https://www.prothomalony.com/
16300
opinion
সব কলম সত্যের ওজনে কাঁপে না। অনেক কলম কেবল ছন্দ মেলায় পারঙ্গম, অনেকে ক্ষমতার চাটুকারিতায় কেবল কালির অপচয় করে যান। কিন্তু মহাকাল সেই কবিদেরই অক্ষয় করে রাখে, যারা বুক পেতে ‘সময়ের সাক্ষী’ হতে জানেন। যখন চারপাশ মিথ্যার উৎসবে মেতে ওঠে, যখন বেইমানি আর আপসের মদিরায় সবাই আচ্ছন্ন, তখন যিনি একা দাঁড়িয়ে ‘না’ বলার দুঃসাহস দেখান-তিনিই কবি।
জিয়া হক- তেমনই একজন। যাঁর কলম কেবল শব্দ সাজায় না, বরং জুলাইয়ের সেই রক্তঋণ আর হাহাকার থেকে শুরু করে ওসমান হাদিকে পর্যন্ত কাগজের বুকে অমরত্ব দেয়। তাঁর কবিতার পঙ্ক্তি ক্ষমতার অলিন্দে ঘটা রফার বিরুদ্ধে এক একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন। যখন ঘাতকের বিচার চাওয়াটা ‘গদি নড়বড়ে’ হওয়ার ভয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, তখন জিয়া হকের মতো কবিরাই হয়ে ওঠেন বিপন্ন মানবতার শেষ কণ্ঠস্বর।
আমি জিয়া হককে জানতে শুরু করি শিল্পী আবু উবায়দার মাধ্যমে, উবায়দার কণ্ঠে সেই বুকে বিঁধে যাওয়া দুটো গান-"হাদি তুই ফিরে আয়", এবং "হাদি সাহারার ঊষার বালুতে"-গান শুনে।
শিল্পী আবু উবায়দার সেই দরদমাখা কণ্ঠে গানগুলো যখন কানে বাজে, তখন ওসমান হাদি কেবল একটা নাম বা স্রেফ একজন নিহত আন্দোলনকারী থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন আমার ঘরের হারানো ভাই, আমার হৃদয়ের এক অপূরণীয় ক্ষত। উবায়দার কণ্ঠে যখন হাদিকে ফিরে আসার আকুতি ধ্বনিত হয়, তখন ফ্লাশিং-এর কনকনে শীত কিংবা আমার যান্ত্রিক জীবনের সমস্ত ধুলোবালি নিমেষেই মুছে যায়। সুরের সেই মরমী টানে ওসমান হাদি যেন অন্ধকার কবরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আবার আমার রাজপথে এসে দাঁড়ান। জিয়া হকের লেখায় হাদি যে দ্রোহের প্রতীক, উবায়দার কণ্ঠে সেই হাদিই হয়ে ওঠেন রক্ত-মাংসের এক জীবন্ত সত্তা-যাঁর শরীরের ঘ্রাণে আজও লেগে আছে ফ্যাসিবাদবিরোধী সেই তপ্ত রোদ।
আমি ভাবি, কেমন করে একজন কবি এমন কবিতা লিখতে পারেন, যা শুনতে শুনতে ওসমান হাদি আমার কাছে হয়ে ওঠেন এক বিশ্বজনীন বিপ্লবী, যাঁর তেজ সাহারার মরুবালুর চেয়েও উত্তপ্ত। গানগুলো শুনলে মনে হয়, হাদি মরেননি; বরং তিনি প্রতিটি বঞ্চিত মানুষের মেরুদণ্ডে নতুন করে শক্তি জোগাচ্ছেন। তাঁর সেই সাহসী চোখ দুটো যেন সুরের আড়াল থেকে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে-কেন আজও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের গিলে খাচ্ছে?
'হাদি, তুই ফিরে আয়’ এবং ‘হাদি সাহারার ঊষার বালুতে’ নিয়ে আমি আমার মনের ভাবনা লিপিবদ্ধ করেছি। আজ তার আরেকটি কবিতা ‘খুনির বিচার করতে হবে ইন্টেরিমের ছা’ নিয়ে লিখছি।
কবিতাটির সারমর্মে যা স্পষ্ট হয়, তা হলো-বিপ্লব-পরবর্তী ন্যায়বিচারের নামে নতুন অত্যাচার বা ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান। বিপ্লব-পরবর্তী 'ইন্টেরিম' বা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার কাছে সাধারণ মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তার সাথে রূঢ় বাস্তবতার সংঘাত ঘটছে। রাষ্ট্রতত্ত্বের ভাষায়, যখন একটি গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন শক্তি ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের প্রথম কাজ হয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু কবি এখানে দেখিয়েছেন, সেই বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়াটি যখন আবার 'গুলি' আর 'অত্যাচারে' পর্যবসিত হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিটিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এটি কেবল একটি কবিতা নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই পুরনো ফ্যাসিবাদী প্রেতাত্মার ফিরে আসার এক সতর্কবাণী।
কবিতার প্রথম পঙতিগুলো- "খু/নির বিচার চাইতে গিয়ে খাইতে হলো গুলি/ ইন্টেরিমের অত্যাচারে আহত বুলবুলি / কার ইশারায় কখন কী হয় বোঝার উপায় নাই/ যমুনাতে নোবেলজয়ীর নাম-নিশানা পাই?"
কবি খুব সূক্ষ্মভাবে 'যমুনা' এবং 'নোবেলজয়ী'র উল্লেখ করে বর্তমান ক্ষমতার (এই মুহূর্তে যা অতীত) কেন্দ্রবিন্দুকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। বিশ্বমঞ্চে যার জয়জয়কার, নিজের দেশের মাটিতে কেন তার প্রশাসন 'বুলবুলি' বা 'জুমাদের' আর্তনাদ থামাতে পারছে না-এই দ্বিধাটি অত্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক। এটি দেখায়, গদি বা ক্ষমতার মসনদ যখন নড়বড়ে থাকে, তখন রাষ্ট্র অনেক সময় আপসকামিতার পথ বেছে নেয়, যা প্রকারান্তরে 'খুনির' হাতকেই শক্তিশালী করে।
"জাবের কেন হাসপাতালে, রক্ত কেন ঝরে/ খুনির বিচার করতে গেলে গদিটা নড়বড়ে/ কার কাছে কই দুখের কথা, মেজাজ খারাপ লাগে/ হাদিই যদি বিচার না পায় আমরা কোনো দাগে.."
কবিতায় ওসমান হাদি এবং জাবেরের প্রসঙ্গ কেবল নাম হয়ে আসেনি, বরং এগুলো একেকটি দগদগে জখম। ইনকিলাব মঞ্চের সেই সাহসী তরুণ, ওসমান হাদি যিনি নিজের প্রাণের তোয়াক্কা না করে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন-তাঁর হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে যখন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে পুলিশের গুলিতে আহত হতে হয়, তখন রাষ্ট্রকাঠামোর রুগ্ন দশাটিই নগ্ন হয়ে পড়ে। হাদির মতো ত্যাগী মানুষ যখন বিচার পায় না, তখন কবির ভাষায় ‘চুনোপুঁটি’ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা যে হিমাঙ্কের নিচে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট। কবি এখানে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে দেখিয়েছেন যে-এক ফ্যাসিস্টের পতনের পর যদি পরবর্তী কোনো শাসনব্যবস্থা বা রূপরেখা ‘খুনির বিচার’ করতে ভয় পায় কিংবা রাজনৈতিক সমীকরণের অজুহাতে পিছু হটে, তবে সেই পরিবর্তন কেবলই এক মরীচিকা। যদি রাজপথের রক্ত আর গদির সমঝোতা একাকার হয়ে যায়, তবে সেই তথাকথিত পরিবর্তন আসলে ব্যবস্থার আমূল সংস্কার নয়, বরং তা কেবল শোষণের হাতবদল।
কবিতার শেষ দিকে কবির ক্ষোভ যখন 'ইন্টেরিমের ছা' পর্যন্ত পৌঁছায় (ফ্যাসিস্ট হাসে মুখটিপে ওই, কাঁদে আমার মা/ খুনির বিচার করতে হবে ইন্টেরিমের ছা!), তখন তা আর কেবল শোক থাকে না, তা হয়ে ওঠে তীব্র রাজনৈতিক ঘৃণা। "ফ্যাসিস্ট হাসে মুখটিপে"-এই চিত্রকল্পটি অত্যন্ত ভয়াবহ। এর মানে, যদি প্রশাসন বিচারহীনতার সংস্কৃতি জারি রাখে, তবে পরাজিত স্বৈরাচারই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় এবং ফিরে আসে।
'জিয়া হকের ‘খুনির বিচার করতে হবে ইন্টেরিমের ছা’ কবিতাটিকে সার্থকভাবেই একটি পলিটিক্যাল এলিজি বলা যায়। সাধারণত এলিজি বা শোকগাথা হয় কোনো ব্যক্তি-মানুষের বিয়োগে, যা কেবল ব্যক্তিগত শোকের বৃত্তে সীমাবদ্ধ। কিন্তু পলিটিক্যাল এলিজি সেই বৃত্ত ভেঙে এমন একজনের জন্য হাহাকার করে, যাঁর মৃত্যু একটি জাতি, একটি সম্প্রদায় বা একটি নির্দিষ্ট আদর্শের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এখানে ওসমান হাদি কেবল একজন রক্ত-মাংসের মানুষ নন; তিনি একটি বিপ্লব, একটি অবিনাশী ইনকিলাবের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর মৃত্যু নিয়ে শোক করা মানে-কেবল একজন সহযোদ্ধাকে হারানো নয়, বরং দেশের বর্তমান বিচারহীনতা ও পচে যাওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর ক্ষোভ উগরে দেওয়া।
এই ধারার কবিতায় অনেক সময় মানুষের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ‘হারানো আদর্শ’। এখানে ব্যক্তিগত বিলাপ নয়, বরং রাষ্ট্রের চরম সংকট এবং সামাজিক অন্যায়ের এক সম্মিলিত হাহাকার দ্রোহে রূপান্তরিত হয়। জিয়া হক যখন খুনিদের বিচারের পাশাপাশি ক্ষমতার সমঝোতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, তখন তা আর কেবল শোকগাথা থাকে না; তা হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ইশতেহার।
এই কবিতাটি আবার একদিকে যেমন কনফেশনাল পোয়েট্রি হিসাবে ধরা যায়, তেমনি এটি হয়ে ওঠে পোয়েট্রি অফ রেজিস্ট্যান্স।
কবিতার কিছু অংশে কবির নিজস্ব অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের এক নগ্ন স্বীকারোক্তি আমরা দেখতে পাই। বিশেষ করে-"কার কাছে কই দুখের কথা, মেজাজ খারাপ লাগে" কিংবা "আমরা চুনোপুঁটিও না আমরা কোথায় যাবো"- এই পঙ্ক্তিগুলোতে ফুটে ওঠে কবির ভেতরের এক গভীর হাহাকার। এখানে কবি কোনো আলঙ্কারিক আবরণ ছাড়াই নিজের আবেগ ও অবস্থানকে পাঠকদের সামনে মেলে ধরেছেন। এই প্রান্তিক মানুষের অসহায়ত্ব এবং নিজেকে ‘চুনোপুঁটি’ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই কবি আসলে রাষ্ট্র ও ব্যবস্থার কাছে এক চরম মানসিক যন্ত্রণার দলিল পেশ করেছেন।
আবার, এই একই কবিতায় কবি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভয়হীনভাবে সোচ্চার হন এবং জনগণকে এক বৃহত্তর সত্যের দিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। কবিতার শেষ চরণে যখন কবি অমোঘ দাবি তোলেন- "খুনির বিচার করতে হবে...", তখন তা আর কবির ব্যক্তিগত শোক বা হাহাকার থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক সম্মিলিত প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর। এটি তখন একটি রাজনৈতিক ইশতেহারে রূপান্তরিত হয়, যা সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
'খুনির বিচার করতে হবে ইন্টেরিমের ছা’ -এই কবিতাটি আসলে একটি বার্তা বহন করে: ন্যায়বিচারের শক্ত খুঁটি ছাড়া ক্ষমতার প্রাসাদ নড়বড়ে। জিয়া হক তাঁর কলমে সেই সত্যকেই তুলে ধরেছেন-যেখানে শোক আর দ্রোহ হাত ধরাধরি করে এক অবিনাশী বিপ্লবের গান গেয়ে যায়। আর গানের সুরে আমাদের মতো চুনোপুঁটি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে হাদিরা বারবার জেগে ওঠে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন