https://www.prothomalony.com/
17309
search
প্রকৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। নদী, নালা, খাল, বিল, গাছপালা, আকাশ, বাতাস, পাহাড়, বনভূমি, সমুদ্র, পাখি ও প্রাণী—সবকিছু মিলেই আমাদের প্রকৃতি। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হাজার বছরের। মানুষ যেমন অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি প্রকৃতি ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। প্রকৃতি আমাদের জীবনকে সুন্দর, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করে তোলে। তাই প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা আমাদের সকলের কর্তব্য।
প্রকৃতি মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু। সকালে সূর্যের আলো, পাখির মিষ্টি ডাক, শীতল বাতাস, সবুজ গাছপালা এবং নদীর কলকল ধ্বনি মানুষের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য মানুষের মনকে শান্ত করে এবং জীবনে নতুন প্রাণশক্তি এনে দেয়। প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটালে মানুষের ক্লান্তি দূর হয়, মন ভালো হয়ে যায় এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
গাছপালা প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, যা ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব। আমরা যে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করি, গাছ তা গ্রহণ করে পরিবেশকে বিশুদ্ধ রাখে। গাছ বায়ু দূষণ কমায়, মাটি ক্ষয় রোধ করে এবং জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখে। এছাড়া গাছ আমাদের ফল, ফুল, কাঠ, ঔষধ এবং জ্বালানি সরবরাহ করে। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গাছের অবদান অপরিসীম।
একটি ফলজ গাছ যেমন আমাদের পুষ্টিকর ফল দেয়, তেমনি একটি বনজ গাছ আমাদের কাঠের চাহিদা পূরণ করে। গাছের ছায়ায় মানুষ বিশ্রাম নেয়, পশুপাখি আশ্রয় পায়। তাই গাছকে কেবল একটি উদ্ভিদ হিসেবে নয়, বরং জীবনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। গাছ আমাদের বন্ধু, গাছ আমাদের জীবনরক্ষক।
নদী-নালা ও জলাশয়ও প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ। পানি ছাড়া জীবন অচল। মানুষের পানীয় জল, কৃষিকাজ, মাছ চাষ এবং দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ কাজ পানির ওপর নির্ভরশীল। নদী আমাদের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে নদী মানুষের জীবন ও জীবিকার অন্যতম উৎস। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ অনেক নদী দূষিত হয়ে পড়ছে। নদী রক্ষার জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে এবং নদী দূষণ বন্ধ করতে হবে।
পাখি প্রকৃতির সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ। ভোরবেলায় পাখির ডাক আমাদের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। পাখিরা শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের ফসল রক্ষা করে। আবার অনেক পাখি বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে। তাই পাখি রক্ষা করা মানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা।
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিবেশ দূষণ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কলকারখানার ধোঁয়া, প্লাস্টিক বর্জ্য, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে এবং পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রতিটি নাগরিককে নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিজের বাড়ি, গ্রাম, শহর এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা আমাদের কর্তব্য।
প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করা। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বৃক্ষরোপণ, র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার এবং সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব বোঝানো হয়। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে।
আমরা যদি বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রতিটি পরিবারে অন্তত একটি করে গাছ উপহার দিই, তাহলে পরিবেশের জন্য তা একটি বড় অবদান হবে। একটি গাছ মানে শুধু একটি উদ্ভিদ নয়, বরং একটি ভবিষ্যৎ। একটি গাছ বহু বছর ধরে অক্সিজেন দেবে, ছায়া দেবে এবং পরিবেশকে সুন্দর রাখবে।
শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই তাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দিতে হবে এবং তাদের বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করতে হবে। একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলে, তাহলে সে বড় হয়ে প্রকৃতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
গ্রামের বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে, স্কুলের মাঠ, খালি জমি এবং নদীর পাড়ে বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। ফলজ, বনজ এবং ঔষধি গাছের সমন্বয়ে সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এতে যেমন পরিবেশ রক্ষা হবে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও মানুষ লাভবান হবে।
প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে। নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা যাবে না। পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন গড়ে তুলতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে গাছ কাটা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং একটি গাছ কাটলে অন্তত তিনটি নতুন গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
প্রকৃতি শুধু মানুষের নয়, পৃথিবীর সব জীবের আবাসস্থল। বনভূমি ধ্বংস হলে বন্যপ্রাণী তাদের আশ্রয় হারায়। অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বন সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। বন বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে।
আমাদের দেশকে সবুজ ও সুন্দর করতে হলে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পরিবেশ রক্ষা কোনো একদিনের কাজ নয়, এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে সামনে রেখে আমরা শপথ করি—প্রকৃতিকে ভালোবাসব, পরিবেশ দূষণ রোধ করব এবং বেশি বেশি গাছ লাগাব। দেশের প্রতিটি গ্রাম, শহর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তার ধারে এবং খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করব। প্রতিটি শিশুর হাতে একটি করে গাছের চারা তুলে দেব। মানুষকে সচেতন করতে র্যালি, ব্যানার, ফেস্টুন ও প্রচারণার ব্যবস্থা করব।
আমরা যদি আজ একটি গাছ লাগাই, তাহলে আগামী প্রজন্ম একটি সুন্দর পৃথিবী পাবে। সবুজ গাছে ভরা দেশ হবে নির্মল, শীতল ও বাসযোগ্য। তাই আসুন, সবাই মিলে বলি—"গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান; পরিবেশ বাঁচলে জীবন বাঁচবে।" প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই গড়ে উঠুক একটি সবুজ, সুন্দর এবং সুস্থ বাংলাদেশ।
লেখক: ইরাক প্রবাসী
অনুসন্ধান থেকে আরো পড়ুন