https://www.prothomalony.com/

17803

north-america

উত্তর আমেরিকা

ভিসা-মেয়াদ পেরোনো মানুষদের ধরতে আকাশপথেই জাল পেতেছে আইস

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ ০২:০১

গল্পটা এমনই যে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, অথচ প্রতিদিনের বাস্তবতা। যে বিমানবন্দর একদিন ছিল যাত্রা শুরুর জায়গা, আজ সেটাই হয়ে উঠেছে একটা আইনি ফাঁদ। যেখানে বোর্ডিং পাস স্ক্যান হওয়ার মুহূর্তেই একজন মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইস) এখন বিমানবন্দরে টহল দিচ্ছে। লক্ষ্য যারা ভিসার মেয়াদ পার করেও দেশ ছাড়েননি তাদের খুঁজে বের করা। তাও শুধু আন্তর্জাতিক নয়, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটেও। এবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ন'টি রাজ্যে এখন পর্যন্ত সাতাশ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই কৌশলে। এই তথ্য আসছে বিমান নিরাপত্তা সংস্থা টিএসএ-র সেই যাত্রী-তথ্য ভাণ্ডার থেকে, যা প্রতিটি এয়ারলাইন্স যাত্রীকে স্ক্যান করে রাখে।

প্রথমে ভাবা যেত এসব কেবল যাদের দেশে ফেরার চূড়ান্ত আদেশ (ফাইনাল রিমুভাল অর্ডার) জারি হয়েছে তাদের বেলাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা এখন অনেক বিস্তৃত। রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, টিএসএ-র সরবরাহ করা তথ্যের সূত্র ধরে গত বছরে আটশোরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে আইস। এদের মধ্যে ছিলেন এমন একটি দম্পতিও, যারা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রক্রিয়াধীন ছিল, অথচ ফ্লোরিডা থেকে নিউইয়র্কে ছুটি কাটিয়ে ফেরার পথে নিজেদের সাত ও দশ বছর বয়সী সন্তানদের সামনেই তাদের আটক করা হয়। পরে তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়, সন্তানদের রেখে যেতে হয় আত্মীয়দের কাছে।

সিএনএন-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও কিছু নাম, কিছু মুখ, যাদের গল্প এতদিন পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়েছিল। ডেনভার বিমানবন্দরে জেট-ব্রিজের ওপরেই এক নারীকে আটক করা হয় সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ওঠার সময়। স্যান ফ্রান্সিসকো বিমানবন্দরে ইউক্রেনীয় নাগরিক ইরিনা গর্ব যখন গ্রেপ্তার হচ্ছিলেন, তখন "প্লিজ হেল্প মি" বলে চিৎকার করছিলেন। দৃশ্যটি ভিডিও হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। লরেঞ্জো থম্পসন নামের এক জ্যামাইকান নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয় জুলাইয়ের মাঝামাঝি। ডিএইচএস নিজেই নিশ্চিত করেছে তিনি ছয় মাসের ভিসায় ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। আরেকজন নারী, যিনি বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিতে টেক্সাসের বাড়িতে ফিরছিলেন, তাকে আটক করা হয় ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার বিমানবন্দরে। অথচ তিনি বৈধভাবেই দেশে ঢুকেছিলেন এবং আশ্রয়প্রার্থনার প্রক্রিয়ায় ছিলেন।

এখানেই লুকিয়ে আছে এই নীতির সবচেয়ে নিষ্ঠুর অংশটুকু। এই মানুষগুলোর কেউই অপরাধী নন, কারো ফৌজদারি রেকর্ড নেই। অনেকেরই আছে বৈধ কর্মসংস্থান অনুমতিপত্র। একজন অভিবাসন আইনজীবী এবিসি নিউজকে বলেছেন যে "রুটিন বিমানভ্রমণ এখন লক্ষ লক্ষ ভিসাধারী ও গ্রিন কার্ড আবেদনকারীর জন্য একরকম আইনি অবস্থা যাচাইয়ের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে"। বাক্যটা শুনতে আমলাতান্ত্রিক লাগলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ধরনের দৈনন্দিন সন্ত্রাসের বর্ণনা। কারণ গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা মানেই তো বৈধতা নয়, বরং এক অনির্দিষ্ট অপেক্ষা। যেখানে সরকারি দপ্তরের দেরিই একদিন হয়ে উঠতে পারে গ্রেপ্তারের অজুহাত।

নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে অন্তত পনেরোটি বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় এমন গ্রেপ্তার হয়েছে, আর টার্গেট করা হচ্ছে দক্ষ পেশাজীবী থেকে শুরু করে মার্কিন নাগরিকদের স্বামী-স্ত্রী। এমনকি সাবেক শিক্ষাবিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদেরও। ডেনভার থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে উঠতে যাওয়া সাতাশ বছর বয়সী এক ইকুয়েডরীয় নারীর ঘটনা এখন ব্যাপক আলোচিত। সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি দিয়ে বৈধভাবে দেশে ঢুকে পরে থেকে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। বোর্ডিং পাস স্ক্যান হওয়ার পরপরই সাদা পোশাকের কর্মকর্তারা তাকে সরিয়ে নেন।

আর টিএসএ-আইস-এর এই সহযোগিতার পরিসর যে কতটা বিস্তৃত, সেটা ফোর্বসের প্রতিবেদনে স্পষ্ট। এপ্রিলে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ট্রাম্প প্রেসিডেন্সিতে ফেরার পর থেকে টিএসএ আইসকে হাজার হাজার যাত্রীর রেকর্ড সরবরাহ করেছে। যা আগে জানা তথ্যের চেয়েও অনেক বেশি। ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অ্যাক্টের অধীনে ওয়াচডগ সংস্থা আমেরিকান ওভারসাইটের হাতে আসা এক নথি অনুযায়ী, এই দুই সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের একটি চুক্তিও রয়েছে। এটা সরাসরি স্ববিরোধী টিএসএর ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক হা এনগুয়েন ম্যাকনিলের আগের অবস্থানের সঙ্গে।

গত মাসেই আইস-এর হেফাজত কেন্দ্রগুলোতে বন্দি হওয়ার সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে সর্বোচ্চ। তেতাল্লিশ হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে জুন মাসে। দৈনিক গড়ে পনেরোশো জন। ডিএইচএস বলছে তাদের কোনো "কোটা" নেই। অথচ আইস কর্মকর্তাদেরই শোনা গেছে গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়লে বোনাস পাওয়ার আলোচনা করতে। এই বৈপরীত্যটা যেন এই পুরো নীতির প্রতীক — মুখে মানবিকতার ভাষা, বাস্তবে লক্ষ্যমাত্রার রাজনীতি।

মিনিয়াপোলিসে "অপারেশন মেট্রো সার্জ" শেষ হওয়ার পর গণমাধ্যমের মনোযোগ কমে গেছে বটে, কিন্তু আইস-এর কৌশল বদলায়নি। এই মাসেই টেক্সাস আর মেইনে দুইজন মানুষ মারা গেছেন আইস কর্মকর্তাদের হাতে।  দুজনের কারোরই ফৌজদারি রেকর্ড ছিল না। কর্মকর্তারা প্রায়ই সাদা পোশাকে, মুখ ও চোখ ঢেকে অভিযান চালান। ফলে অনেক আটক ব্যক্তি প্রথমে ভাবেন তাদের অপহরণ করা হচ্ছে। কর্মস্থলে, বাজারে, রাস্তায় হঠাৎ মাটিতে চেপে ধরার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে গত বছর জুড়েই ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

এই ক্ষোভ যে জনমতকেও নাড়া দিয়েছে, তার প্রমাণ মেলে গ্যালাপের এক জরিপে। ২০২৪ সালে, যে বছর ট্রাম্প নির্বাচিত হন, ৫৫ শতাংশ আমেরিকান অভিবাসন কমাতে চেয়েছিলেন। এখন সেই সংখ্যা মাত্র ৩০ শতাংশ। চার বছরের একটা প্রবণতা যেন উল্টে গেছে রাতারাতি।  প্রায় ৮০ শতাংশ আমেরিকান — রেকর্ড সংখ্যা — এখন মনে করেন অভিবাসন দেশের জন্য ভালো। রাজনীতির নিষ্ঠুরতা যতই বাড়ুক, মানুষের বিবেক যেন তার নিজস্ব হিসেব কষে নিচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির আরেকটি স্তম্ভ হলো অস্থায়ী সুরক্ষিত মর্যাদা (টিপিএস) বাতিল করা। যে ব্যবস্থার অধীনে লাখ লাখ মানুষ, যাদের নিজ দেশে ফেরা বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রে কাজের অনুমতি পান। মিয়ানমার, ভেনেজুয়েলা, হন্ডুরাস, নেপাল, নিকারাগুয়া, আফগানিস্তান আর ক্যামেরুনের জন্য এই মর্যাদা ইতিমধ্যে বাতিল হয়ে গেছে। এই সপ্তাহেই শেষ হচ্ছে হাইতি আর সিরিয়ার টিপিএস। মানে ২০১০-১১ সাল থেকে এই সুরক্ষায় থাকা মানুষগুলো এখন থেকে আইস-এর গ্রেপ্তার আর আটকের ঝুঁকিতে পড়বেন। প্রায় সাড়ে তিন লাখ হাইতিয়ান আর অন্তত ছয় হাজার সিরীয় এই তালিকায়। ডিএইচএস এক্স-এ (সাবেক টুইটার) সরাসরি হুমকির ভাষায় লিখেছে — "এনফোর্সমেন্ট কার্যকর করা হবে,"। তারপর যোগ করেছে, চাইলে "সিবিপি হোম" অ্যাপ ব্যবহার করে স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়লে আড়াই হাজার ডলার পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হবে। যদিও এখনো কেউ সেই টাকা পেয়েছেন কিনা তা স্পষ্ট নয়।

একটা রাষ্ট্র যখন তার নিজের বিমানবন্দরগুলোকে নজরদারির যন্ত্রে পরিণত করে, যখন একটা বোর্ডিং পাস স্ক্যান হওয়ার শব্দই হয়ে ওঠে ভয়ের উৎস। তখন সেই রাষ্ট্র আসলে কার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে? যারা বছরের পর বছর নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন, ট্যাক্স দিয়েছেন, সন্তান মানুষ করেছেন এই দেশেই, তাদের জন্য "বৈধতা" শব্দটা এখন যেন প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করার বিষয়। যে প্রমাণের মানদণ্ড বদলে যায় প্রতিটি নতুন স্মারকলিপি বা নীতিনির্দেশের সঙ্গে। বাংলাদেশি অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্যও এই বাস্তবতা অচেনা নয়। গ্রিন কার্ডের দীর্ঘ অপেক্ষার সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি পরিবারই জানে, কাগজপত্রে "প্রক্রিয়াধীন" শব্দটা কতটা ভঙ্গুর একটা নিরাপত্তা বলয়। যা এক ঝলকে ভেঙে পড়তে পারে টিএসএ-র কোনো ডেটাবেজের এক সারি সংখ্যায়।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন