https://www.prothomalony.com/
16054
opinion
বাংলাদেশে আবারও জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হয়েছে। পোস্টার, স্লোগান, সভা-সমাবেশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তর্ক—সব মিলিয়ে রাজনীতি নতুন করে সরব। নির্বাচন মানেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান উৎসব; কিন্তু একই সঙ্গে এটি সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও। কারণ, কেবল নির্বাচন আয়োজন করাই জনগণের শাসন নিশ্চিত করে না—নির্বাচনের চরিত্র, পরিবেশ, অংশগ্রহণ ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই নির্ভর করে একটি দেশ সত্যিই গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে কি না।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস দেখলে নির্বাচন সবসময়ই কেন্দ্রীয় জায়গা দখল করে আছে। তবে এই ইতিহাস একরৈখিক নয়। কোথাও নির্বাচন জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে, আবার কোথাও তা বিতর্ক, বর্জন ও সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। ফলে প্রশ্নটি নতুন নয়—এই নির্বাচনের কোলাহলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কি সত্যিই জনগণের শাসনের দিকে এক ধাপ এগোতে পারবে? এবারের নির্বাচন বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের অন্যতম দল, যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে এ নির্বাচন নিয়ে কর্মীদের কী বার্তা দেয়া হচ্ছে- তা স্পষ্ট নয়। যদিও নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করার আশংকাও উচ্চারিত হচ্ছে নানা মহল থেকে।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের স্বাধীন ও সচেতন মত প্রকাশের সুযোগ। নির্বাচন সেই সুযোগের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। কিন্তু যদি ভোটার মনে করেন, তাঁর ভোটের কোনো বাস্তব মূল্য নেই, অথবা ফল আগেই নির্ধারিত—তাহলে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। এ ধরনের নির্বাচন রাষ্ট্রের বৈধতা বাড়ানোর বদলে বরং আস্থার সংকট গভীর করে।
বর্তমান প্রচারণার চিত্রে একদিকে আছে ক্ষমতাসীনদের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার বার্তা; অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ—নির্বাচনী মাঠ সমতল নয়, রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত। এই দুই বয়ানের সংঘাতই এবারের নির্বাচনী বাস্তবতার মূল সুর। গণতন্ত্রের জন্য এই সংঘাত অস্বাভাবিক নয়; বরং সমস্যা তখনই, যখন সংঘাতের মীমাংসা ভোটারদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে প্রশাসনিক বা কাঠামোগত শক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বা আংশিক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সংসদ গঠন করতে পারলেও গণতান্ত্রিক ঐকমত্য তৈরি করতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর—বিরোধী রাজনীতি দুর্বল হয়, রাজনীতির বাইরে অসন্তোষ জমতে থাকে, এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ক্ষয় হয়। ফলে জনগণের শাসন শুধু ভোটের দিনেই নয়, ভোটের আগের পরিবেশ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক আচরণেও প্রতিফলিত হতে হয়।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থার প্রশ্ন। ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন কি না, ভোট গণনা ও ফল ঘোষণার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হবে, এবং সব পক্ষ ফলাফল মেনে নেবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নির্বাচনটি কতটা অর্থবহ। এখানে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিরপেক্ষতা কেবল সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়; এটি গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র। জনগণের শাসনের কথা বলা হলেও দলগুলোর ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা অংশগ্রহণমূলক—সে প্রশ্ন প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। মনোনয়ন বাণিজ্য, কেন্দ্রীয়করণ ও ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়েও একই সংস্কৃতি তৈরি করে। ফলে নির্বাচন যদি জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যম হতে হয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার করতে হবে।
তরুণ ভোটারদের ভূমিকা এবারের নির্বাচনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বড়, কিন্তু তাদের একটি অংশ রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা হতাশ। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা—এই বাস্তব প্রশ্নগুলো যদি নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে না আসে, তাহলে ভোটের প্রতি তরুণদের আগ্রহ আরও কমে যেতে পারে। জনগণের শাসন তখন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও এই প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবাধ তথ্যপ্রবাহ, সমালোচনার সুযোগ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো নির্বাচনই পূর্ণতা পায় না। প্রচারণা চলাকালে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। বরং সহনশীল বিতর্কই জনগণকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের নির্বাচন বাংলাদেশকে জনগণের শাসনের দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে—তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নয়। এর জন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ, নিরপেক্ষ প্রশাসন, গ্রহণযোগ্য প্রতিযোগিতা এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি। নির্বাচন যদি কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার বা দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে কোলাহল যতই হোক, গণতন্ত্র এগোবে না।
গণতন্ত্র কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এবারের নির্বাচন সেই প্রক্রিয়ায় অগ্রগতির চিহ্ন হবে, নাকি আরেকটি হারানো সুযোগ—তার উত্তর দেবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং সর্বোপরি জনগণের অংশগ্রহণ। জনগণের শাসন নিশ্চিত করতে হলে শেষ পর্যন্ত জনগণের কণ্ঠই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে হবে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন