https://www.prothomalony.com/

15230

decoration

সাজসজ্জা

চট্টগ্রামে গ্র্যাভিটি ফিটনেসে শরীরচর্চার নতুন ছন্দ

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ ০৬:১৪

সবুজে ঘেরা বন্দরনগরের বায়েজিদ বোস্তামি সড়ক ধরে একটু এগোলেই চোখে পড়ে এক চকচকে সাইনবোর্ড—‘গ্র্যাভিটি ফিটনেস’। বাইরে থেকে মনে হবে, কোনো স্টাইলিশ করপোরেট অফিস বা ট্রেন্ডি ক্যাফে। কিন্তু দরজার ওপারে খুলে যায় এক অন্য দুনিয়া। শরীরচর্চার ছন্দ আর আলোয় মিশে থাকা এক আধুনিক জগৎ।


চট্টগ্রামের উত্তর নাসিরাবাদে গড়ে ওঠা এই ফিটনেস জোন এখন শহরের নতুন আলোচনার কেন্দ্র। শুধু ওজন তোলা বা ট্রেডমিলে দৌড়ানো নয়, এখানে মিলে শরীরচর্চা এক অভিজ্ঞতা। যেন ছন্দ, রঙ আর সুরের অনন্য অনুশীলন।

শরীরচর্চা আসলে পেশি গঠনের বিষয় নয়। এটা মনকে গুছিয়ে নেওয়ার এক নিঃশব্দ অনুশীলন। প্রতিটি রিপ, প্রতিটি বিন্দু মনে করিয়ে দেয়, শরীর মানে শৃঙ্খলা, স্থিরতা আর সাহস। গ্র্যাভিটি ফিটনেস গ্রাহকদের সেই সাহসটা-ই শক্তিশালী করার লক্ষ্য স্থির করেছে। 

 

শুরুর গল্প

২০২৩ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের এই ফিটনেস সেন্টারের উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন আমেরিকার বিখ্যাত ইউএফসি ফাইটার ও ফিটনেস ট্রেইনার চ্যাড রেইনার। তাঁর উপস্থিতি শুধু একটি উদ্বোধন নয়, বরং চট্টগ্রামের ফিটনেস সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছিল।

উদ্বোধনের দিন গ্র্যাভিটির ভেতরে ভিড় জমেছিল তরুণ আর স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের। কেউ ছবি তুলছিল, কেউ ভিডিও করছিল, কেউ বা অবাক দৃষ্টিতে দেখছিল সেই আধুনিক সরঞ্জাম। যা আগে এ অঞ্চলে দেখা যায়নি। 


রনি দাশের মুখে বারবার ফিরে আসে একটি শব্দ ‘রিসার্চ’। তিনি বলছিলেন, একটা আধুনিক ফিটনেস সেন্টার বানানো মানে শুধু যন্ত্রপাতি কেনা নয়। বরং একটা শিল্পকর্ম তৈরি করা। আমরা দুই বছর ধরে খুঁজেছি কোন ব্র্যান্ডের সরঞ্জাম সবচেয়ে টেকসই, কোন লাইটিং মানুষকে মোটিভেট করে, কোন জায়গায় কীভাবে বায়ুচলাচল রাখতে হবে। দিন শেষে আমরা সফল হয়েছি। কেননা, ইতিমধ্যে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সুনাম। 


এই সূক্ষ্ম পরিকল্পনাই গ্র্যাভিটিকে আলাদা করেছে অন্য সব জিম থেকে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা শুধু শরীর গঠনের জায়গা বানাইনি, শরীরচর্চার নতুন ধারণা তৈরি করেছি।’

অভ্যর্থনায় আধুনিক যন্ত্র আর শিল্প

গ্র্যাভিটি ফিটনেসে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ে সুবিশাল স্পেস। দেয়ালে ঝুলছে রঙিন আলোর প্রতিফলন, মেঝেতে ঝকঝকে টাইলস। দেয়ালের কোথাও কোথাও স্পেন থেকে আনা টাইলস। কোথাও যেন ধুলোর গন্ধ নেই। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। 

একপাশে শরীরচর্চার সারি সারি সরঞ্জাম। সবই বিশ্বের নামকরা ব্র্যান্ড থেকে আনা। ইতালি থেকে এসেছে পানাটা ব্র্যান্ডের পুলওভার, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ম্যাট্রিকস ব্র্যান্ডের লেগ প্রেস। প্রতিটি যন্ত্র এমনভাবে সাজানো, যেন এগুলো কেবল শরীর গঠনের নয়, শিল্পের অংশ।

‘আমরা চেয়েছি এমন একটা জায়গা, যেখানে মানুষ শরীরচর্চা করবে, কিন্তু মনে হবে না সে ব্যায়াম করছে বরং সে একটা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে,’ বলেন এই ফিটনেস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা রনি দাশ। তাঁর চোখে গর্বের ঝিলিক। মুখে চওড়া হাসি। 

গানের তালে আলো বদলায়


শরীরচর্চা মানেই একঘেয়ে রুটিন। এই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে গ্র্যাভিটি। এখানে গানের তালে তালে আলো বদলায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হয়েছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ও আরজিবি ডিএমএক্স লাইটিং। গানের তাল পাল্টালে রঙও পাল্টায়। কখনো নীল, কখনো লাল, আবার কখনো উজ্জ্বল সোনালি।

যেন একেকটি রিপেটিশনে শরীরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচে আলো। শরীরচর্চা একটা ছন্দের বিষয়,” রনি বলেন, ‘সেই ছন্দটাকে আমরা দৃশ্যমান করতে চেয়েছি। এখানে আলো, সাউন্ড, এমনকি গন্ধও একটা মুড তৈরি করে।’

শুধু জিম নয়, এক সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা

গ্র্যাভিটি ফিটনেসকে আলাদা করেছে তার পরিপূর্ণতা। এখানে শুধু মেশিন নয়, আছে ফিট বার, নিউট্রিশন কর্নার আর ডায়েট জোন। যেখানে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞরা সাজিয়ে দেন প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা 

ক্লান্ত শরীরে বিশ্রাম নিতে চাইলে আছে আধুনিক বিশ্রামাগার, ম্যাসাজ কর্নার। প্রার্থনার সময় হলে পাশে আছে নিরিবিলি নামাজঘর। এমনকি বইপ্রেমীদের জন্য বুক কর্নারেও রাখা আছে বিশ্বের খ্যাতনামা ফিটনেস ট্রেইনারদের লেখা বই।

এক অর্থে, এই সেন্টার শরীরচর্চার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তির জায়গাও বটে। কেউ ডাম্বেল তুলছে, কেউ বইয়ের পাতায় চোখ রেখে জেনে নিচ্ছে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার বা জো উইডারের অভিজ্ঞতা।

দল আর সময়-সবসময় প্রস্তুত

গ্র্যাভিটি ফিটনেসে দিন-রাতের কোনো সীমা নেই। ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে দরজা। ভোরে অফিসপূর্ব ব্যায়াম হোক বা গভীর রাতে নিঃশব্দ অনুশীলন। সব সময়ই পাশে থাকে ১৬ সদস্যের প্রশিক্ষিত দল। নারী-পুরুষ উভয়ই আছেন সেই দলে, সঙ্গে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ট্রেইনার।

তাদের একজন বললেন, ‘আমাদের এখানে শুধু ট্রেনিং হয় না, একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়। কেউ নতুন এলে তার শরীর, মানসিকতা, ঘুম সব বিশ্লেষণ করে শুরু হয় তার প্রোগ্রাম। এই পেশাদারিত্বই গ্রাহকদের বারবার ফিরিয়ে আনে।’

ক্লান্তির ভেতরে এক সজীবতা

চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত শহরে এমন ফিটনেস সেন্টার শুধু বিলাসিতা নয়, প্রয়োজনও। দূষণ, যানজট, অফিসের চাপ সব মিলিয়ে মানসিক ক্লান্তিতে ভোগে শহরের মানুষ। সেখানে গ্র্যাভিটি ফিটনেস যেন এক শ্বাস নেওয়ার জায়গা। কেউ ট্রেডমিলে হাঁটছে ধীরে ধীরে, কারও কানে বাজছে গান, কেউ নিজের শরীরের সীমা পরীক্ষা করছে ডেডলিফটে। সব মিলিয়ে এ যেন শহরের ভেতর একটা প্রাণবন্ত পৃথিবী।

চট্টগ্রামে একসময় ফিটনেস সেন্টার মানেই ছিল সংকীর্ণ জায়গা, গরম বাতাস, আর পুরোনো যন্ত্রপাতি। সেই ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়েছে গ্র্যাভিটি ফিটনেস। এখানে শরীরচর্চা আর শুধু ওয়ার্কআউট নয়। এটা হয়ে উঠেছে এক ধরণের রিচুয়াল, নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর এক ঘর।

রনি দাশের চোখে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ঝিলমিল করে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু জিম নয়, এক কমিউনিটি তৈরি করা। যেখানে মানুষ সুস্থ, শক্ত আর ইতিবাচক হতে শিখবে।’

চট্টগ্রামের এই ফিটনেস জোন তাই এখন শুধু শরীরচর্চার জায়গা নয়। এ এক নতুন জীবনধারার প্রতীক। শরীর, আলো, সুর সব মিলিয়ে এক ছন্দের নাম—‘গ্র্যাভিটি ফিটনেস’।

সাজসজ্জা থেকে আরো পড়ুন