https://www.prothomalony.com/

16537

opinion

অভিমত

সম্পাদকীয়

ঈদ যাত্রা ও নিরাপত্তা: আনন্দের মধ্যে সতর্কতার প্রয়োজন

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ ০৩:৫৯

ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় বার্ষিক ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসব কেবল ধর্মীয় রীতিনীতির জন্য নয়, বরং এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও ব্যাপক। বাংলাদেশে ঈদ মানেই পরিবারের কাছে যাওয়া, গ্রামমুখী মানুষের ভিড়, পুরনো বন্ধুত্বের পুনর্মিলন, মায়াপূর্ণ সম্পর্কের পুনর্জীবন। শহরের ভিড় ও ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষ ফিরে যায় গ্রামে, যেখানে বাবা-মায়ের কোল আর ভাইবোনের সান্নিধ্য আনন্দের উৎস।

ঈদ যাত্রা আমাদের জীবনের আনন্দের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তবে, এই আনন্দের সঙ্গে রয়েছে অতি গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয় – নিরাপত্তা। প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে সড়ক, লঞ্চ ও রেলপথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা মানুষকে শোক ও দুঃখে ভরিয়ে দেয়। কিছু পরিবারের জন্য ঈদ আসে না আনন্দের সঙ্গে, বরং আসে অনিশ্চয়তা ও কষ্টের ছায়া নিয়ে।

বাংলাদেশের সড়কপথে ঈদ যাত্রা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শহর থেকে গ্রামে বা গ্রাম থেকে শহরে মানুষ হাজার হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করে। বড় শহরগুলোতে বাস, মাইক্রোবাস, ট্রাকসহ নানা ধরনের যানবাহন ভিড় করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই যানজট এবং ভিড়ে সড়ক দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। গাড়ির অতিরিক্ত ভাড়া, লাইসেন্সবিহীন চালক, সড়কের খারাপ অবস্থা এবং অতিরিক্ত গতিবেগ – এগুলো মিলিত হয়ে মানুষকে বিপদে ফেলছে। প্রতি বছর ঈদে এই ধরনের দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায় এবং হাজারো মানুষ আহত হয়।

পদ্মা, মেঘনা বা কপোতাক্ষের মতো নদী পারাপারে লঞ্চ, স্টিমার এবং ফেরি যানবাহন ব্যবহার করা হয় প্রচুর মানুষের জন্য। এই যাত্রা অনেক সময়ই নিরাপদ নয়। নৌপরিবহনে নিয়মিত সেফটি মানদণ্ডের অভাব, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, লাইফজ্যাকেটের অনুপস্থিতি – সব মিলিয়ে নৌদুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে ছোট নদী, নদী তীরবর্তী এলাকা এবং আবহাওয়ার খারাপ অবস্থায় লঞ্চ যাত্রা অনেক সময় প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তদুপরি, পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ এবং যাত্রীদের ভিড়কে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে আরও বৃদ্ধি করে। কিছু পরিবার রাতের অন্ধকারে বা ভোরের আলোতে যাত্রা করতে বাধ্য হয়। অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শিশুরা এই বিপদে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ফলে ঈদ আনন্দের দিনগুলোও দুঃখ, আঘাত ও শোকে পরিণত হতে পারে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দৃঢ় পদক্ষেপ। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবহন কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। সড়কপথের অবকাঠামো উন্নত করতে হবে, বাস এবং লঞ্চের যাত্রী ধারণ ক্ষমতা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং সঠিক চালক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সেফটি মানদণ্ড কঠোরভাবে মানা জরুরি। শুধুমাত্র আইন নয়, মানুষকেও সচেতন হতে হবে। যাত্রার আগে যানবাহনের অবস্থা পরীক্ষা, লাইফজ্যাকেট এবং জরুরি সরঞ্জাম রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়ানো – এগুলো জীবন রক্ষার অন্যতম উপায়।

সমাজের দায়িত্বও কম নয়। পরিবার, বন্ধু এবং প্রতিবেশীরা একে অপরকে সচেতন করতে পারে। ছোটদের শিক্ষা দেওয়া দরকার, যে যাত্রার আগে সতর্ক থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমও ভূমিকা রাখতে পারে – দুর্ঘটনার খবর এবং সতর্কবার্তা প্রচার করে মানুষকে সচেতন করা যায়।

ঈদ মানে শুধুই আনন্দ নয়, এটি মানুষের জন্য আত্মিক শান্তি, সম্পর্কের পুনর্মিলন এবং সামাজিক সংহতির প্রতীক। কিন্তু এই আনন্দের সঙ্গে যদি থাকে মৃত্যুর ঝুঁকি, আহত হওয়ার ভয়, পরিবার হারানোর দুঃখ, তবে ঈদের আসল মানে হারিয়ে যায়। তাই নিরাপত্তাকে আনন্দের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের উচিত প্রতিটি যাত্রাকে নিরাপদ করা। শিশুদের জন্য, বৃদ্ধদের জন্য এবং নিজস্ব পরিবারের জন্য সচেতনতা, সাবধানতা ও সুরক্ষা অপরিহার্য। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করলে ঈদ আনন্দ হবে পূর্ণতা, শোকের ছায়া থাকবে না। দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হলে, মানুষ দুঃখ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না থেকে ঈদের আসল আনন্দ উপভোগ করতে পারবে।

শেষ পর্যন্ত, ঈদ আমাদের শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতারও পরীক্ষা। প্রতিটি যাত্রা, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সুরক্ষার উদ্যোগ একদিকে যেমন জীবন বাঁচাবে, অন্যদিকে উৎসবের আনন্দকে আরও প্রগাঢ় করবে। তাই এই ঈদে আনন্দের সঙ্গে সতর্কতা হাত ধরাধরি করে চলুক। নিরাপদ যাত্রাই হবে আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় উপহার।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন