাদের প্রায় ৬৬ শতাংশই নারী ও শিশু। জাতিসংঘ নিযুক্ত বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, প্রতি সাতজনের একজন আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় নিখোঁজ হয়েছেন বা মারা গেছেন। যা বিশ্বের যেকোনো শরণার্থী ও অভিবাসী সমুদ্রযাত্রা পথের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভাগ করা দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানব পাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং সুরক্ষা সেবা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগসহ মানবাধিকারভিত্তিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই সংকটের প্রকৃত আকার আরও স্পষ্ট করে তোলে। কক্সবাজার জেলার ৩৩টি ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ ৫৬ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। যাদের মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশই শিশু। এ ছাড়া নোয়াখালীর ভাসানচর দ্বীপে সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর করা হয়েছে। যাতে মূল শিবিরগুলোর ওপর চাপ কিছুটা কমানো যায়। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের মুখে একযোগে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবির হিসেবে পরিচিতি পায়। মাত্র ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস।
ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, গত দেড় বছরে রাখাইন রাজ্যে টার্গেট করা সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে এসে পৌঁছেছেন। যা ২০১৭ সালের পর মিয়ানমার থেকে সবচেয়ে বড় নতুন অভিবাসন-স্রোত। বৈশ্বিক তহবিল সংকটের কারণে এই নতুন আগতদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ত্রাণসামগ্রীর ব্যবস্থা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে। সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭৪টি নৌকায় করে ৭ হাজার ১১৭ জন রোহিঙ্গা সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়েছিলেন। যাদের মধ্যে ৫ হাজার ৮১৭ জন নিরাপদে পৌঁছাতে পেরেছেন, ৫৭৩ জন মৃত বা নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন। ৭২৭ জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো অজানা।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ক্রমেই সংকটাপন্ন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে। আর একই সময়ে অন্তত ৭০ হাজার মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৮ শতাংশই এখন বাংলাদেশে আশ্রিত। বাকিদের একটি বড় অংশ আছেন মালয়েশিয়া ও ভারতে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন