https://www.prothomalony.com/
17862
north-america
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ ০৩:০৬
জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোন্নিয়ার স্টেন্ডফোর্ড হাউজিং এর একটি ঘরে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিলেন এক তরুণ বাংলাদেশি বিজ্ঞানী। এই বাক্যটি দিয়েই শুরু করতে হয় এমন একটি মৃত্যুর গল্প, যা এখনো তার নিজের সহকর্মী, সহপাঠী আর ঘনিষ্ঠজনদের কাছে পুরোপুরি ব্যাখ্যাতীত রয়ে গেছে। বন্ধুদের বরাত অনুযায়ী, ড. ইরফান আল-হুসাইনিকে হঠাৎ করেই তার ঘরে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে ভর্তির পর তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রাখেন। সেখানে কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবরটি প্রথম জনসম্মুখে আসে গত ৩১ জুলাই। এই আকস্মিক মেডিকেল ইমার্জেন্সির প্রকৃত চিকিৎসাগত কারণ কী ছিল, তা হাসপাতাল বা পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি — আর এই নীরবতাই পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছে একের পর এক প্রশ্নের।
ইরফান আল-হুসাইনির পরিচয় বাংলাদেশের একাডেমিক ও প্রযুক্তি অঙ্গনে বিশেষভাবে উজ্জ্বল ছিল। বুয়েটের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগ থেকে স্নাতক করা এই তরুণ পরে জর্জিয়া টেক থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ায় সিনিয়র ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। যেখানে তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাখ্যাযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (ইন্টারপ্রেটেবল এআই)। বুয়েটে তার সহপাঠীরা তাকে স্মরণ করছেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে। যিনি আইইইই সিগন্যাল প্রসেসিং কাপেও অবদান রেখেছিলেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল দলের একজন দক্ষ উইঙ্গার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের মে মাসে জর্জিয়া টেক নিজেই একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ইরফান ও তার স্ত্রী ড. ফাবিয়া ফারলিন অ্যাথেনার গল্প তুলে ধরেছিল। দুজনই বুয়েটে প্রায় একই সময়ে পড়াশোনা করলেও তাদের পরিচয় হয় জর্জিয়া টেকে। ২০২২ সালে আটলান্টায় তাদের বিয়ে হয়, আর ২০২৪ সালের বসন্তে দুজনে একসঙ্গে পিএইচডি গ্রেজুয়েশন উদযাপন করেছিলেন। দেশ ও বিদেশের প্রযুক্তি অঙ্গনে তার এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
ইরফান আল-হুসাইনির মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই এই ঘটনা নতুন এক মোড় নেয়। যখন ইরফানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু একটি যৌথ প্রকাশ্য বিবৃতি প্রকাশ করেন। যেখানে তার মৃত্যুর প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু প্রশ্ন তোলা হয়। তাদের বিবৃতি অনুযায়ী, ঘটনার দিনের সময়সূচিতে কিছু রহস্যজনক অসংগতি রয়ে গেছে, যার সমাধান হওয়া দরকার। তারা উল্লেখ করেছেন ঘটনার দিন সকালে অফিসে ইরফানের একটি কর্মক্ষেত্রের প্রেজেন্টেশন দেওয়ার বিষয়। এর কিছুক্ষণ পরে সহকর্মীদের কাছে পাঠানো তার শেষ বার্তা। জরুরি ৯১১ কলের সময়কালের সঙ্গে এসবের অমিল, এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী হাসপাতালে নেওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে তার মস্তিষ্কে অক্সিজেন না পৌঁছানোর (প্রলঙ্গড অক্সিজেন ডিপ্রাইভেশন) মতো চিকিৎসাগত পর্যবেক্ষণের কথা। এই বন্ধুরা প্রকাশ্যে একটি স্বচ্ছ, স্বতন্ত্র তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, যাতে এই অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে জানা যায়।
বুয়েটের প্রভাষক ও শিক্ষাবিদ এনায়েত চৌধুরী একটি বিস্তারিত প্রকাশ্য বিবৃতি প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি ইরফানের বন্ধুদের তোলা উদ্বেগগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরে যুক্তি দেন যে বিবৃত সময়সূচি, অভিযোগ এবং অনুত্তরিত প্রশ্নগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী ঘোষণা করা উচিত নয়, তবে অসংগতিগুলো যাচাই করে দেখা প্রয়োজন, উপেক্ষা করা নয়।
এই প্রেক্ষাপটে অনলাইনে জবাবদিহিতার দাবি ক্রমেই বাড়ছে। ইরফান আল-হুসাইনির মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবিতে একটি চেঞ্জ.অর্গ পিটিশন এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার সাক্ষর সংগ্রহ করেছে, এবং সংখ্যাটি ক্রমাগত বাড়ছে।
ইরফান আল-হুসাইনির মৃত্যু তার পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং বুয়েট-জর্জিয়া টেক নেটওয়ার্কের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ঢাকা থেকে বাবা তাহমিদ আল হোসাইনি এবং মা ছুটে এসেছেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। ইরফানের মরদেহ বে এরিয়া মুসলিম কমিউনিটি এসোসিয়েশন মসজিদের ফিউনারেল হোমে রাখা হয়েছে।
ইরফানের বন্ধুরা বিবৃতিতে বলেছেন, “আমাদের প্রিয় বন্ধু ইরফান আল-হুসাইনি—তিনি ছিলেন আমাদের কমিউনিটির সবচেয়ে সদালাপী, বিনয়ী ও সবার প্রিয় মানুষদের একজন। জানা গেছে, ২০২৬ সালের ২২ জুলাই সকালে স্ট্যানফোর্ডে নিজ বাসায় তার স্ত্রী তাকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। প্রায় নয় দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর তিনি মারা যান। তার মৃত্যু স্বাভাবিক বা সাধারণ কোনো ঘটনা বলে মনে হয় না। মৃত্যুর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি গুরুতর ও উদ্বেগজনক অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তার পরিবার, বন্ধু এবং পুরো কমিউনিটি এই ঘটনার পূর্ণ স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ ও বিস্তারিত তদন্ত এবং কী ঘটেছিল তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার রাখে। দাবি করা হয়েছে, রান্নাঘরে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করার কারণে তিনি অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়ার আগে যা যা ঘটেছে, তার প্রেক্ষাপট অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
আইসিইউতে তাকে দেখতে যাওয়া তার সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন সকালে তার একটি প্রেজেন্টেশন ছিল, যা সকাল ৯টার দিকে শেষ হয়। এর কিছুক্ষণ পর দলের গ্রুপ চ্যাটে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি দিনের বাকি সময় ছুটি নেবেন।’ পুলিশের নথি অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইরফানের ঠিকানা থেকে ৯১১-এ ফোন করা হয়। সেদিন সকালে স্ত্রী অ্যাথেনা বাসায় ছিলেন এবং ইরফানকে অচেতন অবস্থায় পাওয়ার সময়ও তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসকদের মতে, মস্তিষ্কে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছানোর কারণে ইরফানের মস্তিষ্কে অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হয়।
সহকর্মীদের বক্তব্য, ৯১১-এ ফোন করার সময় এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে সেদিন সকালে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তার স্ত্রী যখন তাকে ‘অচেতন’ অবস্থায় পান, তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? ইরফান কি সত্যিই নিজের জীবন নিয়েছিলেন? আর যদি সত্যিই নিয়ে থাকেন, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোন পরিস্থিতি তাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল?
বন্ধুরা বিবৃতিতে বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে ইরফান অত্যন্ত সফল ছিলেন এবং সম্প্রতি পদোন্নতিও পেয়েছিলেন। তার ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক নাকি প্রায় ৫০ সদস্যের একটি দলে তাকে অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। কঠিন কোনো সমস্যা সমাধানের প্রয়োজন হলে, ইরফানই ছিলেন প্রথম সারির ভরসা। তবে তার জীবনের যে দিকটি চরম অস্থিরতার মধ্যে ছিল বলে শোনা যায়, তা ছিল তার দাম্পত্য জীবন এবং এর ফলে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক।
ইরফানের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু—যাদের সঙ্গে তার প্রায় দুই দশকের পরিচয়—জানিয়েছেন, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি হঠাৎ তাদের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তার অনেক সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ সামাজিক পরিমণ্ডলের মানুষও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাদের মতে, ইরফানের এই আচরণ ছিল তার স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা আরও দাবি করেন, তাদের যোগাযোগের সব প্রচেষ্টা তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন, যেন কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে ছিলেন।"
আজ ইরফান আর নিজের কণ্ঠে কিছু বলতে পারবেন না।
কিন্তু আমরা তার পক্ষ থেকে সত্য জানতে চাই।
আমরা জবাবদিহিতা চাই।
আমরা ন্যায়বিচার চাই।
যাদের কাছে এই ঘটনার বিষয়ে কোনো প্রমাণ, প্রত্যক্ষ তথ্য বা প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের এগিয়ে এসে সত্য উদঘাটনে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন