https://www.prothomalony.com/

17176

opinion

অভিমত

মে মাস: মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও আমাদের দায়বদ্ধতা

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ ০৩:৫২

সম্প্রতি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী সন্তান ও শ্যালকসহ পরিবারের পাঁচজনকে নৃসংশভাবে হত‍্যা করা হয়েছে। শরীয়তপুরে স্বামীকে(জিয়া উদ্দিন সরদার) হত্যার পর মরদেহ টুকরা করে নদী–ডোবায় ফেলেছেন স্ত্রী আসমা আক্তার। ২০২৪-এ সংগীতাঙ্গনের জনপ্রিয় মুখ মণি কিশোরের অকাল ও রহস্যময় মৃত্যুর করুণ পরিণতি  আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে হত্যা করে শরীরের অংশ বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেয়ার মতো ঘটনা পুরো কমিউনিটিকে শোকাতুর করে তুলেছে। এমন বহু নির্মম ঘটনা বিশ্বজুড়ে রোজ ঘটছে।

এই প্রতিটি ঘটনার গভীরে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখব—এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ বা দুর্ঘটনা নয়। এর অন্তরালে লুকিয়ে ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা চরম বিষণ্নতা, অবদমিত ক্ষোভ কিংবা অপ্রকাশিত মানসিক যন্ত্রণা। আমরা যখন আমাদের চারপাশের মানুষের মনের খবর নিতে ব্যর্থ হই, তখনই সমাজকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

মে মাসজুড়ে পালিত হচ্ছে 'মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা মাস'। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা মাসের যাত্রা শুরু হয় আজ থেকে ৭৭ বছর আগে, ১৯৪৯ সালে। এটি শুরু করেছিল 'মেন্টাল হেলথ আমেরিকা' নামক সংস্থাটি, যা সেই সময়ে 'ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর মেন্টাল হেলথ' নামে পরিচিত ছিল। মূলত মানসিক অসুস্থতা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

মানসিক স্বাস্থ্য হলো আমাদের চিন্তা, আবেগ এবং আচরণের একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা। এটি কেবল কোনো 'মানসিক রোগ' না থাকা নয়, বরং মানসিকভাবে শক্তিশালী থাকা। আমরা কীভাবে মানসিক চাপ সামলাই, প্রিয়জনদের সাথে কীরূপ আচরণ করি এবং জীবনের কঠিন সময়ে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিই—সবই নির্ভর করে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় একটি বড় সংকট হলো—আমাদের শারীরিক অসুস্থতা যতটা গুরুত্ব পায়, মনের খবর আমরা ততটা রাখি না। পেটে ব্যথা বা জ্বরের জন্য আমরা যতটা উদগ্রীব হয়ে চিকিৎসকের কাছে ছুটি, মনের গহীনে জমে থাকা ক্ষতের কথা আমরা ঠিক ততটাই অবহেলা করি। অথচ এই অবহেলার চড়া মাশুল আমাদের দিতে হচ্ছে প্রতিদিন।

মানসিক স্বাস্থ্যের বিশ্বজনীন চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশই এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশটিতে প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন কোনো না না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। যার মধ্যে ৪৮ মিলিয়ন মানুষ অ্যানজাইটি বা উদ্বেগজনিত সমস্যায় এবং ২১ মিলিয়ন মানুষ চরম বিষণ্নতায় (Major Depression) আক্রান্ত। এর বাইরেও পিটিএসডি, বাইপোলার এবং ওসিডির মতো জটিল সমস্যায় ভুগছেন আরও কয়েক কোটি মানুষ।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি আরও বেশি উদ্বেগজনক। ২০২৪-২০২৬ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪.৪% বা প্রায় ৭৪ লক্ষ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন, যেখানে পুরুষদের (৩.৬%) তুলনায় নারীদের (৫.১%) হার লক্ষণীয়ভাবে বেশি। এছাড়া প্রায় ৪.৪% মানুষ উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। সবচেয়ে ভীতি জাগানিয়া তথ্য হলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে; ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১৩.৬% কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।

এ বছরের মার্চ-এপ্রিলে বাংলাদেশে ১৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করতে 'বাধ্য' হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী। কেবল ২০২২ সালেই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের ৪৪৬ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে স্কুল ও সমমান পর্যায়ের ৩৪০ এবং কলেজ পর্যায়ে ১০৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন। কিন্তু এই সংকটের চেয়েও বড় সংকট হলো চিকিৎসার অভাব। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৯২.৩% প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৯৪.৫% শিশু কোনো ধরনের চিকিৎসার আওতায় আসে না, যা এক বিশাল 'ট্রিটমেন্ট গ্যাপ' বা চিকিৎসাল্পতাকে নির্দেশ করে।

কেন আমরা মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিই না, তারও প্রধান কিছু কারণ রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো 'লোকভয়'। আমাদের সমাজে মানসিক সমস্যাকে এখনো 'পাগলামি' হিসেবে দেখা হয়। কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ—এটি জানাজানি হলে লোকে তাকে সমাজচ্যুত করবে বা উপহাস করবে, এই ভয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তার পরিবার বিষয়টি লুকিয়ে রাখেন।

শরীরের কোনো অংশ কাটলে বা হাড় ভাঙলে তা বাইরে থেকে দেখা যায়। এক্স-রে বা রক্ত পরীক্ষায় রোগ ধরা পড়ে। কিন্তু মনের কষ্ট অদৃশ্য। এটি কোনো যন্ত্রে ধরা পড়ে না বলে অনেকেই একে 'আদিখ্যেতা', 'বিলাসিতা' বা 'মনগড়া সমস্যা' বলে উড়িয়ে দেন। মানুষ মনে করে, যা দেখা যায় না তা আসলে কোনো সমস্যাই না।

এছাড়া, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য যে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা থেরাপি প্রয়োজন, তা নিয়ে আমাদের জানাশোনা খুব কম। অনেক সময় বিষণ্নতা বা উদ্বেগকে মানুষ 'অলসতা' বা 'ইচ্ছাশক্তির অভাব' বলে ভুল করে। সঠিক তথ্যের অভাবে মানুষ বুঝতে পারে না যে এটি একটি রোগ এবং এর প্রতিকার আছে।

আমাদের দেশে অনেক সময় মানসিক সমস্যাকে 'জ্বীন-ভূতের আছর' বা 'অভিশাপ' হিসেবে দেখা হয়। মানুষ বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার বদলে ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজি চিকিৎসার পেছনে দৌড়ায়। আবার অনেকে মনে করেন এটি ধর্মীয় বিশ্বাস কম হওয়ার ফল, যা আক্রান্ত ব্যক্তিকে আরও বেশি অপরাধবোধে ফেলে দেয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের সুচিকিৎসা এখনো অনেকের নাগালের বাইরে। দক্ষ সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্টের সংখ্যা বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং এই চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে শারীরিক রোগের চিকিৎসা করানোই যেখানে বিলাসিতা, সেখানে মনের চিকিৎসার কথা তারা ভাবতেই পারে না।

আবার আমাদের পরিবারে শিশুদের শেখানো হয় "শক্ত হতে হবে", "কান্না করা দুর্বলতা" কিংবা "সব কষ্ট সহ্য করে নিতে হবে"। বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে আবেগ প্রকাশ করাকে এক ধরণের লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এই 'টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি' বা ভুল শিক্ষা মানুষকে ভেতর থেকে একা করে দেয়, যার ফলে তারা পরবর্তীতে মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে চায় না বা বলতে পারে না।

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেন জীবনের জন্য অপরিহার্য?

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেবল সুস্থ অনুভূতির বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের ভিত্তি যা অবহেলিত হলে পুরো অস্তিত্বই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো জীবন বাঁচানো; কারণ যখন আমরা মনের কষ্টের মূল্যায়ন করি না, তখনই মানুষ চরম একাকীত্বে ভোগে বা আত্মহননের পথ বেছে নেয়—অথচ সময়মতো একটু সহানুভূতি বা চিকিৎসকের পরামর্শ একজনকে অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরিয়ে আনতে পারে।

এই যে ভয়াবহতম রূপ আমরা দেখতে পাই সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু বীভৎস ঘটনায়, যেখানে মানসিক অস্থিরতা আর অবদমিত ক্ষোভের কারণে মানুষ নিজের পরিবারের সদস্যদের পর্যন্ত হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করছে না। মানসিক স্বাস্থ্য যখন চরম অবনতির দিকে যায়, তখন তা কেবল আত্মঘাতীই হয় না, বরং সমাজ ও প্রিয়জনদের জন্যও তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। পারিবারিক এই ট্র্যাজেডিগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মনের যত্ন না নেওয়া মানে কেবল নিজেকে নয়, বরং পুরো পরিবারকেই এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।

মানসিকভাবে সুস্থ না থাকলে প্রিয়জনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং খিটখিটে মেজাজ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা অহেতুক সন্দেহ পারিবারিক কলহের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার চরম রূপ আমরা রোজ নানা বীভৎস ঘটনার মূলে পারিবারিক সম্পর্কের অবক্ষয় ও মানসিক অস্থিরতার মাঝে দেখতে পাই।

তাছাড়া, মানসিক প্রশান্তি একজন মানুষকে কর্মক্ষেত্রে বা পড়াশোনায় মনোযোগী ও সৃজনশীল করে তুললেও বিষণ্নতা তার মেধা ও শ্রম দেওয়ার ক্ষমতাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়। আবার বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা সরাসরি সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলে; ঘরে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব না থাকলে শিশুরা বিষাক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠে, যা তাদের ভবিষ্যতে অনিরাপত্তা ও আচরণের অস্বাভাবিকতা তৈরি করে—যার প্রমাণ বর্তমানের ১৩.৬% শিশুর মানসিক সমস্যার পেছনে পরিবারের এই চরম উদাসীনতা।

এছাড়া, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে মন ও শরীর একে অপরের পরিপূরক, তাই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে শরীরকে অন্যান্য রোগের কাছেও নমনীয় করে তোলে।


কাজেই নিজের এবং পরিবারের সকলের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া এখন আর কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা। আমরা যখন ঘরের ভেতরে একে অপরের মনের খবর নিতে শিখব, তখনই সমাজ থেকে এই বীভৎস অপরাধপ্রবণতা আর আত্মহননের মিছিল কমানো সম্ভব হবে। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

আমাদের প্রত্যেককে নিজের মনের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। জীবনের কঠিন সময়ে আবেগ চেপে না রেখে বিশ্বস্ত কারো সাথে শেয়ার করা কিংবা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সামাজিক কুসংস্কার এড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং পরিবারের শিশু সন্তানদের মনের খবর নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শৈশব থেকেই তাদের শেখাতে হবে যে আবেগ প্রকাশ করা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং সুস্থ থাকার একটি মাধ্যম। "সব ঠিক হয়ে যাবে" ভেবে মুখ বুজে সহ্য করার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

সমাজকে মানসিক রোগ নিয়ে বিদ্রূপ বা অবজ্ঞা বন্ধ করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে 'পাগল' তকমা না দিয়ে তাকে সহমর্মিতার সাথে গ্রহণ করা এবং তার চিকিৎসায় সহায়তা করাই হবে সামাজিক বড় অর্জন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত আলোচনা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।

একই সাথে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো এবং দারিদ্রশ্রেণির জন‍্য বিনামূল‍্যে সেবা প্রদান।  জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল গুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়োগ দেওয়া এবং বিনামূল্যে বা সুলভে থেরাপির ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি উদ্যোগে টেলিভিশন, রেডিও এবং জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়মিত সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ বা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরতলীতে উঠান বৈঠক বা সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে। ইমাম, শিক্ষক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এই প্রচারণায় সম্পৃক্ত করতে হবে যাতে তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে পারেন যে মানসিক রোগ কোনো অভিশাপ নয় এবং এর সঠিক চিকিৎসা আছে। মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রসারে সরকারিভাবে সার্বক্ষণিক (২৪/৭) টোল-ফ্রি মেন্টাল হেলথ হটলাইন চালু করা হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কেবল হটলাইন নম্বর চালু রাখাই যথেষ্ট নয়; এই সেবার মান নিয়মিত তদারকি করা এবং বিশেষজ্ঞ সাইকোলজিস্টদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া জাতীয় পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে শৈশব থেকেই শিক্ষার্থীরা আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক চাপ সামলানোর কৌশল শিখতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার, তা হলো মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন। আমাদের দেশে দেখা যায়, যারা দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা, উৎকণ্ঠা বা ট্রমার মধ্য দিয়ে যান, তারা সাময়িক স্বস্তির খোঁজে মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়েন। আবার যারা মাদকাসক্ত, তাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গিয়ে সিজোফ্রেনিয়া বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো ভয়াবহ মানসিক রোগের জন্ম দেয়। তাছাড়া আমরা দেখতে পাই সিলেট সদর উপজেলার কান্দিরগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের এক দিনমজুরের চার বছরের মেয়ে ফাহিমাকে ধর্ষণ করে হতযা করা জাকির নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি ইয়াবা আসক্ত। সম্প্রতি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভোমরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীদাড়ি গ্রামে অনলাইন জুয়া ও মাদকে আসক্ত স্বামী তার ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তাছলিমা খাতুন (৩৫) কে জবাই করে হত্যা করেছেন। গত বছর মধুপুর উপজেলার মহিষমারাতে নেশাগ্রস্ত ছেলে রাজিবের হাতে রাজিয়া (৪৫) নামে এক মায়ের মৃত্যু হয়েছে।

এই যে ভয়াবহতা-এগুলি কেবল দু'চারটার হিসাব। রোজ এমন ঘটনা ঘটছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে সমাজে এই ধরনের নৃশংস অপরাধ, ধর্ষণ এবং পারিবারিক সহিংসতা কোনোভাবেই কমানো সম্ভব নয়। কেবল খুচরা বিক্রেতা নয়, মাদকের মূল উৎস এবং চোরাচালানের সিন্ডিকেটগুলোকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্মূল করতে হবে। মাদকাসক্তদ্র জন‍্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং মানবিক চিকিৎসার সুবিধাসম্পন্ন পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে শুধু মাদক থেকে দূরে রাখাই যথেষ্ট নয়; সেখানে দক্ষ সাইক্রিয়াট্রিস্টদের মাধ্যমে রোগীদের ভেতরের মানসিক ট্রমা বা বিষণ্নতার চিকিৎসা করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। তাদের মানসিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে কাউন্সেলিং এর ব‍্যবস্থা করতে হবে।

দিনশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত। মনের ক্ষতগুলো যখন অবহেলা আর মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তখন তার পরিণতি কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, বরং পুরো সমাজকে পঙ্গু করে দেয়।

মে মাসের এই সচেতনতা কেবল কাগজে-কলমে বা স্যোশাল মিডিয়ার দেয়ালে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের বদলাতে হবে ঘর থেকে। আসুন, পরিবারের সদস্যটির নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করি, পাশের মানুষটির বিষণ্ন চোখ দুটোকে অবহেলা না করে পরম মমতায় হাতটা বাড়িয়ে দিই। মন ভালো থাকলেই ভালো থাকবে পরিবার, আর তবেই গড়ে উঠবে একটি সহিংসতাহীন, সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন