https://www.prothomalony.com/
15984
opinion
বর্তমান আমেরিকায় অনেক অভিবাসীর ভেতরে এক ধরনের নীরব ভয় কাজ করছে। এটা এখন আর গোপন কোনো অনুভূতি নয়; বরং ক্রমেই একটি প্রকাশ্য বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। এই ভয় শুধু কাগজপত্র বা আইনি অবস্থান ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ছড়িয়ে পড়েছে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে—কথাবার্তা, মত প্রকাশ, এমনকি সামাজিক উপস্থিতিতেও।
আজ অনেক অভিবাসী কথা বলতে দ্বিধা করছে। সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি কমে যাচ্ছে। প্রকাশ্য সমাবেশ এড়িয়ে চলা হচ্ছে। সাংবাদিকতা, সাহিত্য কিংবা শিল্প—সবখানেই এক ধরনের আত্মসংযম, এক ধরনের অদৃশ্য সেন্সর কাজ করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুধু নতুন বা অনিশ্চিত অবস্থানে থাকা অভিবাসীরাই নয়। বহু বছর ধরে এই দেশে বসবাস করা মানুষ, এমনকি নিজ নিজ ক্ষেত্রে “লিজেন্ড” হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরাও আজ অনেক বেশি সতর্ক, অনেক বেশি চুপ।
এই ভয় কোথা থেকে আসছে—এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কেউ বলবেন রাজনৈতিক ভাষ্য আরও কঠোর হয়েছে। কেউ বলবেন অভিবাসন আইন ও তার প্রয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। কেউ আবার সমাজে বাড়তে থাকা বিভাজনের কথা তুলবেন। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না কোন কারণটি সবচেয়ে প্রভাবশালী। তবে এটুকু স্পষ্ট—এই ভয় বাস্তব।এটি ধীরে ধীরে সামাজিক আচরণে রূপ নিচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, এমন ভয় কি একটি সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর?
আমার উপলব্ধি অনুযায়ী—না। কোনো সমাজ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার মানুষ কথা বলতে পারে। প্রশ্ন তুলতে পারে, ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারে। ভয় যদি মানুষকে নীরব করে দেয়, তাহলে সেই নীরবতা শুধু অভিবাসীদের ক্ষতিই করে না; তা পুরো সমাজের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যকেই দুর্বল করে দেয়।
আমেরিকার ইতিহাস বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই দেশ গড়ে উঠেছে অভিবাসীদের কণ্ঠে। তাদের শ্রমে, তাদের স্বপ্নে। যদি আজ সেই কণ্ঠস্বরগুলো ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমেরিকা হারাবে নিজের আত্মার একটি অংশ।
ইতিহাসে এমন নীরবতার উদাহরণ নতুন নয়।
আমরা জানি ১৯৫০–এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র এক ভয়ংকর সময় পার করেছে। যা ইতিহাসে ম্যাকার্থিবাদ (McCarthyism) নামে পরিচিত। সেই সময় সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির নেতৃত্বে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে কমিউনিজমের অভিযোগই ছিল ভয় সৃষ্টির প্রধান অস্ত্র। সন্দেহই হয়ে উঠেছিল অপরাধের সমান।
এই সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল—ভয়ের সংস্কৃতি।
লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, হলিউডের অভিনেতা, সরকারি কর্মচারী—অনেকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে চাকরি হারিয়েছেন। সামাজিকভাবে একঘরে হয়েছেন, এমনকি আদালতে প্রমাণ ছাড়াই অভিযুক্ত হয়েছেন। বহু মানুষ কমিউনিস্ট ছিলেন না, তবুও “চুপ থাকাই নিরাপদ” ভেবে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মতপ্রকাশ তখন আর অধিকার ছিল না—তা হয়ে উঠেছিল ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
এই ভয় শুধু অভিযুক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যারা নির্দোষ ছিলেন, তারাও কথা বলেননি—কারণ তারা জানতেন, আজ অন্যের পালা, কাল হয়তো নিজের।
এর ফলাফল ছিল গভীর ও ক্ষতিকর।
আমেরিকার মতো একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সাময়িকভাবে স্বাধীন মতপ্রকাশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সৃজনশীলতা, সাংবাদিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে মার্কিন সমাজ ও আদালত স্বীকার করেছে—এই সময়টি ছিল স্বাধীনতার জন্য একটি অস্বাস্থ্যকর অধ্যায়।
এই ইতিহাস আজ আমাদের কেন ভাবায়?
কারণ ইতিহাস বলে —
যখন কোনো সমাজে ভয় মানুষকে চুপ করিয়ে দেয়,
যখন মানুষ মনে করে “নীরব থাকাই বাঁচার একমাত্র উপায়”।
তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে নিজের নৈতিক শক্তি হারাতে শুরু করে।
আজকের অভিবাসী সমাজের নীরবতার সঙ্গে ম্যাকার্থিবাদের সময়কার সেই চুপ করে থাকার মানসিকতার পুরোপুরি মিল নেই—তবু সতর্কবার্তা হিসেবে এই তুলনাই যথেষ্ট।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো ভয়ের স্বাভাবিকীকরণ। যখন ভয়কে “নতুন নরমাল” হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তখন আর প্রতিবাদ থাকে না, প্রশ্ন থাকে না, ন্যায়বোধও ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। ইতিহাস বলে—এমন নীরবতা কখনোই ভালো কিছু ডেকে আনে না।
হয়তো এখনই সময় আবার কথা বলার। নিখুঁত ভাষায় না হোক, সাহসী কণ্ঠে। কারণ ভয় যদি কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়। তাহলে স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত শুধু একটি শব্দে পরিণত হয়—বাস্তবে নয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন