https://www.prothomalony.com/

17843

opinion

অভিমত

অপতথ্যের ঝড়ে বাংলাদেশ: নৈতিক সাংবাদিকতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ ০৮:১৬

বাংলাদেশ আজ এক জটিল রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর তথ্যপ্রবাহ—সব মিলিয়ে দেশের গণমাধ্যমের সামনে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় সাংবাদিকতার মূল প্রশ্নটি আর কেবল "কে আগে সংবাদ দিল" নয়; বরং "কে সবচেয়ে নির্ভুল, যাচাইকৃত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করল।"

সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি হলো সত্য অনুসন্ধান, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে তথ্যযুদ্ধ (Information Warfare), প্রভাব-অভিযান (Influence Operations), ডিজিটাল প্রচারণা এবং অ্যালগরিদমনির্ভর প্রচারের কারণে সংবাদ, মতামত, প্রচারণা ও অপতথ্যের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, আঞ্চলিক শক্তিগুলো এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলের আগ্রহ গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নানা প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সংবাদমাধ্যমও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভুল তথ্য, অতিরঞ্জিত দাবি কিংবা যাচাইবিহীন সংবাদ শুধু জনমতকে বিভ্রান্তই করে না; বরং কূটনৈতিক সম্পর্ক, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইউটিউব চ্যানেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এমন বহু বিষয় প্রচারিত হয়েছে, যেখানে নিশ্চিত তথ্যের সঙ্গে অনুমান, বিশ্লেষণের সঙ্গে গুজব এবং মতামতের সঙ্গে সংবাদকে একত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর শিরোনাম, "গোপন সূত্র" বা "বিশ্বস্ত মহল"-এর নামে অযাচাইকৃত তথ্য প্রচার, কৃত্রিমভাবে আবেগ সৃষ্টির চেষ্টা এবং অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো সাক্ষাৎকার বা কূটনৈতিক সফরকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনসব ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, যা মূল প্রতিবেদনের সীমা অতিক্রম করে নিশ্চিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট তথ্যের পক্ষে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকে না। এর ফলে পাঠক বা দর্শক তথ্যের পরিবর্তে ব্যাখ্যাকেই বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেন।

এই বাস্তবতায় গাজীপুরে জেলা প্রশাসন ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘মৌলিক সাংবাদিকতা ও নৈতিক প্রতিবেদন’ শীর্ষক কর্মশালা সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। দেশের শীর্ষ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সেখানে যে বার্তা দিয়েছেন, তা কেবল সাংবাদিকদের জন্য নয়; বরং সমগ্র গণমাধ্যম শিল্পের জন্য একটি নৈতিক রূপরেখা।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন সবুজ সাংবাদিকদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত থেকে সত্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ তথ্য প্রকাশের আগে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই এবং "ফাইভ ডব্লিউ, ওয়ান এইচ" নীতিমালা অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ ভুয়া খবর প্রতিরোধে বাধ্যতামূলক ফ্যাক্ট-চেকিং এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের ওপর জোর দেন। বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী স্মরণ করিয়ে দেন যে সাংবাদিকতার প্রধান দায়বদ্ধতা জনগণের প্রতি, কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতি নয়। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

এই বক্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নীতিমালার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম সংগঠন—যেমন Society of Professional Journalists (SPJ), International Federation of Journalists (IFJ) এবং UNESCO—দীর্ঘদিন ধরে চারটি মৌলিক নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে: সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই, স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্যও এই নীতিগুলো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

আমার সাংবাদিকতা জীবনের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এখানে উল্লেখযোগ্য। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামলে আমার সম্পাদিত সাপ্তাহিক সমাজকণ্ঠ-এ সম্পাদকীয় প্রতিবাদের অংশ হিসেবে "ব্ল্যাঙ্ক স্পট" প্রকাশ করা হয়েছিল। সম্পাদকীয়র একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁকা রেখে পাঠকদের জানানো হয়েছিল যে সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশের কথা ছিল, কিন্তু সেন্সরশিপের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই অভিজ্ঞতা আজও মনে করিয়ে দেয়—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কখনোই স্বতঃসিদ্ধ নয়; বরং প্রতিনিয়ত তা রক্ষা করতে হয়।

তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন প্রতিবাদের পাশাপাশি আরও কার্যকর পথ রয়েছে—ফ্যাক্ট-চেকিং, সম্পাদকীয় ব্যাখ্যা, উন্মুক্ত তথ্যসূত্র প্রকাশ, ডেটা জার্নালিজম, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং পাঠকের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ। গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য এসব পদ্ধতির ব্যবহার ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ডিসেম্বর ২০২৬ নাগাদ বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি সম্ভাব্য গ্রেপ্তার বা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই তথ্যের বাইরে দেশে প্রত্যাবর্তনের সময়, পদ্ধতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে যে অসংখ্য দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে, তার অনেকগুলোর পক্ষে এখনো স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। সাংবাদিকতার নৈতিকতা দাবি করে—যেখানে তথ্য নিশ্চিত নয়, সেখানে নিশ্চিত ভাষায় সিদ্ধান্ত না দেওয়াই শ্রেয়।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় গণমাধ্যমের সামনে তিনটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা প্রতিরোধ করা। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতাকাঠামোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। কারণ সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রযুক্তি নয়, পাঠকের বিশ্বাস।

সবশেষে, সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর—গণমাধ্যম কি সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে অবিচল থাকবে, নাকি রাজনৈতিক মেরুকরণ, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা এবং ডিজিটাল জনপ্রিয়তার চাপে আপস করবে? বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের জবাবের ওপর।

নৈতিক সাংবাদিকতা কোনো আদর্শবাদী স্লোগান নয়; এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তি। তথ্যের যুগে সত্যকে রক্ষা করাই সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই গণমাধ্যম তার স্বাধীনতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সামাজিক মর্যাদা অটুট রাখতে পারে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন