https://www.prothomalony.com/
17629
search
ক্যানসার আর শুধু একটি রোগ নয়, এটি ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। কার্যকর প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসায় বৈষম্য কমানো না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি বছর নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৩ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।
মঙ্গলবার প্রকাশিত গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন ক্যানসার ২০২৬ -এ WHO জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন ক্যানসারে প্রাণ হারাচ্ছেন ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। হৃদ্রোগের পর ক্যানসার এখন বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান মৃত্যুর কারণ। প্রতিবেদনটি WHO এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (IARC) যৌথভাবে প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও দেশভেদে ক্যানসারের চিকিৎসা ও সেবাপ্রাপ্তির বৈষম্য এখনো গভীর। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের ৮৭ শতাংশ রোগ নির্ণয়ের পাঁচ বছর পরও বেঁচে থাকেন। অথচ নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার মাত্র ৪২ শতাংশ। বিশ্বের প্রতি তিনটি দেশের মধ্যে মাত্র একটি দেশে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় ক্যানসারের চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
WHO-এর মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেন, ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা প্রায় প্রতিটি পরিবারকে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করে। কিন্তু একজন মানুষ বেঁচে থাকবেন কি না, তা কখনোই তাঁর জন্মস্থান বা আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। তাঁর মতে, এই বৈষম্য অনিবার্য নয়; রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে তা কমানো সম্ভব।
এবারের প্রতিবেদনে চিকিৎসার পাশাপাশি ক্যানসারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও তুলে ধরা হয়েছে। WHO-এর বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, অন্তত ৪৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসার ব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকটে পড়েন। অর্ধেকের বেশি রোগী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে অধিকাংশ পরিচর্যাকারী অবৈতনিক সেবা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
অঞ্চলভেদেও ক্যানসারের চিত্র ভিন্ন। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ক্যানসার রোগীর ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মৃত্যুর ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ ঘটেছে এশিয়ায়। ইউরোপে বিশ্বের মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ বাস করলেও বৈশ্বিক ক্যানসার রোগীর ২১ শতাংশ এবং মৃত্যুর ২০ শতাংশ সেখানেই। আফ্রিকার অনেক দেশ ও এশিয়ার কিছু অঞ্চলে আক্রান্তের হার তুলনামূলক কম হলেও মৃত্যুহার বেশি।
বিশ্বজুড়ে এখনো ফুসফুসের ক্যানসারই মৃত্যুর প্রধান কারণ। পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, প্রোস্টেট ও কোলোরেক্টাল ক্যানসার বেশি দেখা যায়। আর নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্তন, ফুসফুস ও কোলোরেক্টাল ক্যানসার।
WHO বলছে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যানসার প্রতিরোধযোগ্য। তামাক ব্যবহার, মদ্যপান, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বায়ুদূষণ এবং HPV, হেপাটাইটিস বি ও সি এবং Helicobacter pylori-এর মতো সংক্রমণ ক্যানসারের অন্যতম ঝুঁকির কারণ। কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি গ্রহণ করলে বিপুলসংখ্যক ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর বিশ্বে তামাকের ব্যবহার ২৭ শতাংশ কমেছে। এর ফলে কিছু অঞ্চলে ফুসফুসের ক্যানসারের হারও কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৮২ শতাংশ দেশের জাতীয় ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা রয়েছে, যা ২০১০ সালে ছিল মাত্র ৫০ শতাংশ।
তবে চিকিৎসার সুযোগে বৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ক্যানসারের জন্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ২০টি ওষুধের প্রাপ্যতা মাত্র ৯ থেকে ৫৪ শতাংশ। বিপরীতে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে একই ওষুধের প্রাপ্যতা ৬৮ থেকে ৯৪ শতাংশ।
WHO সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং চিকিৎসা-সুবিধার বৈষম্য কমানোই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
WHO-এর ভাষায়, আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের ক্যানসারের চিত্র। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে, আগামী ২৫ বছরে ক্যানসার বিশ্বের জন্য আরও বড় স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
অনুসন্ধান থেকে আরো পড়ুন