https://www.prothomalony.com/
16865
opinion
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর গ্রামে ১১ এপ্রিলের ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সামাজিক বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। দুপুরের আলোয়, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জনের একটি দল—যাদের বেশিরভাগই তরুণ—রড-লাঠি হাতে একটি দরবারে হামলা চালায়, দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে একজন মানুষকে টেনে বের করে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করে। পুলিশের উপস্থিতি সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ময়নাতদন্তে মুখমণ্ডলে একাধিক আঘাতের চিহ্ন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু—এই তথ্যগুলো শুধু নৃশংসতার মাত্রাই নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলার ভঙ্গুর অবস্থাকেও স্পষ্ট করে।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এটি তিনটি গভীর সংকটের সম্মিলিত ফল—মব মানসিকতা, দুর্নীতি, এবং ছিনতাই বা লুটপাটের সংস্কৃতি। এই তিনটি প্রবণতা একসঙ্গে সমাজকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে আইন নয়, জনতার রায়ই হয়ে উঠছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
প্রথমত, মব বা গণপিটুনির সংস্কৃতি এখন আর হঠাৎ উত্তেজনার ফল নয়; এটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত অভিযোগ, কিংবা নিছক সন্দেহ—এসবই মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে ‘বিচারক’ বানিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিচার করার অধিকার কে দিল? রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা কি এতটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে যে মানুষ নিজেই আইন হাতে তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে? নাকি এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা, যেখানে আইনকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার প্রদর্শনই মূল উদ্দেশ্য?
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি এই পুরো ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। যখন মানুষ দেখে অপরাধীরা শাস্তি পায় না, প্রভাবশালীরা আইনের ঊর্ধ্বে থাকে, তখন তাদের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে। সেই শূন্যস্থানেই জন্ম নেয় মব বিচার। “আইন দিয়ে কিছু হবে না”—এই বিশ্বাসই মানুষকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়। ফলে বিচারব্যবস্থার ধীরগতি, তদন্তের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে একটি অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে ন্যায়বিচারের বদলে প্রতিশোধই হয়ে ওঠে প্রধান চালিকা শক্তি।
তৃতীয়ত, এই ধরনের হামলার পেছনে লুকিয়ে থাকে ছিনতাই ও লুটপাটের প্রবণতা। ফিলিপনগরের ঘটনায় দরবারে হামলার পর সোনার মুকুট, বাঁশি লুট হওয়ার তথ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে, অনেক ক্ষেত্রেই ‘ধর্মীয়’ বা ‘নৈতিক’ ইস্যুর আড়ালে মূল উদ্দেশ্য থাকে সম্পদ দখল। অর্থাৎ, মব শুধু বিচার করছে না—সে সুযোগ নিচ্ছে, লুট করছে, নিজের স্বার্থ পূরণ করছে। এটি সমাজের জন্য আরও বিপজ্জনক, কারণ এতে অপরাধের নৈতিক বৈধতা তৈরি হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ঘটনায় অংশ নেওয়া অধিকাংশই তরুণ। ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী এই প্রজন্ম যদি সহিংসতাকে ন্যায্য মনে করে, তাহলে ভবিষ্যৎ সমাজ কোন দিকে যাবে? শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, সামাজিক মূল্যবোধ—সবকিছুতেই কোথাও না কোথাও বড় ধরনের ভাঙন তৈরি হয়েছে বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা, যুক্তিবোধ এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা গড়ে তোলার পরিবর্তে আমরা যেন তাদের ক্রমেই উত্তেজনা, বিভাজন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও এখানে প্রশ্নের মুখে পড়ে। ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি—এটি শুধু জনবল সংকট নয়, বরং প্রস্তুতি, কৌশল এবং কর্তৃত্বের ঘাটতির দিকেও ইঙ্গিত করে। যদি একটি সংগঠিত জনতা সহজেই পুলিশের সামনে একজন মানুষকে হত্যা করতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হলো—আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দ্রুত, স্বচ্ছ এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে মব মানসিকতা থামানো যাবে না। একই সঙ্গে গুজব রোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর নজরদারি, তরুণদের জন্য সচেতনতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা, এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মব, দুর্নীতি আর ছিনতাই—এই তিনটি ক্ষত আলাদা নয়; তারা একে অপরকে পুষ্ট করে। একটির অবহেলা অন্যটিকে শক্তিশালী করে তোলে। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। শুধু আইন দিয়ে নয়, সামাজিক ও নৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমেও এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
ফিলিপনগরের সেই দুপুর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন একটাই: আমরা কি এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এগোব, নাকি এখনই দাঁড়িয়ে বলব—এটা আমাদের সমাজ নয়?
অভিমত থেকে আরো পড়ুন