https://www.prothomalony.com/
15779
opinion
প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৭:১৭
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে গত ১২ ডিসেম্বর দিনে-দুপুরে মাথায় গুলি করে ঘাতক ফয়সাল করিম মাসুদ। টানা ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১৮ ডিসেম্বর মাত্র ৩২ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু হাদিকে কি কেবল ফয়সালের একটি গুলিই হত্যা করেছে? নাকি তাকে হত্যা করেছে এই রাষ্ট্রের ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরেরা? ফয়সাল করিমের মতো এক ছাত্রলীগ নেতার অ্যাকাউন্টে ১২৭ কোটি টাকার হদিস মেলা এবং তাকে যুবলীগ নেতাদের মাধ্যমে সীমান্ত পার করে দেওয়া প্রমাণ করে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করছে এক বিশাল অপরাধী সিন্ডিকেট।
ওসমান হাদি ছিলেন সাহসের এক মূর্ত প্রতীক। হাদি ছিলেন ’২৪–এর জুলাই বিপ্লবের এক নির্ভীক ‘ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা’। বিপ্লব–পরবর্তী বাংলাদেশে তিনি ছিলেন নতুন প্রজন্মের সাহসের প্রতীক। তার নেতৃত্ব ছিল গতানুগতিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে। অত্যন্ত গোছানো এবং যৌক্তিক ভাষায় তিনি যখন টক শো বা রাজপথের সমাবেশে কথা বলতেন, তখন তা হয়ে উঠত বজ্রকণ্ঠ। ওসমান হাদি সরাসরি নীতিনির্ধারকদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সাহস রাখতেন। তিনি কেবল নির্দিষ্ট কোনো দলের হয়ে কথা বলতেন না। বরং বিভিন্ন মত ও পথের মানুষকে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ফ্যাসিবাদের পতন হলেও তার প্রেতাত্মারা এখনো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। হাদি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত—বিশেষ করে শেখ হাসিনা গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশটির বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে তিনি সরব ছিলেন।
জুলাই বিপ্লবের পর যখন অনেকেই ক্ষমতার মোহে অন্ধ, হাদি তখন ছিলেন ‘বিপ্লব রক্ষার’ পাহারাদার। ভারতীয় আধিপত্যবাদ, সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তার বজ্রকণ্ঠ একশ্রেণির মাফিয়া ও তাদের বিদেশি প্রভুদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ কারণেই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নম্বর থেকে তাকে ও তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হতো। রাষ্ট্র এই ঝুঁকির কথা জানত, কিন্তু কোনো কার্যকর সুরক্ষা দেয়নি। যেন রাষ্ট্র অপেক্ষা করছিল, কবে রক্ত ঝরবে।
সারা দেশজুড়ে যখন ওসমান হাদিকে নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় বইছে, তখন ১৮ ডিসেম্বর ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাসকে নির্মমভাবে প্রহার করে গাছে ঝুলিয়ে দগ্ধ করে হত্যা করা হয়। আমার মতো সাধারণ মানুষ যেমন হাদি হত্যার বিচার চায়, তেমনি দীপু দাসের ওপর হওয়া নৃশংস হত্যার তীব্র নিন্দা ও বিচারের দাবিও জানায়। কিন্তু এখানে একশ্রেণির মানুষের নির্বাচিত সংবেদনশীলতা আমাকে হতবাক করেছে। দেশের একশ্রেণির মানুষ, যারা হাদি হত্যায় খুশি হয়েছিলেন, তারা তখন দীপু দাসের প্রতিবাদকে পুঁজি করে একে ‘সাম্প্রদায়িক কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করে ওসমান হাদি হত্যার বিচার ও বিপ্লবের স্পিরিটকে কালিমালিপ্ত করার এক ঘৃণ্য খেলায় মেতে ওঠেন। তারা দীপু দাসের মৃত্যুকে যতটা না মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন, তার চেয়ে যেন বেশি ব্যবহার করছেন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে।
তাদের এই দ্বিচারিতার আরেকটি বড় প্রমাণ মেলে ১৯ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুরে; এদিন দরজায় তালা লাগিয়ে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের ঘরে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় তার ৮ বছরের শিশু আয়েশা আক্তারের, পরে ২৪ ডিসেম্বর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় কলেজপড়ুয়া মেয়ে সালমা আক্তার ওরফে স্মৃতির (১৭)। কিন্তু তথাকথিত ‘এলিট’ বা মানবিকতার ফেরিওয়ালাদের মুখে লক্ষ্মীপুরের শিশুদের জন্য কোনো রা-শব্দ নেই; যেন রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে শিশুদের পুড়ে মরাটাও তাদের কাছে কোনো শোকের বিষয় নয়। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আদর্শিক অবস্থান বা রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে বিচার করে যে—কার মৃত্যুতে তারা কাঁদবেন আর কার মৃত্যুতে চুপ থাকবেন, তখন তাকেই নির্বাচিত সংবেদনশীলতা বলা হয়। একজনের মৃত্যুতে প্রতিবাদ করা আর অন্যজনের (যেহেতু সে প্রতিপক্ষ বা ভিন্ন আদর্শের) মৃত্যুতে নীরব থাকা চরম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়।
ওসমান হাদি হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ফয়সালের বাবা-মা, স্ত্রী, বান্ধবী এবং মোটরসাইকেলের মালিকসহ মোট ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু হাদির মৃত্যুর আজ ৮ দিন এবং হামলার ১৪ দিন পার হলেও মূল আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখ এখনো পলাতক রয়েছেন।
ওসমান হাদির ঘাতক ফয়সাল করিম মাসুদ কেবল একজন অপরাধী নন, তিনি একটি বিশাল রাজনৈতিক ও আর্থিক সিন্ডিকেটের অংশ। প্রথম আলো খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে, ফয়সাল করিম কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৯ সালের ১১ মে ঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তিনি সদস্য হয়েছিলেন। তার পুরো নাম ফয়সাল করিম দাউদ খান। তাকে সাবেক ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তার অন্যতম ‘শুটার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিআইডির তদন্তে ফয়সালের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকারও বেশি লেনদেনের হদিস পাওয়া গেছে। ফয়সালের অ্যাকাউন্টে এত বিশাল অর্থ কোথা থেকে এলো? কেন এলো?
বলা হচ্ছে, এই দুই আসামি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়েছে। কিন্তু ফয়সাল করিম মাসুদের শেষ অবস্থান কোথায়, সে বিষয়ে কোনো তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নেই। ২১ ডিসেম্বর পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, “ফয়সাল করিম বাংলাদেশের সীমান্ত পার হয়ে গেছেন কি না, নাকি দেশে আছেন, এ বিষয়েও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।”
অন্যদিকে, ২৫ ডিসেম্বর দৈনিক প্রথম আলো ও দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাদি হত্যা মামলার আসামি শুটার ফয়সাল ও আলমগীর শেখকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর জন্য অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা করেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক মিরপুর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী (বাপ্পী)। তাইজুলের সহযোগী ছিলেন তার ভগ্নিপতি আমিনুল ইসলাম। আবার হাদি হত্যার পেছনে কিলিং মিশন বাস্তবায়নে অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ ওরফে শাহীন চেয়ারম্যান; যিনি মাফিয়া ডন হিসেবেই বেশি পরিচিত। এ ছাড়া চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে শাহীন চেয়ারম্যানের সহযোগী হিসেবে আরও কিছু নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতার যোগ আছে বলে জানতে পেরেছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
এটি এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, ওসমান হাদি কোনো সাধারণ অপরাধের শিকার নন। বরং তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী মাফিয়া গোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ধাপে আওয়ামী রাজনীতির সেই চিরচেনা ‘কিলিং স্কোয়াড’ সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। অথচ হত্যাকাণ্ডের এত দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে খুনিদের অবস্থান নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এর মানে হয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চরম অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে, অথবা তারা জেনেও তথ্য গোপন করছে। যখন গণমাধ্যম দালালের নাম ও রুটের তথ্য পায়, তখন প্রশাসনের তা না পাওয়াটা ইচ্ছাকৃত অন্ধত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। প্রশাসন নির্বাচন আয়োজন আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যস্ত।
তবে একজন হাদির হত্যাকারীদের খুঁজে পেতে নির্বাচনী ব্যস্ততা কি অজুহাত হতে পারে? প্রশাসন কি তবে খুনিদের ধরার চেয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতেই বেশি আগ্রহী? স্বৈরাচার শাসকগোষ্ঠীর যে অংশটি এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে আছে, তারা চাচ্ছে ওসমান হাদির মতো বিপ্লবী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতে এবং খুনিদের রক্ষা করতে। যেহেতু আসামিরা ভারতে পালিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে, তাই এখানে দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয়টিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিপ্লব–পরবর্তী বাংলাদেশে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের বহু নেতাকর্মী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ভারত সরকার জুলাই বিপ্লবে গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে যেভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে, তা অপরাধীদের এই বার্তা দিচ্ছে যে—বাংলাদেশে খুন-অপরাধ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া নিরাপদ। দুই দেশের মধ্যে যখন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের জোরালো চুক্তি রয়েছে, তখন হাদির খুনিরা কীভাবে ৬–৭ ঘণ্টার মধ্যে কোনো বাধা ছাড়াই সীমান্ত পার হলো? ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে হাদি ভারতীয় প্রভাবের বিরুদ্ধে যে জনমত গড়ে তুলেছিলেন, তা ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। ভারত প্রায়ই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে; সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে কাঁপুনি ধরায়, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের খুনিদের—বিশেষ করে ওসমান হাদির মতো একজন উদীয়মান নেতার ঘাতকদের—যখন নিজেদের মাটিতে নিরাপত্তা দেয়, তখন বলতেই হয়, ভারতের এই ‘মানবিকতা’র বুলি স্রেফ একটি ভূরাজনৈতিক ভণ্ডামি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র।
এই যে বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র এবং সীমান্ত পারাপারের সহজলভ্যতা, তা কি আমাদের দেশের প্রশাসনের অজানা? নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, যখন বাইরের শত্রু আমাদের সার্বভৌমত্বের টুঁটি চেপে ধরতে চায়, তখন আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রহস্যজনকভাবে ‘ঠুঁটো মূর্তি’ হয়ে বসে থাকে। গত ১৪ নভেম্বর ফেসবুক পোস্টে হাদি দেশি-বিদেশি ও ভারতের ৩০টি নম্বর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি এবং তাকে হত্যা, বাড়িতে আগুন দেওয়া, তাঁর মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, এসব হুমকিদাতাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা থাকতে পারে। ওসমান হাদি বারবার প্রাণনাশের হুমকির কথা রাষ্ট্রকে জানালেও কেন তাকে ন্যূনতম নিরাপত্তা দেওয়া হলো না? কেন রাজধানী ঢাকার বুকে দিনের আলোতে গুলি করার পর খুনিরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেল? এটি কি কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাকি প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মাদের সুপরিকল্পিত কোনো ‘সেফ প্যাসেজ’?
বিচারের এই মন্থরতা এবং নিরাপত্তার এই অবহেলা আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি বড় বৈষম্যকে নগ্ন করে দেয়। বিশেষ করে যখন আমরা দেখি—নির্বাচনের আগে বেসামরিক রাজনীতিবিদ ও গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে আমরা বিএনপি নেতা তারেক রহমানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় যে সতর্কতামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখছি, তা গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতার জন্য অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—এই নিরাপত্তা বেষ্টনী কি কেবল প্রতিষ্ঠিত বড় নেতাদের জন্যই সংরক্ষিত? তবে কি হাদির মৃত্যু প্রমাণ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আজও ‘সিলেকটিভ’ বা বিশেষ শ্রেণিনির্ভর?
বলতে পারেন, তারেক আর হাদি কি এক? ব্যক্তিগত পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থানে ভিন্নতা থাকলেও, একটি জায়গায় তাঁরা অভিন্ন: উভয়কেই জনগণ নেতা বানিয়েছে। তারেক রহমান যেখানে কোটি মানুষের রাজনৈতিক আস্থার প্রতীক, ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই বিপ্লব–পরবর্তী তারুণ্যের অকুতোভয় কণ্ঠস্বর। জনগণের ম্যান্ডেট ও সাহসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নেতৃত্বই গণতন্ত্রের প্রাণ। তাই হাদির মতো উদীয়মান নেতাকে নিরাপত্তা দিতে না পারা রাষ্ট্রের এক চরম বৈষম্যমূলক ব্যর্থতা।
একদিকে তারেক রহমানের মতো নেতাদের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ তৎপরতা, অন্যদিকে হাদির মতো বিপ্লবের পাহারাদারকে অরক্ষিত রেখে ঘাতকের হাতে তুলে দেওয়া—এই বৈষম্যই আজ বর্তমান সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। শরীফ ওসমান হাদি কেবল একটি গুলির আঘাতে নিহত হননি; তাকে হত্যা করেছে এই রাষ্ট্রের ভঙ্গুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরেরা।
হত্যার পর থেকে “তদন্ত চলছে” বা “চেষ্টা করছি”; এই চেনা বুলির আড়ালে খুনিদের পালানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে কিংবা দেওয়া হচ্ছে। যখন খুনিরা সীমান্ত পার হয়ে যায়, তখন প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তাকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বলা যায় না, একে ‘সহযোগিতা’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
রাষ্ট্রীয় শোক বা পতাকা অর্ধনমিত রাখা কোনো সমাধান নয়। খুনিকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বিচার নিশ্চিত করাই হলো রাষ্ট্রের আসল কাজ। প্রতীকী শোক দিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা নাগরিকের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। মূল প্রশ্ন—হাদি খুনের আগে রাষ্ট্র অন্ধ ছিল, ঠিক আছে। কিন্তু খুনের পর কেন এত মন্থর? ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড একটি দর্পণ, যা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে।
ওসমান হাদি ছিলেন সেই তরুণ, যিনি চোখে চোখ রেখে সত্য বলতে জানতেন। তাকে হত্যার মাধ্যমে একটি কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হলেও, তিনি এখন একটি ‘আইডিয়া’ বা ‘মতাদর্শে’ পরিণত হয়েছেন। তার মৃত্যু প্রমাণ করেছে যে, এই দেশে সত্য কথা বলার মূল্য আজও রক্ত দিয়ে শোধ করতে হয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন