https://www.prothomalony.com/
17517
opinion
রাত তখন প্রায় চারটা। হঠাৎ জানালায় টক… টক… শব্দ। কে?
ফিসফিস করে রাশেদ বলল,
-উঠ! খেলা দেখবি না? শুরু হয়ে গেছে!
আমি বললাম,
-কোথায় দেখবি? চল বাজারে যাই। আলি আজ্জমের চায়ের দোকানে। ঘাটে সবাই আছে। তাড়াতাড়ি আয়।
কথা শেষ হওয়ার আগেই আমরা ছুটতে শুরু করতাম। আধোঘুম চোখে, খালি পায়ে কিংবা স্যান্ডেল হাতে, গ্রামের নির্জন রাস্তা ধরে দৌড়ে যেতাম বিশ্বকাপ দেখতে পানুয়া ঘাট বাজারে। ওই সময় অবশ্য ঘরে ঘরে এমন টেলিভিশনের খুব একটা প্রচলন ছিল না।
আমি ছিলাম আর্জেন্টিনার সমর্থক। চলছে ৯৪ বিশ্বকাপ। রাশেদ আর রাসেল ছিল ব্রাজিলের পাগল ভক্ত, কর্নেলও ব্রাজিল। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচ মানেই যেন যুদ্ধ। তর্ক, হাসি, খোঁচা, বাজি, সব মিলিয়ে উৎসব। কিন্তু শুধু সেই ম্যাচ নয়, গভীর রাতের অন্য ম্যাচগুলিও রাশেদ কখনো মিস করত না। তাই ঘুম ভেঙে হলেও প্রায় পনেরো বিশজন সবাই একসঙ্গে খেলা দেখতাম।
আজও মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর স্টেডিয়াম ছিল আমাদের সেই ছোট্ট বাজারের চায়ের দোকান। যেখানে টিভির সামনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতো কাশিপুর-পূর্ব কাশিপুরের অনেক কিশোর। বাপ্পি, ইব্রাহিম, দিদার, শহীদ, আজিম আরও অনেকে আসতো। শুধু খেলা দেখা নয়, আমরা নিজেরাও ছিলাম এক দুর্দান্ত ফুটবল দল।
ম্যারাডোনার ভক্ত হওয়ায় আমার জার্সি ছিল ১০ নম্বর। আবার অধিনায়কও। মজার বিষয় হলো ওই সময়ের বাস্তবতায় টি-শার্টের পেছনে কাগজ কেটে, আঠা দিয়ে নম্বর লাগিয়ে খেলতাম। সেই কাগজের নম্বরই আমাদের কাছে ছিল বিশ্বকাপের জার্সির চেয়েও মূল্যবান।
রাসেল ছিল অসাধারণ স্ট্রাইকার। ব্রাজিলের রোনালদোর মতো ৯ নম্বর জার্সি পরে খেলত। রাশেদ ছিল ১ নম্বর জার্সির গোলরক্ষক। কী দুর্দান্ত গোলকিপিং! আজও মনে হয়, সুযোগ-সুবিধা আর প্রশিক্ষণ পেলে হয়তো অনেক দূর যেতে পারত।
আমাদের বাল্যবন্ধু কর্নেলের ধৈর্য ছিল অবিশ্বাস্য। ভালো খেলতো, নিখুঁত পাস দিত। রিপনকে সবাই একটু ভয়ই পেত। কারণ ওর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে অক্ষত থেকেছে এমন মানুষ খুব কম ছিল, পুরো শরীর হাড্ডিময়। ভাগিনা মামুন ছিল আমাদের দলের সবচেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়দের একজন। বয়সে আমাদের চেয়ে বড় হলেও প্রায়ই আমাদের সঙ্গে একই দলে খেলত। মুকুলও ছিলেন দারুণ ফুটবলার। কখনো টিম লিডার, কখনো কোচ।
মাঝে মাঝে আমার ভাই সফিক ও নুরুল আমিনও খেলায় যোগ দিতেন। আমাদের দলে পূর্ব বাড়ির সফিক ‘ব্যাকি’ (ডিফেন্ডার) হিসেবে খেলত। তার জোরালো শট ছিল দলের বড় শক্তি। তার ভাই হারুনও নিয়মিত খেলত। মানিক বল পায়ে নিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে দৌড়াত, ওটাই ছিল তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গি। নুরুল্লাহ চৌধুরী একবার বল নিয়ে এগোতে শুরু করলে সব ম্যাসাকার করে ফেলতেন। মাঝে মাঝে এখনকার ডা. মামুন ও দীপুও আমাদের সঙ্গে খেলত। আর এখনকার মাস্টার ছোট্ট রিগানও ছিল আমাদের সেই দলেরই ক্ষুদে সদস্য। যে কোনো কাপ টুর্নামেন্টে আমাদের দল ছিল দুর্দান্ত। প্রতিপক্ষের জন্য সত্যিকারের কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। কত কাপ জিতেছি, কত বিকেল খেলেছি, তার কোনো হিসাব নেই। গোল হর্ষধ্বণিতে কেঁপে উঠতো মাঠ।
কিন্তু জীবনের কাছে শেষ পর্যন্ত কোনো দলই অটুট থাকে না। প্রথম ধাক্কাটা এল এসএসসি পরীক্ষার পর যেদিন রাসেল খুলনায় চলে গেল। ওর বাবা আর ভাইয়ের ব্যবসা সেখানে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। রাসেল চলে যাওয়ার পর অনেকদিন কিছুই ভালো লাগত না। আমি রাশেদকে বলতাম, ও কেন চলে গেল? রাশেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত, “না গেলে ওর বাবা ছাড়ত না।”
তারপর আমরা দুজন নদীর ধারে বসে থাকতাম। চুপচাপ। আমরা তিনজন ছিলাম যেন এক আত্মা। হঠাৎ সেই আত্মাটা ভেঙে গেল। কান্না আসতো। এটা হয়তো প্রথম কান্না। আমরা অপেক্ষা করতাম-হয়তো ও আসবে। আবার একসঙ্গে ফুটবল খেলব। পুকুরে ঝাঁপ দেব। কিন্তু সে আর আসেনি। খুলনা তখন আমাদের কাছে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। এরপর কর্নেল, রিপনরাও পরিবারের সঙ্গে শহরে চলে গেল।
এরপর একদিন আমি আম্মাকে বললাম, “আমি বাইরে পড়তে যাব।” তিনি এক কথায় না করে দিলেন। তোমাকে কে দেখবে? ছোট মানুষ।
আমি বললাম, রাসেল তো গেছে।
আম্মা বললেন, ওর ভাই আছে। ওদের মানুষ আছে। তোমার ভইয়েরা থাকে বিদেশ।
প্রথমে ফেনীতে পড়াশোনা। তারপর ঢাকায় ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা। সেটাতেও আম্মার আপত্তি। আজকের মতো তখন ঢাকা যাওয়া এত সহজ ছিল না। তখন গ্রামের মানুষের কাছে ঢাকা মানেই যেন আরেক দেশ। এক বছর ধরে চলল টানাপোড়েন। শেষ পর্যন্ত আমার অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মানলেন। তারপরও বললেন, তোকে কে দেখবে? কে খাওয়াবে? নিজের কাপড়ই তো ধুইতে পারো না। সেখানে আমাদের কেউ নাই। ওনি আসলে আমাকে চোখের আড়াল হতে দিতে চাইতেন না। সবার ছোট হওয়ায় কাছেই রাখতে চান। আমি শুধু বলেছিলাম, আমি সব করবো। তারপর একদিন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। আম্মা অনেক দূর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইলেন।
বারবার আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিলেন। আমিও চোখের পানি লুকাতে পারিনি। কিন্তু তখন আর ফিরে যাওয়ার পথ ছিল না। গন্তব্য ঠিক হয়ে গেছে। সেদিন আমার জীবনের সাঁকো পার হওয়ার সময় পরিচিত একজন মানুষ হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঢাকায় প্রথম থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রথম ভরসাটা দিয়েছিলেন।
আমি যেতামই- হয়তো অন্য কোনো পথ বের হতো। কিন্তু তিনি পথটাকে সহজ করেছিলেন।তারপর আর কোনোদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি।
আজও ডায়েরিতে তাঁর নাম লেখা আছে। আমি তাঁকে খুঁজছি। তাঁর কাছে আমি ঋণী। যারা সত্যিকারের মানুষের উপকার করেন, তারা কখনো হিসাব রাখেন না। কখনো প্রচারও করেন না। আমি সবসময় এমন মানুষদেরই বেশি শ্রদ্ধা করি।
ঢাকায় এসে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হলাম। প্রথমে বিভিন্ন পত্রিকায় ফিচার লিখতাম। মাস্টার্স শেষ হওয়ার আগেই পুরোপুরি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হয়ে গেলাম। দেখতে দেখতে প্রায় দুই দশক কেটে গেল। নানা উত্থান পতনে এই দীর্ঘ পথচলায় অনেক সাফল্য এসেছে। অনেক আনন্দ এসেছে। লিখতে গেলে বহু গল্প লিখা যাবে। কিন্তু সেই আনন্দগুলো দেখার জন্য আম্মা আর বেঁচে ছিলেন না।
আমি বাড়ি ছেড়ে আসার পর তিনি প্রায়ই নামাজের মুসাল্লায় বসে আমার জন্য দোয়া করতেন। তার কিছুদিন পরই তিনি অনন্তের পথে চলে গেলেন। আব্বা অনেক আগেই ছিলেন না।জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি হয়তো এটাই। যাদের জন্য পথচলা শুরু করি, তারা অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই চলে যান।
ক্লাস নাইনে পড়ার সময় বন্ধু ডা. মামুনের মাধ্যমে ওয়েস্টার্ন বই পড়া শুরু করেছিলাম। সেই বইয়ের পাতায় পাতায় আমেরিকার শহর, নদী, পাহাড়, মানুষের গল্প আমাকে মুগ্ধ করত। এই পশ্চিমা বই সিরিজের আমি দারুণ ভক্ত ছিলাম। তখনই মনে মনে বলেছিলাম, একদিন আমিও আমেরিকা যাব। দেশটাকে দেখবো। জীবনের সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন বদলেছে। লক্ষ্য বদলেছে। নতুন স্বপ্ন যুক্ত হয়েছে।
সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতেই আজকে আমি আমেরিকায়।
আজ আমাদের সেই ফুটবল দলের সবাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। কেউ ডাক্তার। কেউ শিক্ষক। কেউ ব্যবসায়ী। কেউ সাংবাদিক। কেউ অন্য কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত। শুধু আমাদের সেই মাঠটা আর আগের মতো নেই। সন্ধ্যা নামলে আর কেউ বাঁশি বাজিয়ে ডাকে না। রাত চারটায় জানালায় টোকা পড়ে না।
কেউ আর বলে না-
“উঠ… খেলা শুরু হয়ে গেছে।”
সময় বড় অদ্ভুত। সে কাউকে হারায় না। শুধু সবাইকে দূরে সরিয়ে দেয়। এখন এই শহরে কখন সূর্য ওঠে আর কখন সন্ধ্যা নামে তার হিসাব থাকে না। ছুটে চলা যেন নিয়তি। নিউইর্য়ক শহরে যখন জ্বলজ্বলে আকাশ তখন দেশে মধ্যরাত। এভাবে বাস্তবতা দূরত্বকে আরও দূরত্বে ঠেলে দেয়।
বাল্য বন্ধুদের আক্ষেপ তাদের জন্য কিছু লিখি না, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় কম। তবে দূরে থাকলেও মন তাদের মাঝে বিচরণ করে।
তাই আজ মনে হয়, বাড়ি ছেড়ে একবার যে মানুষ বেরিয়ে যায়, সে হয়তো মাঝেমধ্যে ফিরে আসে। বেড়াতে আসে। স্মৃতির উঠোনে কিছুক্ষণ বসে থাকে। কিন্তু সত্যিকারের অর্থে আর কখনোই ফিরে যেতে পারে না। কারণ, বাড়ি তখনও আগের জায়গায় থাকে; শুধু সেখানে আর আগের মানুষগুলো থাকে না। এটাই নিয়তি।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক
অভিমত থেকে আরো পড়ুন