https://www.prothomalony.com/
17687
new-york
নিউজার্সির এক গ্রীষ্ম সন্ধ্যা। বাইরে বিশ্বকাপের উত্তেজনা, চারপাশে নানা ব্যস্ততা। কিন্তু ১১ জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় একদল সঙ্গীতপ্রেমী মানুষ ছুটে এসেছিলেন অন্য এক আনন্দের সন্ধানে—সুরের জাদুকরী, ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
সন্ধ্যা ৬টা থেকেই বাঙালি ও অবাঙালি দর্শকদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। ঠিক ৬টা ৪৫ মিনিটে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত এই আয়োজন।
.jpeg)
অনুষ্ঠানের সূচনায় ডা. ফারুক আজম অতিথিদের সালাম ও নমস্কার জানিয়ে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, বিশ্বকাপের উন্মাদনার মধ্যেও যারা সঙ্গীতের এই সন্ধ্যাকে বেছে নিয়েছেন, তাদের প্রতি রয়েছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এরপর তিনি মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান এই আয়োজনের স্বপ্নদ্রষ্টা, সঙ্গীতপ্রেমী ও মূল উদ্যোক্তা শামসুল হককে।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে শামসুল হক জানান, কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলের দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকেই এই আয়োজনের জন্ম। এরপর ডা. ফারুক আজম মঞ্চে ডাকেন তাঁর সহ-উপস্থাপিকা, গুণী শিল্পী অজন্তা সিদ্দিকীকে।
ফারুক আজম ও অজন্তা সিদ্দিকীর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় শুরু হয় আশা ভোঁসলের সঙ্গীত জীবনের এক অনন্য যাত্রা। সংক্ষিপ্ত সময়ে তাঁরা তুলে ধরেন এই কিংবদন্তির প্রায় আট দশকের সঙ্গীত অভিযাত্রা।
আশা ভোঁসলে ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীত ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর হাজার হাজার গান, শত শত চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠের উপস্থিতি এবং বিশ্বজুড়ে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনের বিশালতাকে কয়েক ঘণ্টার মঞ্চে তুলে ধরা ছিল নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল কয়েকটি পর্বে।
প্রথমেই আসে আশা ভোঁসলের দ্বৈত কণ্ঠের গান—যেখানে তাঁর সঙ্গে মিশে আছে মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মান্না দে-সহ উপমহাদেশের আরও অনেক কিংবদন্তি শিল্পীর কণ্ঠ। অভি শুক্লার সঙ্গে গায়ত্রী শর্মা, বিদিশা মুখার্জি ও জয়ন্তীর পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
ক্লাসিক্যাল ও সেমি-ক্লাসিক্যাল পর্বে উঠে আসে আশা ভোঁসলের শিল্পীসত্তার অন্য এক দিক। বিশেষ করে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত *উমরাও জান* ছবির গানগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁর কণ্ঠের গভীরতা ও পরিশীলন।
আরেকটি আকর্ষণীয় পর্ব ছিল “আশা-পঞ্চম”—আশা ভোঁসলে ও আর ডি বর্মণের ঐতিহাসিক সঙ্গীত জুটিকে ঘিরে। উপস্থাপনায় বলা হয়, এই জুটি শুধু গান তৈরি করেননি, তাঁরা ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতে নতুন এক ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন। প্রচলিত ধারাকে ভেঙে তাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন।
এরপর আসে আশা ভোঁসলের বাংলা গানের পর্ব। জনপ্রিয় বাংলা গানগুলো দর্শকদের মধ্যে নতুন উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে। বিদিশা মুখার্জি, দিলীপ মুখার্জি, তনিমা, তিথি, রিক্তা, রাজীব সরকারসহ শিল্পীদের পরিবেশনা ছিল প্রশংসনীয়।
.jpeg)
হিন্দি ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশনায় বিশেষভাবে নজর কাড়েন অসমের জনপ্রিয় শিল্পী গায়ত্রী শর্মা এবং মোহাম্মদ রফির একনিষ্ঠ ভক্ত অভি শুক্লা। তাঁদের কণ্ঠে ছিল পেশাদারিত্ব ও আবেগের সুন্দর সমন্বয়। মনে হচ্ছিল, তাঁরা যদি ভারতের বড় কোনো মঞ্চে নিয়মিত সুযোগ পেতেন, আরও বড় পরিচিতি অর্জন করতে পারতেন।
অজন্তা সিদ্দিকী, শাব্বির আহমেদ, বিদিশা মুখার্জি, আঁখি ও জয়ন্তীর পরিবেশনাও ছিল উপভোগ্য। শাহীন হক ও আশরাফুল শামীমের গান দর্শকদের মধ্যে আনন্দের আবহ তৈরি করে। সিনিয়র শিল্পী সোনালের পরিবেশনা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সঙ্গীতের পাশাপাশি নৃত্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ফাহমিনা জব্বার ও সারিনা। আশা ভোঁসলের গানের সঙ্গে তাঁদের নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
প্রায় চার ঘণ্টার এই দীর্ঘ আয়োজন নিয়ে কারও কারও মন্তব্য ছিল—সময় ব্যবস্থাপনায় আরও কিছুটা সংযম থাকলে অনুষ্ঠানটি আরও গতিশীল হতে পারত। কিছুটা সংক্ষিপ্ত ও আরও পরিমার্জিত পরিকল্পনায় এটি হয়তো আরও স্মরণীয় হয়ে উঠত। তবে এতজন গুণী শিল্পীর একসঙ্গে এমন চমৎকার পরিবেশনা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
মঞ্চসজ্জায় আশা ভোঁসলের ছবি ও নান্দনিক আয়োজনের কৃতিত্ব আশরাফুল শামীমের। গানের সঙ্গে যন্ত্রসঙ্গতে ছিলেন—লিড গিটারে নাইস, কী-বোর্ডে অতীশ মিত্র, অক্টোপ্যাডে তুষার দত্ত, তবলায় রবিশংকর ভট্টাচার্য এবং বাস গিটারে আকাশ। সাউন্ড নিয়ন্ত্রণে ছিলেন সৈয়দ; পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে শব্দ ব্যবস্থাপনায় ছিল চমৎকার সমন্বয়।
খাবার ব্যবস্থাপনায় ছিলেন আব্দুল লতিফ। টিকিট সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেছেন সাদি হোসেন ও আনিস। ফারুক আজম ও অজন্তা সিদ্দিকীর সাবলীল উপস্থাপনা পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত রেখেছে।
সবশেষে কৃতিত্ব দিতে হয় শামসুল হককে—এতজন উচ্চমানের শিল্পীকে একত্রিত করে তিনি প্রবাসে এমন একটি সঙ্গীত সন্ধ্যা উপহার দিয়েছেন, যা দীর্ঘদিন দর্শকদের স্মৃতিতে থাকবে। আশা ভোঁসলের প্রতি এই শ্রদ্ধাঞ্জলি ছিল আসলে সুরের প্রতি ভালোবাসার এক অপূর্ব উদযাপন।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন