https://www.prothomalony.com/
12705
search
একটি কোমলমতি, তুলতুলে নরম শিশু জন্মের পর ধীরে ধীরে শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের পথ বেয়ে একটা সময় হয়ে ওঠেন পরিপূর্ণ নারীত্বের প্রতীক। তার জীবনের প্রতিটি ধাপ শৈশব থেকে কৈশোর, তারুণ্য থেকে মাতৃত্ব, দায়িত্বশীল অভিভাবক থেকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সবটাই যেন এক অন্তহীন পথচলার গল্প, যেখানে প্রতিটি বাঁকে রয়েছে পরীক্ষা, প্রতিকূলতা এবং জয়।
একটি নিষ্পাপ কন্যাশিশুর পৃথিবীর আলো দেখার মধ্য দিয়ে যে জীবন শুরু হয়, তা কখনোই সহজ পথচলা নয়। প্রতিনিয়ত, প্রতিটি মুহূর্ত তাকে প্রমাণ করতে হয় নিজেকে। সামাজিক রীতিনীতি, পারিবারিক দায়িত্ব, পেশাগত চ্যালেঞ্জ, সবকিছুর ভার কাঁধে নিয়ে তাকে এগিয়ে যেতে হয় নিরন্তর সংগ্রামে। ধীরে ধীরে সে উপলব্ধি করে, এই জীবন তার জন্য শুধু স্বপ্ন দেখা নয়, বরং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করা, বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
সময় বদলায়, বয়সের সাথে সাথে নারীর জীবনও নেয় নতুন নতুন রূপ। একসময় তিনি কারও ঘরের দীপশিখা, সংসারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারপর মমতাময়ী মা, দায়িত্বশীল অভিভাবক। এরপরও থেমে থাকে না তার ভূমিকা, তিনি কর্মজীবনে এক সফল যোদ্ধা, সংসারে এক বলিষ্ঠ ভিত্তি, সমাজে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।
জীবন চলার পথে প্রতিটি নারীকে শিখতে হয় ত্যাগের অর্থ, কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়, কীভাবে সংগ্রাম করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। সংসার, সমাজ, ক্যারিয়ার, আত্মসম্মান সবকিছুর ভার নিজের কাঁধে নিয়ে তিনি লড়াই করে যান প্রতিনিয়ত।
নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে, শত প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের শক্তি প্রমাণ করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু একজন নারী তার মহিমায় সেটি সম্ভব করে দেখান। কারণ নারী মানেই এক অপার সম্ভাবনার নাম। তিনি যেন এক মহামূল্যবান পাত্র, যেখানে যত দায়িত্ব, ত্যাগ আর ভালোবাসা ঢালা হোক না কেন, তিনি তা ধারণ করতে জানেন, পালন করতে পারেন।
দিনমজুর নারী থেকে উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী নারী যিনি কর্মজীবী নন, কেবল সংসার সামলান প্রত্যেকেই সমানভাবে সম্মানের অধিকারী। কারণ প্রত্যেক নারীর পথচলা সহজ ছিল না, সহজ হয় না। প্রতিকূলতার কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে তারা নিজ মহিমায় স্থান করে নেন, হয়ে ওঠেন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্ত। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তারা লড়াই করেন সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে, ভাঙেন অগণিত বাধার দেয়াল।
দেশে গেলে, পথের ধারে পথকলি শিশুদের হাতে ফুল বিক্রি করতে দেখলে মনে হয়, এই ছোট্ট মেয়েগুলোর জীবনসংগ্রাম তো কেবল শুরু হলো! সংসারে দু’টো পয়সা যোগ করার জন্য তারা এখনই বদ্ধপরিকর। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারকে উপেক্ষা করে, তারা জীবনকে আপন শক্তিতে গড়ে তুলতে এখন থেকেই শিখছে।
আমার বাবার বাড়ীর আমাদের শেফালী, আমার মায়ের সাহায্যকারী, যে নিজে পরিশ্রম করে তিনটি কন্যাকে আলোর পথ দেখাচ্ছে। তার দু’জন মেয়ে স্কুলগামী, একজন কলেজে পড়ে। যখন দেখি, একজন সাধারণ গৃহকর্মী মা অগাধ ভালোবাসা আর দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন, তখন তার প্রতি আমার শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়।একজন মা, একজন নারী মানেই শক্তি, আর সীমাহীন আত্মত্যাগ।
নারীর সংগ্রামের গল্প শুধু আমার দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সদ্য ভিয়েতনাম থেকে ফিরেছি, আর সেই দেশটিও আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। দেখেছি, এক মা তার ছোট্ট শিশুকে বুকের সাথে বেঁধে সাইকেল চালিয়ে ফল বিক্রি করছেন। আরেকজন বয়স্কা নারী ভারী ঝুঁলি কাঁধে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় তাজা ফল বিক্রি করছেন। পথের ধারে, বাজারের কোণায়, খোলা রাস্তায়, প্রতিটি জায়গায় নারীরা দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন, হাসিমুখে জীবনযুদ্ধকে বরণ করে নিচ্ছেন।
নারীর শক্তি, সহনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসই একটি সুসংগঠিত সমাজের মূল ভিত্তি। একজন নারী কেবল নিজেকে আলোকিত করেন না, তিনি আলোকিত করেন পরিবার, সমাজ, এবং সমগ্র জাতিকে। আজকের এই বিশেষ দিনে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, সেই সকল নারীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই, যারা নিরলস পরিশ্রম করে পরিবার, সমাজ এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের কারনেই এই পৃথিবী প্রতিনিয়ত আলোকিত, প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ।
তোমরাই পৃথিবীর আশার আলো,
তোমরাই শক্তির প্রতীক,
তোমরাই নতুন দিনের নির্মাতা!
অনুসন্ধান থেকে আরো পড়ুন