https://www.prothomalony.com/

17939

north-america

উত্তর আমেরিকা

নীরবতা ভেঙে লুইজি মানজিওনি বললেন: “আমি মিস্টার থম্পসনকে গুলি করেছিলাম”

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০০:৪৮

           

ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতকক্ষে ১৪ আগস্ট শুক্রবার সকাল তখন থমথমে। গ্যালারির দ্বিতীয় সারিতে বসে আছেন ব্রায়ান থম্পসনের বিধবা স্ত্রী পলেট থম্পসন ও পরিবারের সদস্যরা। বেইজ রঙের কারাগারের পোশাকে, কনুই পর্যন্ত গোটানো সাদা হাতাওয়ালা শার্ট পরে, হাত মুক্ত কিন্তু পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় আদালতকক্ষে প্রবেশ করেন ২৮ বছর বয়সী লুইজি মানজিওনি। থম্পসনের স্বজনদের তীব্র দৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি নিজের আসনে বসেন। আইনজীবীদের সঙ্গে একটি নথি মনোযোগ দিয়ে পড়ে তাতে সই করেন।

এরপর যা ঘটে, তা প্রায় দুই বছর ধরে চলা এক আলোচিত মামলার নাটকীয় মোড়। বিচারক মার্গারেট গার্নেটের সামনে দাঁড়িয়ে লিখিত এক চিরকুট থেকে পড়ে মানজিওনি স্বীকার করেন, “আমি ম্যানহাটনে মিস্টার থম্পসনকে গুলি করেছিলাম, আর তিনি মারা যান।”

আন্তঃরাজ্য স্টকিং-সংক্রান্ত ফেডারেল অভিযোগে তিনি দোষ স্বীকার করেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ম্যানহাটনের রাস্তায় ইউনাইটেডহেলথকেয়ারের প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান থম্পসনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এই অভিযোগে তাঁর সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এই কথা শুনে মানজিওনি সামান্য মাথা নাড়েন। গ্যালারিতে নীরবে কাঁদতে থাকেন থম্পসনের বিধবা স্ত্রী।

আদালতে পড়ে শোনানো তাঁর লিখিত বক্তব্যে উঠে আসে পরিকল্পনার খুঁটিনাটি বিবরণ। বছরের পর বছর তীব্র পিঠের ব্যথায় ভোগা এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া স্বাস্থ্যবিমা শিল্পের প্রতি ক্ষোভের কথা জানান তিনি। মানজিওনি জানান, ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে ইউনাইটেডহেলথকেয়ারের বার্ষিক সম্মেলনের তথ্য জোগাড় করতে তিনি নিজেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনাকারী একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারী সাজিয়ে কোম্পানির নেতৃত্বের কাছে ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন।

“নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে আমি থ্রিডি প্রিন্টার দিয়ে একটা বন্দুক বানিয়েছিলাম,” তিনি বলেন, “সাইলেন্সার আর ম্যাগাজিন লাগিয়ে সেটা প্রস্তুত করেছিলাম।”

আদালতকক্ষে যে দৃঢ়তা তাঁর তথাকথিত ‘ইশতেহারে’ ফুটে উঠেছিল বলে কৌঁসুলিরা দাবি করেন, সেই দৃঢ়তা যেন মিলিয়ে গিয়েছিল শুক্রবারের এই শুনানিতে। গলা কিছুটা ধরে আসছিল তাঁর। প্রশ্নের জবাবে একের পর এক শুধু “হ্যাঁ” বলে যাচ্ছিলেন।

মূলত জানুয়ারিতে যে ফেডারেল বিচার শুরু হওয়ার কথা ছিল, এই দোষ স্বীকারের মধ্য দিয়েই তা থেমে গেল। এখন আগামী ১৮ ডিসেম্বর তাঁর সাজা ঘোষণার শুনানি হবে।

তবে এখানেই শেষ নয় মানজিওনির আইনি লড়াই। নিউইয়র্ক রাজ্য আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে এখনো দ্বিতীয়-মাত্রার হত্যা, জাল দলিল রাখা এবং একাধিক অস্ত্র রাখার অভিযোগ বহাল আছে। যার জুরি বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা আগামী ৮ সেপ্টেম্বর।

শুনানি শেষে তাঁর আইনজীবীরা নিশ্চিত করেছেন, রাজ্য আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে তা ‘ডাবল জেপার্ডি’ বা একই অপরাধে দ্বিতীয়বার বিচারের শামিল হবে—এই যুক্তি দেখিয়ে তাঁরা আবেদন করবেন। বিচারক গার্নেট এদিন সতর্ক করে দেন, রাজ্য আদালতের সম্ভাব্য সাজা ফেডারেল সাজার সঙ্গে পরপর কার্যকর হতে পারে।

কৌঁসুলিদের ভাষ্যমতে, মানজিওনি তাঁর ‘ইশতেহারে’ লিখেছিলেন, থম্পসনকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল ‘মরণঘাতী, লোভে চালিত স্বাস্থ্যবিমা কার্টেলের’ বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া গুলির খোসায় খোদাই করা ছিল ‘ডিলে’ আর ‘ডিনাই’ শব্দ দুটি। বিমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের দাবি এড়াতে যে ভাষা ব্যবহার করে বলে অভিযোগ, তারই ইঙ্গিত। কৌঁসুলিদের দাবি, তিনি লিখেছিলেন, বিমা শিল্পের অন্যান্য শীর্ষ নির্বাহীরাও তাঁর লক্ষ্যবস্তু হতে পারতেন।

কারণ, এই শিল্প “আক্ষরিক অর্থেই টাকার বিনিময়ে মানুষের জীবনীশক্তি নিংড়ে নেয়।”

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ম্যানহাটনের এক হোটেলের বাইরে গুলিবিদ্ধ হয়ে থম্পসনের মৃত্যুর পর পাঁচ দিনের এক  পেনসিলভানিয়ার একটি ম্যাকডোনাল্ডসে ব্রেকফার্স্ট খাওয়ার সময় স্থানীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন মানজিওনি।

মেরিল্যান্ডের এক স্কুলের সাবেক এই শিক্ষার্থী তখন থেকেই আমেরিকার উগ্র বামপন্থী মহলে এক ধরনের ‘লোকনায়ক’ খ্যাতি পেয়ে গেছেন—যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতাকে বিকৃতভাবে লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে।

এদিন আদালত প্রাঙ্গণের বাইরেও তার প্রমাণ মিলল। শুনানি শেষে এক ব্যক্তি গাড়িতে করে যেতে যেতে চিৎকার করে বলে ওঠেন—

“আমেরিকা লুইজিকে ভালোবাসে!”

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন