https://www.prothomalony.com/

17837

opinion

অভিমত

প্রবাসী কমিউনিটির জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ ০৫:২৩

নিউইয়র্কের কুইন্স অভিবাসী সংগ্রাম, পরিশ্রম এবং নতুন জীবনের স্বপ্নের প্রতীক। এশিয়ার নানা দেশের মানুষ এখানে এসে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। ছোট ব্যবসা, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অভিবাসী সমাজ।

 সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কুইনসের ফ্লাশিংকে এমন একটি কারণে আলোচনায় এনেছে, যা আমাদের পুরো অভিবাসী সমাজের জন্য গভীরভাবে ভাবার বিষয়। সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার (SADC) কেন্দ্র ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নয়; এটি আমাদের কমিউনিটির একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—তথ্যের অভাব, অতিরিক্ত বিশ্বাস এবং সরকারি ব্যবস্থার জটিলতাকে ঘিরে তৈরি হওয়া ঝুঁকি।

আমাদের প্রবাসী সমাজে অনেক প্রবীণ মানুষ আছেন, যারা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে পরিবার গড়েছেন। কেউ রেস্টুরেন্টে কাজ করেছেন, কেউ কারখানায়, কেউ ব্যবসা করেছেন, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তারা যখন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বা সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভর করেন, তখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

কিন্তু সেই মানুষগুলো যদি কোনো প্রতারণার ব্যবস্থার অংশ হয়ে যান—তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি বিশ্বাসের ওপর আঘাত।

মেডিকেইড কোনো ব্যক্তিগত অর্থের উৎস নয়। এটি করদাতাদের অর্থে পরিচালিত একটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি, যার লক্ষ্য প্রকৃত প্রয়োজন থাকা মানুষকে সহায়তা করা। যারা যোগ্য, তাদের জন্য এই সুবিধা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু কেউ যদি প্রবীণদের অজ্ঞতা, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা বা বিশ্বাসকে ব্যবহার করে সরকারি অর্থ অপব্যবহারের চেষ্টা করে, তাহলে তার ক্ষতি পুরো সমাজকে বহন করতে হয়।

প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এই ঘটনা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

কারণ আমাদের সমাজেও অনেক প্রবীণ আছেন, যারা ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন। তারা সরকারি চিঠি, স্বাস্থ্যবীমার নিয়ম, আইনি কাগজপত্র বা বিভিন্ন সুবিধার শর্ত নিজেরা বুঝতে পারেন না। ফলে তারা অনেক সময় পরিচিত ভাষাভাষী মানুষ, দালাল, তথাকথিত পরামর্শদাতা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কথার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেন।

এই নির্ভরতাই কখনো কখনো ঝুঁকিতে পরিণত হয়।

কেউ যদি বলে—“এটা সরকারি সুবিধা, শুধু সই করুন”, “আপনার কোনো সমস্যা হবে না”, “মাসে কিছু টাকা পাবেন”—তাহলে প্রশ্ন করা জরুরি। নিজের নামে কী কাগজ জমা হচ্ছে, কী সেবার জন্য অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, কোথায় আপনার তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব জানার অধিকার প্রত্যেকের আছে।

বিশেষ করে প্রবীণদের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সন্তানরা কর্মব্যস্ততার কারণে বাবা-মায়ের সরকারি কাগজপত্র বা স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্যের ওপর ছেড়ে দেন। এই সুযোগে কেউ যেন ভুল তথ্য দিয়ে বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তাদের ব্যবহার করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা পরিবারের দায়িত্ব।

তবে এই আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার—কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা অভিবাসী কমিউনিটিকে দোষারোপ করা সমাধান নয়। প্রতারণাকারীর পরিচয় তার অপরাধের পরিচয়; কোনো কমিউনিটির পরিচয় নয়। বরং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেদের কমিউনিটিকে আরও সচেতন, শক্তিশালী এবং সুরক্ষিত করা।

আজকের অভিবাসী বাস্তবতায় এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসন নীতি, সরকারি সুবিধা এবং আইনি অধিকার নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক মানুষ ভয়ে বা অজ্ঞতায় ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে সঠিক তথ্যই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

আমাদের কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের এখন একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। শুধু অনুষ্ঠান আয়োজন নয়, মানুষের অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া, সরকারি সুবিধার সঠিক ব্যবহার বোঝানো এবং প্রতারণার লক্ষণ চিহ্নিত করতে সাহায্য করাও কমিউনিটি নেতৃত্বের অংশ হওয়া উচিত।

সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে, প্রকৃত সেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং যারা সরকারি অর্থ অপব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যারা সত্যিকার অর্থে সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, তারা যেন কোনো ভয়ের কারণে পিছিয়ে না যান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসে শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; আমাদের নিজেদের মানুষদের রক্ষা করতেও হবে। বিশেষ করে সেই প্রবীণদের, যারা আমাদের কমিউনিটির ভিত্তি তৈরি করেছেন।

সচেতনতা, স্বচ্ছতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই পারে এই ধরনের ঝুঁকি কমাতে। আমাদের প্রবীণরা কোনো সুবিধা পাওয়ার মাধ্যম নন। তারা আমাদের পরিবারের ইতিহাস, আমাদের সংগ্রামের সাক্ষী এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিকড়। তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষা করা একটি সামাজিক দায়িত্ব।

ফ্লাশিংয়ের ঘটনা প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্যও একটি বার্তা—বিশ্বাস করুন, কিন্তু যাচাই করে; সাহায্য নিন, কিন্তু নিজের অধিকার জেনে; এবং নীরব থাকবেন না, যদি কোথাও কোনো অসঙ্গতি দেখতে পান।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন