https://www.prothomalony.com/
17857
opinion
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ ০২:০৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাসন, প্রত্যাবর্তন এবং বিচার বারবার একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরা যেমন ছিল একটি জাতির পুনর্জন্মের প্রতীক, তেমনি আজকের বাংলাদেশে আরেকটি প্রশ্ন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। ভারতের অবস্থান থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কী হতে পারে?
এই দুই সময়ের ইতিহাসকে এক করে দেখা যায় না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অবিসংবাদিত নেতা, যিনি বিদেশি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি একটি অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক, ফৌজদারি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। গণমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে যে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে বিচার চলছে বা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে কোনো মামলায় চূড়ান্ত রায় হয়েছে, কোনো মামলায় আপিলের সুযোগ রয়েছে এবং কোনো অভিযোগ এখনো বিচারাধীন, তা আদালতের নথিই নির্ধারণ করবে। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিকে আইনগতভাবে দোষী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এটিই ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন। শেখ হাসিনা নিজে একাধিকবার দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ এখনো তার নেতৃত্বকে ঘিরে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে তার প্রত্যাবর্তন কেবল একটি আইনি ঘটনা হবে না; এটি একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি যদি দেশে ফেরেন, তাহলে কী হতে পারে?
আইনের দৃষ্টিতে, তার বিরুদ্ধে যদি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হবে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। এরপর তাকে আদালতে হাজির করা হবে এবং প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী জামিন, বিচার ও অন্যান্য বিষয় নিষ্পত্তি হবে। যদি কোনো মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় থেকেও থাকে, সেটি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের অনুমোদন, আপিল এবং রিভিউসহ একাধিক বিচারিক ধাপ অতিক্রম না করা পর্যন্ত কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন আসে না। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকলেও সেটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয় না; সংবিধান ও প্রচলিত আইনে অভিযুক্তের একাধিক আইনি অধিকার সংরক্ষিত থাকে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও জটিল। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন তাঁর সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে নতুন বিতর্ক ও উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সংলাপ এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা তখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যদি আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগেই জনমতের আদালতে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। আবার আইনের শাসনের প্রশ্নে কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য আলাদা মানদণ্ডও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আইনের সামনে সবাই সমান, এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে। বাংলাদেশের জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি শেখ হাসিনাকে আবারও রাজনীতিতে দেখতে চায়, তাহলে রাষ্ট্রের অবস্থান কী হওয়া উচিত? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো রাজনৈতিক নেতার গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করেন ভোটাররা, আদালত নয়। আবার আদালত নির্ধারণ করেন না কে জনপ্রিয়; আদালতের কাজ হলো আইন প্রয়োগ করা। ফলে জনপ্রিয়তা ও আইনি জবাবদিহি দুটি ভিন্ন বিষয়। কোনো ব্যক্তি জনপ্রিয় হলেই তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন, আবার তাঁর বিরুদ্ধে মামলা থাকলেই জনগণের রাজনৈতিক সমর্থনের অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায় না। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই একটি পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয়।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের নীতি হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্নে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ না করা, তবে নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা। শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদার ছিলেন। সে কারণে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের জন্য একটি মানবিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব হতে পারে। কিন্তু তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, কিংবা কীভাবে ফিরবেন, সেটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। ভারতের পক্ষে সরাসরি বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা বাস্তবসম্মতও নয়, কূটনৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়।
এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় শেখ হাসিনার নিরাপদে দেশত্যাগের ঘটনায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। তবে এ ঘটনাকে তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বা আইনি অবস্থানের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে এটি তার দেশে ফেরার সাংবিধানিক অধিকারও বাতিল করে না। তিনি যদি দেশে ফিরতে চান, তবে তা আইনের কাঠামোর মধ্য দিয়েই হতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের জন্যও একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, একজন বাংলাদেশের নাগরিক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইনের সমান সুরক্ষা দিতে হবে। তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে শেখ হাসিনারও উচিত হবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া এবং রাজনৈতিক লড়াইকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালনা করা।
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস আমাদের জাতীয় গৌরবের অংশ। কিন্তু সেই ইতিহাসকে বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করতে গেলে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, ১৯৭২ সালে প্রশ্ন ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা; আজকের প্রশ্ন একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে আইনের শাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কতটা শক্তিশালী।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, শেষ পর্যন্ত জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে তাদের মত প্রকাশ করে এবং আদালত আইনের ভিত্তিতে বিচার করে। জনগণের রায় ও আইনের শাসন কখনোই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করবে ব্যক্তি বা দলের বিজয়ের ওপর নয়, বরং রাষ্ট্র কতটা নিরপেক্ষভাবে আইন, বিচার এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমানভাবে সম্মান জানাতে পারে তার ওপর।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কখন ফিরবেন, কিংবা তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর পরিণতি কী হবে, তার উত্তর শেষ পর্যন্ত দেবে আদালত, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সময়। কিন্তু একটি বিষয় আজই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র কখনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় পায় না; বরং আইনের শাসনের মাধ্যমে নিজের শক্তির প্রমাণ দেয়। আর একটি পরিণত গণতন্ত্রের আসল পরিচয় হলো, সেখানে বিচার আদালতে হয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হয় জনগণের আদালতে, এবং ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় লেখেন দেশের মানুষ।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন