https://www.prothomalony.com/
15788
literature
ইমতিয়াজ মাহমুদ
খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড চট্টগ্রাম
নববর্ষ বা নতুন বছর বারো মাস পরপরই ফিরে আসে। এটি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত এক স্বাভাবিক নিয়ম। কোরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সৃষ্টির শুরু থেকেই মাসের সংখ্যা নির্ধারিত, এতে মানুষের খেয়ালখুশির কোনো সুযোগ নেই। সময় আসে, সময় যায় কিন্তু প্রতিটি সময় আমাদের জন্য হিসাবের খাতা খুলে দেয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমরা সাধারণত তিন ধরনের নববর্ষের মুখোমুখি হই। বাঙালি জাতি হিসেবে বাংলা নববর্ষ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। হিজরি সনের সূচনায় আসে আরবি নববর্ষ। আর সবচেয়ে বেশি আয়োজন, গুরুত্ব ও উত্তেজনা দেখা যায় ইংরেজি নববর্ষ ঘিরে।
ইংরেজি নববর্ষের ইতিহাস খুবই প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার প্রথম এই নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি চালু করেন। প্রাচীন সমাজে নববর্ষ মানে ছিল আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ পুরোনো বছরের ভুল ও মন্দ অভ্যাস ঝেড়ে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরু করার অঙ্গীকার। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন সভ্যতায় নববর্ষ পালনের তারিখ ও ধরন ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
ইরানে নববর্ষ শুরু হয় পুরোনো বছরের শেষ বুধবার থেকে এবং তা চলে নতুন বছরের ত্রয়োদশ দিন পর্যন্ত। প্রাচীন পারস্যের সম্রাট জমশিদের সময় থেকেই এই প্রথার প্রচলন দেখা যায়। মেসোপটেমিয়ায় নববর্ষ নির্ধারিত হতো নতুন চাঁদের সঙ্গে। ব্যাবিলনে মহাবিষুবের দিন, অর্থাৎ ২০ মার্চ ছিল নববর্ষের সূচনা। অ্যাসিরিয়ায় পালিত হতো ২১ সেপ্টেম্বর। মিসর, ফিনিসিয়া ও পারস্যেও এই তারিখেই নতুন বছর শুরু হতো। গ্রিকরা দীর্ঘ সময় ২১ ডিসেম্বরকে নববর্ষ হিসেবে মানত। রোমান প্রজাতন্ত্রে একসময় নববর্ষ শুরু হতো ১ মার্চ থেকে, পরে তা পরিবর্তিত হয়ে ১ জানুয়ারিতে স্থির হয়। মধ্যযুগে ইউরোপের অনেক দেশে নববর্ষ পালিত হতো ২৫ মার্চ।
শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টান ধর্মগুরু পোপ গ্রেগরির নামে প্রবর্তিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৫৮২ সালে ১ জানুয়ারিকে স্থায়ীভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ধীরে ধীরে ইউরোপসহ বিশ্বের বহু দেশে এই ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে নববর্ষ উদ্যাপন শুরু হয়।
তবে একজন মুমিনের কাছে নববর্ষ কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়ার নাম নয়। নববর্ষ মানে গত একটি বছরের দিকে ফিরে তাকানো এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া। একজন সচেতন মুমিন নিজেকে প্রশ্ন করবে এই বছরে আমার ইমান, আমল ও চরিত্র কতটা বদলেছে? দুনিয়াবি জীবনে আমি কী অর্জন করেছি, কী হারিয়েছি? আমার ভুলগুলো কী ছিল, আর কোথায় আমি উন্নতি করতে পেরেছি?
মুমিন নতুন বছরকে বরণ করে নেয় আনন্দ-উল্লাস দিয়ে নয়; বরং আত্মসমালোচনা, ইস্তিগফার ও গভীর ইবাদতের মাধ্যমে। নতুন বছর তার কাছে হয় আত্মশুদ্ধির নতুন অধ্যায়। সে আল্লাহর কাছে দোয়া করে আগত বছর যেন আগের বছরের মতো অবহেলায় না কাটে, বরং প্রতিটি সময় ও প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয়।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য প্রতিটি দিনই নতুন সুযোগ। প্রতিদিন নিজের আমলের হিসাব নেওয়া, ভুল সংশোধন করা এবং নতুন উদ্যমে ভালো কাজ শুরু করাই তার পরিচয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নববর্ষ কোনো নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং প্রতিটি দিনই হয়ে ওঠে আত্মসংস্কারের নতুন সূচনা।
করোনার মতো দুর্যোগ আমাদের জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিলেও সময় বা যুগকে দোষারোপ করা সঠিক নয়। সময় নিজে কখনো অকল্যাণকর নয়। মানুষের কাজই নির্ধারণ করে কল্যাণ ও অকল্যাণের পরিণতি। তাই সময়কে গালি না দিয়ে আমাদের উচিত নিজেদের কর্মের দিকে তাকানো।
নতুন বছর আসা মানে আমাদের নির্ধারিত জীবনকাল থেকে আরেকটি বছর কমে যাওয়া। জীবন থেকে একটি বছর চলে যাওয়া মানে মৃত্যুর আরও এক ধাপ কাছে পৌঁছে যাওয়া। এ বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় নতুন বছর হওয়া উচিত মৃত্যুস্মরণ ও পরকালের প্রস্তুতি আরও জোরদার করার সময়।
নতুন বছরের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো নিজের জীবনের হিসাব গুছিয়ে নেওয়া। নিজের ভুল স্বীকার করা, অবহেলা চিহ্নিত করা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া। ইতিহাসের মহান ব্যক্তিরা আমাদের শিখিয়েছেন আল্লাহর সামনে হিসাব দেওয়ার আগে যদি আমরা নিজেরাই নিজেদের হিসাব করে নিই, তাহলে জীবন সংশোধন সহজ হয়ে যায়।
নববর্ষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো বিজাতীয় সংস্কৃতি পরিহার করা। পশ্চিমা রীতিনীতি অনুসরণ করে নতুন বছরকে উদ্যাপন করা বা পুরোনো বছরকে বিদায় জানানো ইসলামের ইবাদত ও জীবনদর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিশেষ করে থার্টি ফার্স্ট নাইটের মতো আচার-অনুষ্ঠান মুসলমানদের চিন্তা ও চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অশ্লীলতা, অনর্থক আনন্দ আর বেহুদা কাজে সময় নষ্ট না করে বিগত বছরের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে আগামীর জন্য পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও আল্লাহমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করাই একজন বুদ্ধিমান মুমিনের প্রকৃত কাজ।
.....
কোরআন পাঠ: মুমিনদের আত্মার খোরাক
মেহেদী হাসান
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম
মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের অস্তিত্ব নয়; তার ভেতরে রয়েছে এক গভীর আত্মিক সত্তা। দেহ যেমন খাদ্য ছাড়া দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি আত্মাও আল্লাহর স্মরণ ও পথনির্দেশনা ছাড়া ক্লান্ত, অস্থির ও দিশাহীন হয়ে যায়। সেই আত্মার জন্য আল্লাহ তায়ালা যে শ্রেষ্ঠ খোরাক অবতীর্ণ করেছেন, তা হলো পবিত্র কোরআন—মানবতার জন্য চিরন্তন বার্তা ও জীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা।
আল্লাহ তায়ালা কোরআনের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,“হে মানুষ! তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে উপদেশ, অন্তরের রোগের আরোগ্য, মুমিনদের জন্য পথনির্দেশনা ও রহমত।” (সূরা ইউনুস: ৫৭)
এই আয়াত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় কোরআন কেবল পাঠের জন্য নয়; এটি অন্তরের ব্যাধি সারানোর ও আত্মাকে জাগ্রত করার এক ঐশী ব্যবস্থা। আধুনিক সভ্যতা মানুষকে আরাম দিয়েছে, কিন্তু শান্তি দিতে পারেনি। তথ্যের প্রাচুর্যের মাঝেও মানুষ আজ আত্মিক দারিদ্র্যে ভুগছে। কোরআন সেই শূন্যতার নির্ভরযোগ্য প্রতিষেধক।
কোরআন মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ ঘোষণা করেন,“নিশ্চয়ই এই কোরআন পথ দেখায় সর্বাধিক সঠিক পথে।” (সূরা আল-ইসরা: ৯)
এই পথ কেবল ইবাদতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নৈতিকতা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক আচরণ সব ক্ষেত্রেই কোরআন মানুষের বিবেককে সঠিক দিশা দেয়। কোরআন মানুষকে অহংকার থেকে বিনয় শেখায়, প্রতিশোধের বদলে ক্ষমার শিক্ষা দেয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
রাসূলুল্লাহ সাঃ কোরআনের সঙ্গে মুমিনের সম্পর্ককে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,“তোমাদের মধ্যে উত্তম সে ব্যক্তি, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।” (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস প্রমাণ করে, কোরআন পাঠ কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি সমাজ গঠনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। কোরআনের আলোয় আলোকিত মানুষই পারে আলোকিত সমাজ গড়তে।
কোরআনের অন্যতম বড় অনুগ্রহ হলো—অন্তরের প্রশান্তি। আল্লাহ তায়ালা বলেন,“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রা‘দ: ২৮)
আজ যখন হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী বেড়ে চলেছে, তখন কোরআনের এই ঘোষণা মানবতার জন্য এক গভীর আশার বার্তা। কোরআন মানুষকে শেখায়—কষ্ট স্থায়ী নয়, আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না, আর প্রতিটি সংকটের পরেই রয়েছে স্বস্তির প্রতিশ্রুতি।
তবে কোরআন পাঠের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল তিলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। কোরআন নিজেই মানুষকে চিন্তা ও অনুধাবনের দিকে আহ্বান জানায়“তবে কি তারা কোরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?” (সূরা মুহাম্মদ: ২৪)
যে ব্যক্তি কোরআনকে হৃদয়ে স্থান দেয় এবং জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, সে কখনো সম্পূর্ণভাবে পথহারা হয় না। আর যে সমাজ কোরআনকে কেবল আনুষ্ঠানিক পাঠে সীমাবদ্ধ রাখে, সে সমাজ আত্মিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ শান্তির সন্ধানে মানুষ নানা দর্শন ও মতবাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। অথচ প্রকৃত শান্তির উৎস একটাই আল্লাহর বাণী। কোরআন মানুষের হৃদয়ে সেই প্রশান্তির ঝর্ণাধারা বইয়ে দেয়, যা কখনো নিঃশেষ হয় না।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, কোরআন মুমিনদের আত্মার খোরাক, জীবনের আলো ও মানবতার চিরন্তন দিশারি। এই কোরআনের দিকেই ফিরে আসা আজকের অস্থির পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
..........
মোবাইল: প্রয়োজনের উপকরণ, নাকি আত্মবিনাশের কারণ?
আব্দুল্লাহ আল মামুন ফুয়াদ
মুদাররিস,জামিআ রশিদিয়া আরাবিয়া, গাজীপুর।
মোবাইল ফোন আজ আমাদের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। দৈনন্দিন কাজকর্ম, যোগাযোগ, শিক্ষা, দাওয়াহ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজন। বলা যায়, বর্তমান সময়ে মোবাইল ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যায় না। তবে এই প্রয়োজনীয় জিনিসটাই সঠিক ব্যবহারে কল্যাণের কারণ হতে পারে, আবার ভুল ব্যবহারে জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।
এই বিষয়ে মূলত দুটি কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার—
এক. মোবাইলের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত
দুই. মোবাইলে কথা বলার শিষ্টাচার বা আদব
প্রথমেই মোবাইলের ব্যবহার প্রসঙ্গে আসা যাক।
মোবাইল মূলত দ্বি-ধারী তলোয়ারের মতো। সঠিক ও সচেতন ব্যবহারে এটি মানুষের জীবনকে সুন্দর, গুছানো ও অর্থবহ করে তুলতে পারে। আবার লাগামহীন ও দায়িত্বহীন ব্যবহারে একই মোবাইল দ্বীন-দুনিয়া উভয়টাই নষ্ট করে দিতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন ভালো ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করতে এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা না করতে। একই সঙ্গে তিনি আমাদের সতর্ক করেছেন, যেন আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দিই। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, কোনো ভালো কাজের পথ দেখিয়ে দিলে সেই পথ অনুসরণকারীর সমান সওয়াব পাওয়া যায়।
মোবাইল হাতে থাকা মানে যেন পুরো দুনিয়াই হাতের মুঠোয়। এর মাধ্যমে আমরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারি, দ্বীনি বয়ান ও নসিহত শুনতে পারি, নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারি এবং দূর-দূরান্তের মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারি। এই দিকগুলো নিঃসন্দেহে মোবাইলের বড় নেয়ামত।
কিন্তু একই সঙ্গে কেউ চাইলে মোবাইলকে ব্যবহার করে অশ্লীলতা, অহেতুক বিনোদন, গীবত, সময় নষ্ট এবং নানা গুনাহে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। ফলে দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দুনিয়ার জীবনেও অস্থিরতা নেমে আসে।
তাই আমাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো মোবাইল যেন আমাকে নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং আমি যেন মোবাইলকে নিয়ন্ত্রণ করি। এর একটি সহজ আলামত হলো: অকারণে ফোন হাতে নেওয়া, উদ্দেশ্যহীন স্ক্রল করা, প্রয়োজন ছাড়া ইন্টারনেটে ঘোরাঘুরি করা। এগুলো যদি অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা শুরু হয়ে গেছে।
সমাধান হিসেবে আমরা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় মোবাইল ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করতে পারি। এতে করে অনেক অনর্থক কাজ থেকে সহজেই বেঁচে থাকা সম্ভব, ইনশা আল্লাহ।
এবার আসি দ্বিতীয় বিষয়ে মোবাইলে কথা বলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব।
শরিয়ত মানুষের জীবনের প্রতিটি দিককে সুন্দর ও শৃঙ্খলিত করার নির্দেশনা দিয়েছে। সাধারণ কথাবার্তা, সাক্ষাৎ এমনকি ফোনে কথা বলার ক্ষেত্রেও ইসলামের চমৎকার দিকনির্দেশনা রয়েছে।
প্রথমত, ফোনে কথা শুরু করা উচিত সালাম দিয়ে। সালাম ছাড়া কথা শুরু করাকে রাসূল ﷺ অপছন্দ করেছেন। আগে সালাম দেওয়া অহংকারমুক্ত থাকার আলামত এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হওয়ার মাধ্যম।
দ্বিতীয়ত, হাসিমুখে কথা বলা। এটাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। রাসূল ﷺ বলেছেন, হাসিমুখে কথা বলাও একটি নেক কাজ। শুধু ইবাদতের দিক থেকেই নয়, বাস্তব জীবনেও এর অসংখ্য উপকার আছে। হাসিমুখে কথা বললে মানুষের মন জয় করা সহজ হয়, সম্পর্কে সৌহার্দ্য তৈরি হয় এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তৃতীয়ত, ফোনে নিজের পরিচয় স্পষ্টভাবে দেওয়া। অনেকেই ফোন করে পরিচয় দেন না, আবার নাম্বার সেভ থাকলেও দীর্ঘদিন পর কণ্ঠস্বর চিনতে সমস্যা হয়। এতে অপর ব্যক্তি বিব্রত হয়। হাদিসে এসেছে, রাসূল ﷺ “আমি” বলে পরিচয় দেওয়া পছন্দ করেননি। তাই নাম ও পরিচয় পরিষ্কারভাবে বলা শিষ্টাচারের অংশ।
চতুর্থত, নিজের প্রয়োজন পরিষ্কারভাবে বলা। অযথা এদিক-ওদিক কথা বলে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম দিক হলো অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা।
পঞ্চমত, যদি দীর্ঘ কথা বলার প্রয়োজন হয়, তাহলে আগে সময় চেয়ে নেওয়া বা জিজ্ঞেস করা—এখন কথা বলা যাবে কি না। কোরআনে এমন আচরণকেই ভদ্র ও উত্তম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ষষ্ঠত, কাউকে একবার ফোন দিলে রিসিভ না হলে সঙ্গে সঙ্গে বারবার ফোন করা ঠিক নয়। বড়জোর দুই বা তিনবার চেষ্টা করা যেতে পারে। এরপর একটি সংক্ষিপ্ত মেসেজ রেখে দেওয়া উত্তম, যাতে তিনি সুযোগমতো সাড়া দিতে পারেন। বারবার ফোন দিয়ে বিরক্ত করা কোনোভাবেই শোভন নয়। কারণ প্রকৃত মুসলমান সে-ই, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।
আমাদের মনে রাখা উচিত কারো সময় ব্যয় করে ফোন ধরা বা কথা বলা কারো ওপর বাধ্যতামূলক নয়। এই বাস্তবতা বুঝে শালীন ও সংযত আচরণ করাই ইসলামের শিক্ষা।
এই পর্যন্তই। আল্লাহ তাআলা যেন আমরা যা জানলাম, তা আমলে রূপ দেওয়ার তাওফিক দান করেন আমিন।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন