https://www.prothomalony.com/
15758
opinion
২০২৬ : সময়ের দরজায় নতুন বছরের কড়া নাড়া
আরেকটি বছর আমাদের পেছনে ফেলে গেল—নীরবে, অথচ অগণিত গল্প, ক্ষত, আশা ও প্রশ্ন রেখে। সময় কখনো দাঁড়ায় না; সে শুধু এগিয়ে যায়, আমাদের অপেক্ষা না করেই। ২০২৫ শেষ হয়ে ২০২৬ এসেছে ঠিকই, কিন্তু পৃথিবীর অনেক ক্ষত এখনো শুকায়নি, অনেক স্বপ্ন এখনও অসমাপ্ত। তবু মানুষ থেমে থাকে না। নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে আমরা আবারও ভবিষ্যতের দিকে তাকাই—আশা, সংশয় ও প্রত্যাশা একসঙ্গে নিয়ে।
ইতিহাস বলে, প্রতিটি বছরই নতুন ঘটনা নিয়ে আসে। জন্ম হয় নতুন প্রাণের, বিদায় নেয় বহু জীবন। কোনো বছর আনন্দে ভরে ওঠে, কোনো বছর বিষাদে ভারী হয়ে যায়। ২০২৬-ও তার ব্যতিক্রম হবে না। এই বছরে যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে, তেমনি কিছু অশুভ বাস্তবতাও সামনে আসতে পারে। তবু বছরের প্রথম দিনে মানুষ শুভকেই দেখতে চায়—কারণ আশা ছাড়া মানুষ এগোতে পারে না।
রাজনৈতিক দিক থেকে বিশ্ব এখন এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার—এসব মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে নানা দেশে। কোথাও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বাড়ছে, কোথাও জনতার প্রতিবাদ রাজপথে নেমে আসছে। ২০২৬ সালেও এই টানাপোড়েন অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। নির্বাচন হবে, সরকার বদলাবে, নীতি পরিবর্তিত হবে। কিন্তু বড় প্রশ্ন থেকে যাবে—এই পরিবর্তনগুলো কি মানুষের জীবনকে সত্যিকার অর্থে সহজ করবে?
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ২০২৬ গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ের প্রতীক। রাজনৈতিক মেরুকরণ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক এবং ভবিষ্যৎ পথরেখা—সবকিছুই নতুন বছরে নতুন মাত্রা পেতে পারে। ক্ষমতা ও বিরোধের দ্বন্দ্বে যেন সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন না হয়, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রধান দায়। নতুন বছর সেই দায় স্মরণ করিয়ে দেয়—শুধু শাসন নয়, সেবা দেওয়াই রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য।
বিশ্ব রাজনীতির বাইরে, মানবসভ্যতা আজ আরও বড় সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট—এসব সমস্যার কোনোটিই একটি বছরের মধ্যে তৈরি হয়নি, আবার একটি বছরেই শেষও হবে না। কিন্তু প্রতিটি নতুন বছর আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে—আমরা কি আগের মতোই উদাসীন থাকব, নাকি দায়িত্বশীল আচরণ শিখব? ২০২৬ সালে প্রকৃতি আমাদের প্রতি আরও কঠিন বার্তা দিতে পারে, যদি আমরা এখনো তাকে উপেক্ষা করি।
নতুন বছর মানেই কেবল বড় বড় বৈশ্বিক বিষয় নয়; এটি ব্যক্তিগত জীবনের হিসাব-নিকাশের সময়ও। একটি বছরে আমরা কতজন প্রিয় মানুষকে হারিয়েছি, কতজন নতুন মানুষ আমাদের জীবনে এসেছে—সেই হিসাবও নতুন বছরের প্রথম দিনে মানুষ করে। জন্ম ও মৃত্যু পাশাপাশি চলতে থাকে—একটি পৃথিবীতে আসার সংবাদ, আরেকটি পৃথিবী ছাড়ার। এই চক্রই জীবন। ২০২৬ সালে যেমন নতুন শিশু জন্ম নেবে, তেমনি কিছু মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। সময় আমাদের শেখায়—জীবন ক্ষণস্থায়ী, তাই তাকে গুরুত্ব দিতে হয়।
প্রবাসী জীবনের বাস্তবতায় নতুন বছর আরও ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে আসে। ঘড়ির কাঁটা বদলায়, ক্যালেন্ডার বদলায়, কিন্তু মন পড়ে থাকে ফেলে আসা দেশে, মানুষে, স্মৃতিতে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রবাসীদের কাছে ২০২৬ মানে শুধু নতুন তারিখ নয়; এটি নতুন সংগ্রাম, নতুন স্বপ্ন আর পুরনো শেকড়ের টান। নতুন বছরে তাঁদের প্রত্যাশা—নিজের জীবনে স্থিতি, পরিবারের নিরাপত্তা এবং দেশের জন্য কিছু করার সুযোগ।
তবে নতুন বছর আমাদের শুধু আশা দেখায় না, আয়নাও ধরে। আমরা কী করেছি, কী করতে পারিনি—সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সমাজ হিসেবে আমরা কতটা মানবিক হতে পেরেছি? কতটা সহনশীল? মতের অমিলে আমরা কি শত্রুতা বেছে নিয়েছি, নাকি সংলাপ? ২০২৬ সাল আমাদের সামনে সেই প্রশ্নগুলো আবারও ছুড়ে দেবে।
নতুন বছরকে ঘিরে শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, সামাজিক মাধ্যমে শুভকামনা ভেসে বেড়ায়। কিন্তু শুভকামনা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সঙ্গে দায়িত্ব যুক্ত থাকে। শুধু “শুভ নববর্ষ” বললেই বছর শুভ হয়ে ওঠে না; বছরকে শুভ করতে হয় আমাদের কাজ দিয়ে, আচরণ দিয়ে, সিদ্ধান্ত দিয়ে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুর্বল মানুষের পাশে থাকা, সত্য কথা বলার সাহস—এই গুণগুলো ছাড়া কোনো বছরই সত্যিকারের নতুন হতে পারে না।
২০২৬ আমাদের কাছে এক অজানা পথ। এই পথে কী আছে, আমরা জানি না। কিন্তু ইতিহাস বলে—ভয় আর আশার মাঝেই মানুষের অগ্রযাত্রা। নতুন বছর আমাদের সেই অগ্রযাত্রার আরেকটি সুযোগ দেয়। ভুল থেকে শেখার, নতুনভাবে ভাবার, আরও মানবিক হওয়ার সুযোগ।
সময় দ্রুত যায়—এই সত্য নতুন করে মনে করিয়ে দেয় প্রতিটি নববর্ষ। তাই ২০২৬-কে শুধু ক্যালেন্ডারের আরেকটি সংখ্যা হিসেবে নয়, বরং দায়িত্ব ও সম্ভাবনার এক নতুন অধ্যায় হিসেবে গ্রহণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। শুভ হোক নতুন বছর—শুধু কথায় নয়, কাজে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন