https://www.prothomalony.com/

17848

opinion

অভিমত

৫ আগস্টে রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান: জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এ অন-ডিউটিতে জীবন উৎসর্গকারী পুলিশ সদস্যদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মান জানানো হোক

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ ০৮:২৯

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, গণতান্ত্রিক ও মানবিক—তার অন্যতম মানদণ্ড হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন রক্ষায় জীবন উৎসর্গকারী ব্যক্তিদের প্রতি সেই রাষ্ট্র কতটা সম্মান প্রদর্শন করে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে অন-ডিউটিতে নিহত পুলিশ সদস্যদের কেবল সরকারি কর্মচারী হিসেবে নয়; বরং সংবিধান, আইনের শাসন এবং নাগরিক নিরাপত্তার রক্ষক হিসেবে জাতীয়ভাবে স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ, সম্মান ও জবাবদিহি—দুটি পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দুটি অপরিহার্য ভিত্তি।

জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাবলি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবহ অধ্যায়গুলোর একটি। এই সময়ে বহু বেসামরিক নাগরিক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারান। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্য কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হন। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য ও উপসংহারের কিছু দিক নিয়ে দেশে-বিদেশে ভিন্নমত ও বিতর্ক রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই—**প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

এই বাস্তবতার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি অন-ডিউটিতে নিহত পুলিশ সদস্যদের প্রতি যথাযথ জাতীয় সম্মান প্রদর্শন করেছে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উত্তর হওয়া উচিত—হ্যাঁ। কারণ পুলিশ সদস্য যখন ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করতে বের হন, তখন তিনি কেবল একটি চাকরি করেন না; তিনি রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান এবং নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রেই এই দায়িত্ব পালনের চূড়ান্ত মূল্য হয় নিজের জীবন।

বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এই আত্মত্যাগকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করে। কানাডায় প্রতি বছর **Canadian Police and Peace Officers' Memorial**-এ অন-ডিউটিতে নিহত পুলিশ সদস্যদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা হয়। অটোয়ায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে তাদের নাম সংরক্ষিত থাকে। সরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয় এবং রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (RCMP)সহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজে অংশ নেন। নিহত সদস্যদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা, সন্তানদের শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। রাষ্ট্র এভাবেই ঘোষণা করে—যিনি দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাঁর পরিবার রাষ্ট্রের দায়িত্বের বাইরে নয়।

যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্রতি বছর "National Police Week?" এবং "National Peace Officers Memorial Day" উপলক্ষে ওয়াশিংটন ডিসিতে হাজারো পুলিশ কর্মকর্তা সমবেত হন। National Law Enforcement Officers Memorial-এ কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত সদস্যদের নাম সংরক্ষিত থাকে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, গার্ড অব অনার, 'লাস্ট কল' অনুষ্ঠান এবং পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা—এসব কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এগুলো জাতীয় কৃতজ্ঞতার প্রতীক।

যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশেও একই নীতি অনুসৃত হয়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানানো হয়, কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও স্বাধীন তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ, **সম্মান কখনো জবাবদিহির বিকল্প নয় এবং জবাবদিহিও সম্মানকে অস্বীকার করে না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই নীতিই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনায় যারা বেসামরিক নাগরিক হিসেবে নিহত হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার যেমন অপরিহার্য, তেমনি অন-ডিউটিতে নিহত পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগকেও সমান মর্যাদায় স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এক পক্ষের মৃত্যু স্মরণ করে অন্য পক্ষকে উপেক্ষা করা জাতীয় পুনর্মিলন ও আইনের শাসনের চেতনাকে দুর্বল করে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জনপ্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা যায়, যে রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা বাহিনীর বৈধ আত্মত্যাগকে সম্মান করে এবং একই সঙ্গে তাদের আইনের আওতায় রাখে, সেই রাষ্ট্রে জনগণের আস্থা, পেশাগত নৈতিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করলে বাহিনীর মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; আবার জবাবদিহির অভাব দায়মুক্তির সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে পারে। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে উভয় নীতির সমন্বয় অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্টকে ঘিরে রাষ্ট্রের প্রতি কয়েকটি নীতিগত আহ্বান জানানো যেতে পারে।

প্রথমত, জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এ অন-ডিউটিতে নিহত পুলিশ সদস্যদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, তাদের স্মরণে একটি স্থায়ী "জাতীয় পুলিশ স্মৃতিসৌধ" অথবা বিদ্যমান স্মৃতিসৌধকে আরও অর্থবহ ও জাতীয় পর্যায়ে মর্যাদাপূর্ণ করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, নিহত সদস্যদের পরিবার, বিশেষ করে সন্তানদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, একই সঙ্গে জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এ সংঘটিত সব ধরনের মৃত্যুর—বেসামরিক নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য উভয়ের—ঘটনায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত নিশ্চিত করা উচিত। এতে সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি এবং জাতীয় পুনর্মিলনের পথ সুগম হবে।

পঞ্চমত, পুলিশ বাহিনীতে মানবাধিকার, বলপ্রয়োগের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং নাগরিক অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকটে আইন প্রয়োগ ও মানবাধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।

বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হতে পারে, যেখানে একদিকে কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গকারী পুলিশ সদস্যরা জাতীয় কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হবেন, অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত যে-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত ও আইনের শাসন নিশ্চিত হবে। এটাই একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয়।

জুলাই–আগস্ট ২০২৪ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক বেদনাময় অধ্যায়। এই অধ্যায় থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি অধিক মানবিক, অধিক জবাবদিহিমূলক এবং অধিক ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন সব ধরনের প্রাণহানির প্রতি সমান মানবিক সংবেদনশীলতা এবং কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গকারী পুলিশ সদস্যদের প্রতি যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান।

যে রাষ্ট্র তার আত্মত্যাগী নাগরিকদের সম্মান দিতে জানে এবং একই সঙ্গে আইনের শাসন ও জবাবদিহিকে সমুন্নত রাখে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন