https://www.prothomalony.com/

15693

opinion

অভিমত

সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত, গণতন্ত্রের ওপর আঘাত

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৪:৪৩

বাংলাদেশে পত্রিকা অফিসে হামলার খবর আমাদের গভীরভাবে বিচলিত করে। এই ধরনের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান বা কিছু মানুষের ওপর আঘাত নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত। পত্রিকা অফিসে হামলা করে কোনোভাবেই গণতন্ত্র কায়েম করা যায় না—এই সত্যটি নতুন নয়, তবু বারবার মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি যুক্তি, আলোচনা ও ভিন্নমতের সহাবস্থান। সেখানে সহিংসতা কখনোই বিকল্প হতে পারে না। সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা কোনো স্থায়ী বা ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসে—এমন প্রমাণ ইতিহাসে নেই। বরং এগুলো সমাজকে আরও বিভক্ত করে, অবিশ্বাস বাড়ায়, এবং আইন ও নৈতিকতার সীমারেখা ঝাপসা করে দেয়। যে সমাজে সহিংসতা প্রশ্রয় পায়, সেখানে সত্যের অনুসন্ধান থেমে যায়; ভয়ই হয়ে ওঠে প্রধান ভাষা।

সহিংসতায় ইন্ধন দেওয়া—সে সরাসরি হোক বা বক্তব্যের আড়ালে—কোনো সমাজই ভালো কাজ হিসেবে গ্রহণ করে না। কোনো বক্তব্য দিয়ে সহিংসতাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় না। মতভিন্নতা থাকবে, থাকাই স্বাভাবিক; কিন্তু মতভিন্নতার জবাব কখনোই লাঠি, আগুন বা ভাঙচুর হতে পারে না। গণতান্ত্রিক পরিসরে প্রতিবাদ আছে, সমালোচনা আছে, এমনকি তীব্র বিরোধিতাও আছে—কিন্তু তার পথ সহিংসতা নয়।

পত্রিকা ও সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ—এই কথাটি বহুবার বলা হয়েছে। এর অর্থ শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়; এর অর্থ দায়িত্বও। সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন তোলে, ক্ষমতাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করে, সমাজের অসংগতি তুলে ধরে। এতে কারও অস্বস্তি হতে পারে, ক্ষোভ জন্মাতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভের প্রতিক্রিয়া যদি হামলা হয়, তবে সেটি ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়—এটি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধাচরণ।

বিশৃঙ্খলা ও অনাচারের জবাবে অনাচার, হামলা ও প্রতিশোধ—এই চক্র কোনো সমাজের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না। প্রতিশোধের রাজনীতি সমাজকে নৈতিকভাবে দেউলিয়া করে। এক হামলার জবাবে আরেক হামলা, এক অপমানের জবাবে আরেক অপমান—এই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবিষ্যৎ।

আমরা যদি সত্যিই একটি দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র চাই, তবে দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দায়িত্বশীলতা মানে শুধু আইন মানা নয়; দায়িত্বশীলতা মানে ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতা, যুক্তির সঙ্গে যুক্তির মোকাবিলা, এবং সহিংসতার প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করা। দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণই গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার মূল চাবিকাঠি—এই কথাটি যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে ততটাই কঠিন, আবার ততটাই জরুরি।

এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকার কথাও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। পত্রিকা অফিসে হামলা হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের দৃশ্যমান প্রয়োগ অপরিহার্য। শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি সহিংসতাকে উৎসাহিত করে—এটি কোনো মতামত নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি বাস্তবতা। আইনের শাসন দৃঢ় না হলে, সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত কথাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের নিজেদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন। পেশাগত নৈতিকতা, তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল ভাষা—এসব গণমাধ্যমের শক্তি বাড়ায়, বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করে। সমালোচনা ও অনুসন্ধান যতই কঠোর হোক, তা যেন তথ্যনির্ভর ও ন্যায়সংগত হয়—এই প্রত্যাশা গণতন্ত্রের পক্ষেই যায়। কিন্তু এই প্রত্যাশা পূরণ না হলেই হামলা বৈধ হয়ে যায়—এমন কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গুজব, উসকানি ও আবেগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখানেও নাগরিক দায়িত্ব বড় বিষয়। একটি অসতর্ক শেয়ার, একটি উসকানিমূলক মন্তব্য—এসব অনেক সময় বাস্তব সহিংসতার রসদ হয়ে ওঠে। তাই বাকস্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে বাকদায়িত্বের চর্চাও জরুরি। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব—এই দুইয়ের ভারসাম্যেই সুস্থ গণতন্ত্র টিকে থাকে।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে দেয়, সংকটের মুহূর্তে সংলাপ ও সহনশীলতাই আমাদের এগিয়ে নিয়েছে। ভাঙচুর, হামলা বা ভয় দেখানো নয়। আজও সেই পথই আমাদের বেছে নিতে হবে। পত্রিকা অফিসে হামলার মতো ঘটনা যদি আমরা নীরবে মেনে নিই বা যুক্তি দিয়ে হালকা করি, তবে আগামীকাল আঘাত আসবে আরও গভীরে—স্কুলে, আদালতে, নাগরিক পরিসরে।

এই সম্পাদকীয় কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এটি সহিংসতার বিরুদ্ধে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে, এবং দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের পক্ষে একটি স্পষ্ট অবস্থান। গণতন্ত্র প্রশ্নকে ভয় পায় না; গণতন্ত্র ভয় পায় সহিংসতাকে। কলমের ওপর আঘাত মানেই গণতন্ত্রের ওপর আঘাত—এই বোধ যত দ্রুত আমরা সমাজ হিসেবে গ্রহণ করব, তত দ্রুতই আমরা নিরাপদ ও পরিণত রাষ্ট্রের পথে এগোতে পারব।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন