https://www.prothomalony.com/

17863

north-america

উত্তর আমেরিকা

মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ ভূমিকম্প, নভেম্বরে সিনেট নিয়ন্ত্রণের লড়াই এখন আরও অনিশ্চিত

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ ০৩:১২

মঙ্গলবারের ভোট গণনা শেষে বুধবার সকালে যখন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারির ফলাফল ঘোষণা করেছে। এ ফলাফল আমেরিকার ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় একটি স্পষ্ট ফাটল রেখার প্রকাশ্য স্বীকৃতি। ডা. আবদুল এল-সাইয়িদ মাত্র এক শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে (৪৮.৫ শতাংশ বনাম ৪৭.৫ শতাংশ) পরাজিত করেছেন চার-মেয়াদি কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্সকে। এই সামান্য ব্যবধানের জয় এল-সাইয়িদকে নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, এমন একটি আসনের জন্য যা ছেড়ে দিচ্ছেন অবসরগ্রহণকারী সিনেটর গ্যারি পিটার্স।

এই জয়ের তাৎপর্য বোঝার জন্য একটি সংখ্যা মনে রাখা জরুরি — এল-সাইয়িদ পঁয়ষট্টি মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বহিরাগত অর্থব্যয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে জিতেছেন। যার সিংহভাগ ব্যয় হয়েছিল তার বিরুদ্ধে, স্টিভেন্সের পক্ষে। মিশিগানের জনপ্রিয় গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে স্টিভেন্সকে সমর্থন জানিয়েছিলেন এল-সাইয়িদের উত্থান ঠেকানোর একটি শেষ চেষ্টা হিসেব। কিন্তু তা কাজে আসেনি। জয়ের ভাষণে এল-সাইয়িদ বলেন, "আমরা একটি মেশিনের মুখোমুখি হয়েছিলাম... আমরা প্রমাণ করেছি, আমাদের অনেকের শক্তি তাদের অর্থের শক্তির চেয়ে বড়।" একই রাতে মিশিগানের তেরো নম্বর কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টেও একই ধরনের প্যাটার্ন দেখা গেছে। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী রাজ্য প্রতিনিধি ডোনাভান ম্যাককিনি বর্তমান কংগ্রেসম্যান শ্রী থানেদারকে পরাজিত করেছেন। যা প্রমাণ করে এই প্রগতিশীল ঢেউ মিশিগানে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি বিস্তৃত প্রবণতা।

 এই জয়ের উদযাপনের মধ্যেও দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষত স্পষ্ট। স্টিভেন্স বুধবার সকালে এল-সাইয়িদকে ফোন করে পরাজয় স্বীকার করেন এবং একটি বিবৃতিতে বলেন, "আমাদের এই সিনেট আসনটি জিততে হবে, কারণ এলিসা স্লটকিনের প্রয়োজন এল-সাইয়িদের মতো একজন সহকর্মী মার্কিন সিনেটে।" এই ধরনের বাহ্যিক ঐক্যের আহ্বান সত্ত্বেও, নির্বাচনী প্রচারণার সময় যেভাবে সিনেট সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার, কংগ্রেশনাল ব্ল্যাক ককাস এবং দলের প্রতিষ্ঠিত অবকাঠামোর একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে স্টিভেন্সের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। তা দেখিয়ে দেয় দলের ভেতরে প্রতিষ্ঠানপন্থী ও প্রগতিশীল শিবিরের মধ্যে বিভাজন কতটা গভীর। এই একই প্যাটার্ন আমরা আগেও দেখেছি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে জোহরান মামদানির উত্থানে — এবং মিশিগানের এই ফলাফল প্রমাণ করছে, এই প্রবণতা এখন উপকূলীয় শহর ছাড়িয়ে দেশের শিল্পাঞ্চলীয় হৃদয়ভূমিতেও শিকড় গেড়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মূল্য দলকে কতটা চোকাতে হবে নভেম্বরে। এখানেই আসল ঝুঁকিটা লুকিয়ে আছে। মিশিগান এমন একটি রাজ্য, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালে মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে জিতেছিলেন। বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এল-সাইয়িদের মনোনয়ন ডেমোক্র্যাটদের জন্য এমন একটি আসন হারানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাদের ধরে রাখার কথা ছিল। ইলেকশন ট্র্যাকারের একটি বিশ্লেষণে এপ্রিল মাসেই সতর্ক করা হয়েছিল, "মিশিগান হতে পারে সেই আসন, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মূল্য তাদের এমন একটি আসন হারিয়ে চোকাতে হবে, যা তাদের ধরে রাখা উচিত ছিল।" রিপাবলিকান দল ইতিমধ্যেই এল-সাইয়িদকে লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করেছে, বিশেষত তার নাম উচ্চারণ নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা চালিয়ে — যার জবাবে এল-সাইয়িদ মজা করে বলেছেন, "আমি খুশি মনেই তোমাদের শিখিয়ে দেব কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়।"

মিশিগানের এই লড়াইকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বোঝা যায়, কেন এই একটি আসন এত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে রিপাবলিকানদের হাতে সিনেটে তিপ্পান্নটি আসন, ডেমোক্র্যাটদের (দুই স্বতন্ত্রসহ) সাতচল্লিশটি। ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে নিট চারটি আসন জিততে হবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যেহেতু টাই-ব্রেকার হিসেবে কাজ করেন রিপাবলিকানদের পক্ষে, তাই ডেমোক্র্যাটদের আসলে পাঁচটি আসনের ব্যবধান ঘোচাতে হবে পঞ্চাশ-পঞ্চাশ অবস্থাতেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পেতে। নভেম্বরে মোট পঁয়ত্রিশটি আসনে ভোট হবে, যার মধ্যে বাইশটি রিপাবলিকানদের দখলে। মাত্র তেরোটি ডেমোক্র্যাটদের — সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে এটি ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে থাকার কথা। কিন্তু রিপাবলিকানদের বেশিরভাগ আসনই গভীরভাবে রক্ষণশীল রাজ্যে অবস্থিত, যেখানে জাতীয় রাজনৈতিক পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক না কেন, দলীয় ভিত্তি ভাঙা কঠিন।

বিশ্লেষকদের মতে, সিনেট নিয়ন্ত্রণের লড়াই মূলত চারটি রাজ্যকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে — জর্জিয়া, মেইন, মিশিগান এবং নর্থ ক্যারোলাইনা। জর্জিয়ায় সিনেটর জন অসফ, যিনি ২০২৪ সালে ট্রাম্প জেতা একটি রাজ্যে একমাত্র ডেমোক্র্যাট সিনেটর হিসেবে পুনর্নির্বাচনের চেষ্টা করছেন। তাকে সিএনএনের বিশ্লেষণে "সিনেট নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণকারী একক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জর্জিয়ায় রিপাবলিকান জয় প্রায় গাণিতিকভাবেই ডেমোক্র্যাটিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বপ্ন শেষ করে দেবে বৃহত্তর কোনো তরঙ্গ ছাড়া। মেইনে পাঁচ-মেয়াদি রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স দীর্ঘদিন ধরেই ডেমোক্র্যাটদের প্রধান টার্গেট। যদিও অতীতে বারবার তাকে হারাতে ব্যর্থ হয়েছে দল। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী।  রিপাবলিকান দলের সাবেক জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান মাইকেল হোয়াটলির বিপক্ষে — একটি উন্মুক্ত আসনের লড়াই, যেখানে ডেমোক্র্যাটরা ২০০৮ সালের পর থেকে কোনো সিনেট আসন জেতেনি।

এছাড়া ওহাইওর একটি বিশেষ নির্বাচনে সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন লেফটেন্যান্ট গভর্নর জন হাস্টেডের বিরুদ্ধে লড়ছেন। আলাস্কায় কংগ্রেসওম্যান মেরি পেল্টোলা সিনেটর ড্যান সালিভানের আসনে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন, আর টেক্সাস ও আইওয়াকেও দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনার তালিকায় রাখা হচ্ছে। রেস টু দ্য হোয়াইট হাউসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো নর্থ ক্যারোলাইনা ও মেইন জেতা। ওহাইও ও টেক্সাসে বিভাজন ঘটানো, আর জর্জিয়া-মিশিগান ধরে রাখা। এই সমীকরণ মিললে ঠিক একান্নটি আসনে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু এই পথে কোনো ভুলের সুযোগ নেই। একটি আসনও হাতছাড়া হলে পুরো সমীকরণ ভেঙে পড়ে।

রিপাবলিকান দলের অবস্থানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এই অনুকূল আসন-মানচিত্র এবং মিশিগানে নিজেদের প্রাইমারিতে কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল এড়াতে পারা। মাইক রজার্স বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মনোনয়ন পেয়েছেন।  সিনেট রিপাবলিকান নেতৃত্বের আগাম হস্তক্ষেপের সুবাদে। কিন্তু তাদের জন্য উদ্বেগের কারণও কম নয় — প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুমোদনের হার জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে নিম্নমুখী।   মধ্যবর্তী নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের ওপর একটি গণভোট হিসেবে বিবেচিত হয়। নিউজউইকের একটি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বাস্তবতা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এমন আশা তৈরি করেছে যে তারা যুদ্ধক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করে আরও কিছু রক্ষণশীল রাজ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবে।

 মিশিগানের এই প্রাইমারি ফলাফল ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি জটিল কৌশলগত প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। যা নভেম্বরের আগে সমাধান করা জরুরি। এল-সাইয়িদের ইসরায়েল-গাজা নীতি নিয়ে অবস্থান — যেখানে তিনি ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে "গণহত্যা" বলে অভিহিত করেছেন এবং একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সাধারণ নির্বাচনে মধ্যপন্থী ও স্বতন্ত্র ভোটারদের কাছে একটি বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষত যখন রিপাবলিকানরা ইতিমধ্যেই এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আক্রমণাত্মক প্রচারণা শুরু করে দিয়েছে। অন্যদিকে, এল-সাইয়িদের সমর্থকরা যুক্তি দিচ্ছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবার মতো অর্থনৈতিক প্রশ্নে তার আগ্রাসী অবস্থান ঠিক সেই ধরনের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারে, যারা প্রথাগত রাজনীতির প্রতি ক্লান্ত এবং পরিবর্তন চান।

মিশিগানের এই লড়াই আমেরিকার ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য একটি বৃহত্তর পরীক্ষার প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব করছে । দলটি কি প্রতিষ্ঠানপন্থী মধ্যপন্থার নিরাপদ পথে হাঁটবে, নাকি তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান বামমুখী ক্ষোভকে আলিঙ্গন করে ঝুঁকি নেবে? নভেম্বরের ফলাফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের আগে দলের সামগ্রিক কৌশলের দিকনির্দেশনাও ঠিক করে দেবে। যদি এল-সাইয়িদ নভেম্বরে জিততে পারেন, তা হবে প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য এক ঐতিহাসিক প্রমাণ যে তাদের রাজনীতি শুধু উপকূলীয় শহরে সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু যদি তিনি হেরে যান, আর সেই পরাজয়ের কারণেই সিনেট নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে থেকে যায়, তাহলে দলের প্রতিষ্ঠানপন্থী অংশ বহু বছর ধরে এই যুক্তি তুলে ধরবে যে আদর্শিক বিশুদ্ধতার মূল্য বাস্তব ক্ষমতা হারানোর মধ্য দিয়েই চোকাতে হয়েছিল।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন