https://www.prothomalony.com/
17802
north-america
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ ০১:৫৮
ওয়াশিংটনের সিনেট শুনানি কক্ষে ২৯ জুলাই বুধবার যা ঘটল, তা আমেরিকার রাজনৈতিক থিয়েটারের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। এমন এক মানুষ, যিনি এক সময় প্রতিদিন হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিং রুমে দাঁড়াতেন। শুধু একটি আতঙ্কিত জাতিকেই নয়, বিশ্বকেও কোভিড মোকাবিলার পথনির্দেশনা দিতেন। তিনিই কংগ্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে বেছে নিলেন নীরবতার আশ্রয়। প্রশ্নের উত্তরে ৫০ বার বলেছেন তার নিরুত্তর থাকার আইনগত অধিকারের কথা।
ডা. অ্যান্থনি ফাউচি, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ। সিনেটের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যান্ড গভর্নমেন্টাল অ্যাফেয়ার্স কমিটির শুনানিতে তিনি সিনেটরদের প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকার করেন। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর অধিকার প্রয়োগ করে তিনি মুখ বন্ধ রাখেন। ফাউচির আশঙ্কা ছিল, রিপাবলিকানরা তার সাক্ষ্যকেই ব্যবহার করতে পারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগে তাকে ফাঁসাতে। শুনানির বিষয় ছিল কোভিডের উৎস এবং মহামারি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা। কিন্তু ফাউচির নীরবতা শেষ পর্যন্ত এমন এক অতি-দলীয় নাটকের জন্ম দিল, যেখান থেকে ভাইরাসের উৎস নিয়ে নতুন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসেনি। বেরিয়ে এসেছে আমেরিকার দুই রাজনৈতিক দলের সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি বয়ান।
দৃশ্যটা কল্পনা করুন—প্রায় একশোরও বেশি প্রশ্নের উত্তরে একই বাক্য বারবার বলেছেন ৮৫ বছর বয়সী এই চিকিৎসক: "আইনজীবীর পরামর্শে, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অনুযায়ী আমি সসম্মানে এই প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকার করছি।" এমনকি যখন মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর জশ হাউলি কৌশলে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার টাই বা কার্পেটের রং কী, তখনও ফাউচি একই বাক্য উচ্চারণ করলেন। দৃশ্যটি একদিকে যেমন কমেডির মতো শোনায়, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর আইনি কৌশল এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাসের ইতিহাস।
কমিটির চেয়ারম্যান, কেন্টাকির রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল, দীর্ঘদিনের ফাউচি-সমালোচক। তিনি বহুবার অভিযোগ করেছেন, গেইন-অব-ফাংশন গবেষণা—যেখানে গবেষণার স্বার্থে ভাইরাসকে আরও সংক্রামক বা বিপজ্জনক করে তোলা হয়—সে বিষয়ে কংগ্রেসের কাছে ফাউচি মিথ্যা বলেছেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের অর্থ শেষ পর্যন্ত উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিতে পৌঁছেছিল কি না, সে প্রশ্নেও তিনি বারবার ফাউচিকে বিদ্ধ করেছেন। ফাউচি অবশ্য বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
এবারের শুনানির ঠিক আগের দিন পল এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, সত্য বললে কোনো পারজুরির ঝুঁকি থাকে না। এমনকি ফাউচি চাইলে অতীতে ভুল তথ্য দেওয়া, রেকর্ড ধ্বংস করা বা দুই পক্ষের যুক্তি যথাযথভাবে তুলে না ধরার কথাও স্বীকার করতে পারেন। কারণ সেসব অপরাধ নয়; নতুন করে মিথ্যা বলাটাই অপরাধ।
ফাউচি নিজের বক্তব্যে যা বললেন, তা ছিল বেশ ধারালো এক পাল্টা আক্রমণ। তিনি বলেন, পলের তার প্রতি "কারাগারে পাঠানোর" পুনরাবৃত্ত হুমকি, "অবমাননাকর মন্তব্য" এবং তার ব্যক্তিগত দিনলিপি প্রকাশ্যে ফাঁস করে দেওয়াই তাকে পঞ্চম সংশোধনীর আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। তিনি স্পষ্ট বলেন, এই শুনানিতে ডাকার একমাত্র উদ্দেশ্য তাকে দিয়ে এমন কিছু বলানো, যা পলের বহুবার প্রকাশ্যে করা প্রতিজ্ঞা—ফাউচি একদিন "জেলের ভেতরে" যাবেন—সেটিকে সত্য প্রমাণ করা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার প্রশাসনের শেষ মুহূর্তে ফাউচিসহ কয়েকজনকে প্রি-এম্পটিভ পারডন (pre-emptive pardon) দিয়েছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের হাত থেকে তারা সুরক্ষা পান। কিন্তু রিপাবলিকানরা ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন, সেই ক্ষমা ভবিষ্যতের নতুন কোনো বিবৃতি বা সাক্ষ্যকে সুরক্ষা দেবে না। এই আইনি অনিশ্চয়তাই ফাউচির আইনি দলের কাছে পঞ্চম সংশোধনীর আশ্রয় নেওয়াকে সবচেয়ে নিরাপদ পথ বলে মনে হয়েছে।
শুনানির শেষে ঘটে সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি। ফাউচির আইনজীবী ডেভিড শার্টলার কমিটির উদ্দেশে কিছু বলার চেষ্টা করলে পল তাকে বারবার থামিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তারক্ষী ডেকে তাকে শুনানি কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে শার্টলার সাংবাদিকদের বলেন, তিনি শুধু এটুকুই বলতে চেয়েছিলেন যে ফাউচির পঞ্চম সংশোধনীর অধিকার প্রয়োগের বৈধ ভিত্তি রয়েছে। এক পৃথক বিবৃতিতে তিনি পলের আচরণকে "নির্লজ্জ" আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি প্রমাণ করে যে পুরো শুনানিটিই ছিল ভিত্তিহীন এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ—পলের ব্যক্তিগত জিঘাংসার বহিঃপ্রকাশ।
ডেমোক্র্যাটদের পক্ষের অবস্থানও কম তীক্ষ্ণ ছিল না। মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর গ্যারি পিটার্স বলেন, এই শুনানি "প্রকৃত ক্ষতি" করছে। একজন মানুষকে বলির পাঁঠা বানানো সহজ, অথচ কোভিড মোকাবিলার ব্যর্থতার দায় ট্রাম্প ও বাইডেন—উভয় প্রশাসনের শত শত কর্মকর্তার মধ্যেই ছড়িয়ে ছিল। কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল আরও একধাপ এগিয়ে পুরো শুনানিটিকে ১৯৫০-এর দশকের ম্যাকার্থি যুগের সঙ্গে তুলনা করেন—যে সময় রাজনৈতিক তদন্তের নামে ব্যক্তিগত সুনাম ধ্বংস করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে—এই পুরো নাটকের পেছনের আসল কারণ কী?
এখানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত বয়ান মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। রিপাবলিকান শিবিরের বক্তব্য, ফাউচি কোভিডকালে লকডাউনসহ নানা সিদ্ধান্তে ক্ষতিকর পরামর্শ দিয়েছেন এবং ভাইরাসের উৎস নিয়ে সত্য গোপন করেছেন। বিশেষ করে গেইন-অব-ফাংশন গবেষণা এবং উহান গবেষণাগারের সংযোগের প্রশ্নে তার স্বচ্ছতার অভাব ছিল। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট শিবির ও ফাউচির আইনি দল বলছে, এটি নিছক প্রতিহিংসা—একজন বিজ্ঞানীকে ফাঁদে ফেলে অপরাধী বানানোর চেষ্টা। যার উদ্দেশ্য জবাবদিহি নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিশোধ।
এই দুই বয়ানের মধ্যে কোনটি কতটা সত্য, তার চূড়ান্ত বিচার এখনো বাকি। তবে এটুকু নিশ্চিত, উভয় পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক আখ্যানকে শক্তিশালী করতে এই ঘটনাকে ব্যবহার করছে।
শুনানির শেষে পল হুঁশিয়ারি দেন, ফাউচিকে কংগ্রেসের তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগে কনটেম্পট অব কংগ্রেস (Contempt of Congress)-এর ভোটের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে বিষয়টি কমিটিতে উত্থাপন করা হবে। অর্থাৎ এই কাহিনি এখানেই শেষ নয়; বরং এটি সবে শুরু।
এই পুরো ঘটনাটি আসলে আরও গভীর একটি প্রশ্নের প্রতিচ্ছবি, যা কোভিড-পরবর্তী আমেরিকার রাজনীতিকে বছরের পর বছর তাড়া করে ফিরছে। বিজ্ঞান আর রাজনীতির সীমানা কোথায় শেষ হয়, আর প্রতিহিংসা কোথা থেকে শুরু? একজন বিজ্ঞানী, যার সিদ্ধান্তে লাখো মানুষের জীবন প্রভাবিত হয়েছিল, তাকে যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি করার সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো বিশেষজ্ঞই কি প্রকাশ্যে পরামর্শ দিতে সাহস পাবেন? ফাউচির পঞ্চম সংশোধনীর সেই নীরবতার আড়ালে বোধহয় লুকিয়ে আছে এই প্রশ্নটাই।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন