https://www.prothomalony.com/
15135
literature
অন্তর্নিহিত ছন্দময় শব্দের কুহক
অরূপ তালুকদার
কি লিখি বা কেন লিখি--এ দু'টোই প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এমন ধরনের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া রীতিমতো কঠিন বলেই মনে হয় আমার কাছে I কারণ কি লিখি, সেটা লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বোঝা যায়, আসলে লেখাটা কি হলো I কিন্তু এর ভেতরে আরেকটা প্রশ্ন বা কথা থেকে যায়, সেটা কিন্তু লেখক ছাড়া কেউ জানেন না, বুঝতেও পারেন না I কথাটা হল সত্যিকারভাবে কোন লেখক মনে মনে কি লেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন- পদ্য নাকি গদ্য কিছু, সেটা বোঝা যায় লেখা শেষ হয়ে গেলে।
এখানে একটা কথা বলা দরকার, পাঠক যদি এ লেখা পড়তে চান তবে তা তিনি পড়ে ফেলতে পারেন, তাতে তার কতটা সময় লাগলো, সেটা লেখার কলেবরের উপর নির্ভর করে I তবে পড়ার পরে সেটা তার কতটা ভালো লাগলো; কি লাগলো না, সেটা তার ব্যাপার I কিন্তু তিনি কি একবারও ভাবেন যে, এই লেখাটা লেখার জন্য লেখককে কতটা সময়, মেধা,পরিশ্রম আর মনোযোগ খরচ করতে হয়েছে? মনে হয় না।
অন্যদিকে লেখকের আরো থাকে দায় এবং দায়িত্বও, যাতে এই লেখার জন্য তাকে কোনরকম জবাবদিহিতার দায় নিতে হবে কি হবে না বা অন্য কোন সমস্যায় পড়তে হবে কিনা! এসবের পাশাপাশি লেখার ক্ষেত্রে এখন সত্য-মিথ্যার প্রশ্নও তোলেন কেউ কেউ I কিন্তু সেই সত্য-মিথ্যা নিরূপনের বা বিচারের ভারটা নিচ্ছেন কে?
লেখক নিজেই শুধু জানেন তিনি যা লিখেছেন তার মধ্যে কতটুকু সত্য বা মিথ্যে জড়িয়ে আছেI অন্য কারোর সেটা জানার কথা নয়I কারণ বাইরের কেউ কি তার মনের কথা এত সহজে জানতে পারেন!
আমরা যদি কবিতার কথা বলি, তাতে শব্দকল্পের বিষয়টি আসবে অনিবার্যভাবেI আসবে শব্দ ব্যবহারের কথাও I 'শব্দ' যেমন একটা বোঝার বিষয়, তেমনি ভাবনা বা ভালোভাবে হৃদয়াঙ্গম করার বিষয়টা হচ্ছে ফ্যামিলি কল্পনায় আবৃত কোন অনুষঙ্গ যা নান্দনিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গড়ে তোলে নতুন কোন' শব্দবন্ধ', যার খোঁজে ব্যাকুল হন কবিI
প্রকৃতপক্ষে যেহেতু 'শব্দ' থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে ভাষা প্রকাশের মাধ্যমটি; তাই শব্দ নিয়েই লুকোচুরি খেলে লেখকের দিন চলে যায়,সন্ধ্যা ঘনায়......... I
গ্রিক লোগো 'লোগোস' ভাষান্তরিত রূপ হচ্ছে ইংরেজিতে 'ওয়ার্ড', আমাদের ভাষায় 'শব্দ' I ব্যাকরণগত পরিভাষায় 'লেক্সিস' বা'লেক্সিকন'-যার অর্থ শব্দকোষ বা অভিধানI এর বেশি প্রয়োজন নেই I তবে এখন ওয়ার্ড শব্দটি অনেক কিছু বোঝায়।
শব্দ নিয়ে এমন নিগূঢ় আলোচনা বা তর্ক কাব্য রচনায় খুব একটা কাজে লাগে না। কারণ নিশ্চিতভাবে কোন কবি তার মনের কথাটি এভাবে কঠিন করে বলতে পারেন নাI ফলে তার 'ঝংকৃত হৃদয়ের অমৃতবাণী রয়ে যায় যেন অন্তরে অন্তরে নিভৃত যতনে.......'
অন্যদিকে, সত্য মিথ্যা, সে তো ছলনাময়ী,তাকে যে যেভাবে দেখতে চায় বা দেখাতে চায় সেভাবেই তা প্রতিভাত হয়, কখনো সরল সোজাসুজিভাবে কখনোবা ছদ্মাবরণে।
কবিতাকে প্লেটো কেন যে 'ছায়ার অনুকৃতি' বা 'অনুকরণের অনুকরণ' বলে গণ্য করতেন তা আমরা জানি।
'রিপাবলিক'-এ নানা দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি তার ব্যাখ্যা করেছেন। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছেন,' কবিতা কি? এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা বলতে পারি যে, কবিতা আসলে শব্দ নয়,বরং শব্দকে ব্যবহার করবার এক ধরনের গুনপনাI ভাষার মধ্যে যা কিনা অন্যবিধ একটি দ্যোতনা এনে দেয়। অথবা বলতে পারি,কবিতা আসলে ভাষার একটি স্তর, কবিতা বলে গণ্য হতে হলে আমাদের ভাবনার শব্দরূপকে যে স্তরে উত্তীর্ণ হতে হবেই, আবার অন্যদিকে, গদ্য রচনা যে স্তরকেও মাঝেমাঝে স্পর্শ করে যায়।'
'অ্যাবসোলিউট ট্রুথ' বা 'ধ্রুবসত্য' বলতে আসলে কি কিছু আছে? চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ পৃথিবী পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে দেখতে হবে, বলেন বিজ্ঞানীরা। এই সত্যকেও আমরা অস্বীকার করতে পারিনা।
আসলে সত্য মিথ্যার বিষয়টি একান্তভাবেই প্রতিটি মানুষের নিজস্ব বিষয়। একজনের সঙ্গে আরেকজনের মেলে না। নিষ্ঠুর সত্য হয়তো এটাই। একজন লেখক কি লিখবন, সেটা নিয়ে তাকে যেমন ভাবতে হয়, কেন, কি লিখবেন, সে ভাবনাটাও জড়িয়ে থাকে তার সঙ্গে এক অনিবার্য বন্ধনে।
'আমাদের চারপাশে যে অনিন্দ্য অপার সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃতি, সে তো এক বিশাল সৌন্দর্যের আধার I যে ধারণ করে আছে আদিগন্ত বিস্তৃত মহাসাগর, সবুজ চাদরে মোড়া নিবিড় অরণ্যানী, এসব দেখতে দেখতেই তো এক জীবন চলে যায়।
তবে কথা আছে, সবার দেখা এক রকম নয়। তেমন ভাবে দেখার জন্য যে অন্তর্নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, তাকি সবার থাকে, না কি আছে? একজন মানুষ যার ভেতরে আছে ঈশ্বর প্রদত্ত লেখার ক্ষমতা, আছে আবেগ আর হৃদয়ের ভেতরে পাওয়া না পাওয়ার বেদনা আর কষ্টের নিবিড় আবহ। নিঃসন্দেহে বুঝি, তার আছে শিল্পী বিনোদ বিহারীর মত 'ভেতরের চোখ' I অন্ধ হয়েও যিনি তার অন্তর্নিহিত চোখ দিয়ে সব কিছু দেখতে পারতেন, সব সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারতেনI কিন্তু তারপরেও কেন যেন থেকে যায় সারা জীবনের অতৃপ্তি আর না পাওয়ার অপার বেদনা! তাহলে সেই অতৃপ্তি আর না পাওয়ার বেদনা থেকেই কি কোন শিল্পী তার শিল্পকে মূর্ত করে তোলেন,কবি প্রতিষ্ঠা করেন তার বাকপ্রতিমা?
এর কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, সেটা বুঝতে বুঝতে কত যে সময় চলে যায়, তার হদিশ কি কেউ খুঁজে পায়,.. বরং পেছনে পড়ে থাকে তো সেই দুর্বোধ্য শূন্যতাই সবকিছু জড়িয়ে, যে শূন্যতা একসময় নিসঙ্গতার অবয়বে চলে আসে কাছেI
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার কবিতায় যেমন বলেন,...'যতটাই নিঃসঙ্গ হয়/ মৃত্যু ততটাই তার কাছে আসে/ পাশাপাশি হাঁটে...' I
সময় চলে যায়, যেন বহতা এক নদী, আপন নিয়মে বয়ে চলে সবার অলক্ষ্যে...' এই কঠিন সত্যটি যখন আমাদেরকে বিপন্ন করে তোলে তখন অনিবার্যভাবে বিনয়কে মনে পড়ে...' নিজের নিরস্ত্রশোভা, উলঙ্গ অবস্থা নিয়ে আর কোথায়, কার দ্বারে উপস্থিত হব, হে সময় ?......'
একজন লেখক বা কবিকে এই পার্থিব জগতে আর কার সঙ্গে মেলানো যাবে?
শূন্যতার বিজ্ঞাপন
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
তখন সকাল দশটা। অভ্রর ফেসবুক ফিডে একের পর এক নতুন মুখের বিজ্ঞাপন ভেসে আসছে। সবকটা মুখ হাসিখুশি, উজ্জ্বল। কেউ বলছে, "শূন্যতা জয় করুন, আমাদের নতুন প্যাকেজ কিনুন!" কেউ বলছে, "আপনার শূন্যতাকে সাজিয়ে তুলুন, আমাদের আর্ট কোর্স নিন।"
অভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার শূন্যতাটা তিন মাস ধরে একটা ধুলোমাখা পুরোনো সোফার মতোন পড়ে আছে। কেউ এটাকে জয় করতে চায়নি, কেউ সাজিয়েও তুলতে আসেনি।
এই শূন্যতাটা প্রথম এসেছিল যখন সে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাকরিটা হারিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলোও ফিকে হয়ে গেল। একটা সময় সে দেখত, তার বন্ধুরা একে অপরের জন্মদিনে স্ট্যাটাস দিচ্ছে, হাসছে, আনন্দ করছে। কিন্তু তার প্রোফাইলে শুধু নীরবতা। গভীর, গাঢ় নীরবতা।
অবশ্য অফলাইন দুনিয়াতেও একই পরিস্থিতি। সে কফি শপে যায়, দেখে সবাই ব্যস্ত নিজেদের ফোনের স্ক্রিনে। পাশে বসা মানুষটার সাথেও কথা হয় না। সেখানেও শূন্যতা। অভ্র একদিন লাইব্রেরিতে গিয়েছিল একটা বই খুঁজতে। সেখানেও দেখল, বইয়ের তাকের পাশে একটা ডিজিটাল ডিসপ্লেতে বিজ্ঞাপন - "শূন্যতা থেকে মুক্তি, আমাদের ডিজিটাল ডিটক্স প্রোগ্রামে যোগ দিন।"
বিজ্ঞাপনগুলো যেন তার শূন্যতাকে আরও বেশি করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এই শূন্যতাটা কি তবে নতুন এক পণ্য? যা সবার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে?
অভ্রর মনে হলো, সে যেন এক বিশাল দোকানের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি পণ্যই তার শূন্যতাকে লক্ষ্য করে তৈরি। কিন্তু কোনোটিই তার জন্য নয়। কারণ তার শূন্যতাটা বাণিজ্যিক নয়, ব্যক্তিগত।
সন্ধ্যা নেমেছে। অভ্র তার ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল। স্ক্রিনের আলো নিভে যাওয়ার পর তার ঘরের অন্ধকারটা আরও গাঢ় হলো। সে দেখল, চারপাশে শুধু অন্ধকার, কোনো বিজ্ঞাপন নেই। কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি নেই। এই অন্ধকার তার নিজের, তার নিজস্ব শূন্যতার মতোই। এই মুহূর্তে এই শূন্যতাকেই তার সবচেয়ে বেশি বাস্তব মনে হলো।
ভেনিটিব্যাগ
মাহফুজ আদনান
নিউইয়রক শহরের ব্যস্ত সড়ক টাইমস স্কয়ার ব্রডওয়ে। সেভেনথ এভিনিউ এর এলাকায় হাঁটতে হাঁটতে জুতোর দিকে তাকাচ্ছে সুশান্ত। সটুডেন্ট ভিসায় আমেরিকায় আসার আগে সে ভাবেনি এই শহরের পথে পথে হেঁটে চাকুরির সন্ধানের জন্য ৫০০০ বাংলাদেশি টাকার জুতোর নিচ ক্ষয়ে যাবে। খাবারের জন্য হা-হুতাশ করতে হবে। কোটিপতি বাবার হোটেলে যখন দেশে ছিল বা ভার্সিটিতে দামি পারফিউম মেখে যেত, তখন সে কি ভেবেছিল আমেরিকায় এসে তাকে এরকম না খেয়ে থাকতে হবে! পথে পথে মানুষের দ্বারে দ্বারে চাকুরির জন্য ঘুরঘুর করতে হবে!
স্প্রিং সিজনেরএই সময়ে অর্থাৎ আর শীতের পরপরই চলে আসা। এই তো সবে মাত্র তিন সপ্তাহ হল। প্রথম দু'সপ্তাহ ভালো কেটেছে। জ্যাকসন হাইটসের মেরিট কাবাব রেস্টুরেন্টের বিরিয়ানি, ইত্যাদির চিকেন এন্ড গ্রিলের নানা রকম ভর্তা, কাচ্চি বিরিয়ানি, হাটবাজার রেস্টুরেন্টের হালিম, ফুচকা, চটপটি, জায়রো খেয়ে নিউইয়র্কের বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে কেটে গেছে। বন্ধুরা সবাই ভাবছে ঢাকার গুলশানের বাসিন্দা দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর ছেলে হয়তো অনেক টাকা দেশ থেকে নিয়ে আসছে। খেতে থাকো। রুজভেলটের নিচের পার্টি মাসতি আডডায় সাথে থাকা ১২৫০০ ডলার শেষ দুই সপ্তাহে।
আর নীতিবান বাবা বলে দিয়েছিলেন ১২৫০০ ডলার তোমাকে ছয় মাসের জন্য দিয়েছি। এ টাকা দিয়ে তুমি খাবে থাকবে। বাকি পড়ার টাকা সরাসরি কলেজে পাঠিয়ে দিব। তোমার কাজিন গার্ডিয়ান সুনীলের কাছে।
সময়ের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সুশান্তর আজ মাথায় হাত। চাকুরি না করলে খাবে কি। এ দেশে সবাই কাজ করে। খেটে খেয়ে থাকে, সে দেশের যত বড় ধনাঢ্য হোক না কেন কাজের কোন লজ্জা নাই। কাজ কাজই। তাইতো সারাদিন ধরে ম্যানহাটানে কাজের জন্য ঘুরছে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে। তবে এখানে রেফারেন্স ছাড়া কাজ মেলে না। গার্ডিয়ান যিনি আছেন তিনি বলে দিছেয়েন নিজে নিজে কাজ খুঁজো, এ দেশে সবাই নিজে নিজে কাজ খুঁজে কাজ করে।
পড়ন্ত দুপুর।সেভেনথ এভিনিউ থেকে এইটথ এভিনিউ আসতেই সুশান্তর চোখে পড়ে একটি দামি ভ্যানিটিব্যাগ, রাস্তায় পড়ে আছে। সে লুকিয়ে হাতে নিল। পকেটে একটা ডলার নেই। ব্যাগটা দেখে ভাবছে হয়তো টাকা থাকতে পারে।
একটু আড়ালে গিয়ে হাত ঢুকিয়ে দেখে, ওমা! দুই বান্ডিল ১০০ ডলারের নোট। আর কিছু মেকআপ পণ্য। তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে ডলার বের করে ব্যাগটা মাটিতে ফেলে দিল সুশান্ত। এরপর খুবই বুদ্ধিমততার সাথে চলে গেল। কম হলেও বিশ হাজার ডলার হবে, এ কথা ভেবে ভেবে সেভেন ট্রেনে সোজা উডসাইড ৬১ স্ট্রিটে নামে। বাসায় এসে সে ভাবে, হায়! অভাবে আমার স্বভাব নষ্ট হয়ে গেল। কার টাকা আজ আমার হাতে!
সাংসারিক
নাদিয়া নওশাদ
অভাবের টানাপোড়েনের সংসারে মুহিবার একমাত্র ভরসা শশুরের পৈতৃক দোতলা বাড়ির একতলার মুদি দোকান 'সাংসারিক'। স্বামী আসাদ, ছেলে টুবান, বৌমা শর্মী, ছোট ছেলে টুবলু আর শাশুড়ীমা মনোয়ারা বেগমকে নিয়ে মুহিবার ভরা সংসার। আসাদ পাড়ার একটা ছোট্ট স্কুলে অংকের শিক্ষক। টুবান একটা ইলেক্ট্রনিকসের শো-রুমে চাকরিরত আর টুবলু ক্লাস সেভেন পড়ুয়া।
মনোয়ারা বেগম বেশ কয়েক বছর ধরে পেটের ক্যান্সারে ভুগছেন। মূলত তাঁর চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থের যোগান দিতে গিয়ে পুরো পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে এ কথাও সত্যি যে মাত্র ত্রিশ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে শুরু করা 'সাংসারিক' মুহিবার অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ স্ব-গর্বে দাঁড়িয়ে আছে।
সংসারের যাবতীয় খরচের জন্য আয়ের উৎসের সিংহভাগ 'সাংসারিক' থেকেই। ডিম,প্যাকেটজাত তরল দুধ, মুড়ি, চানাচুর, বিভিন্ন প্রকার বিস্কুট, চাল, ডাল ইত্যাদি নিত্যপণ্য দিয়ে 'সাংসারিক' মুদি দোকানটি সুসজ্জিত।
এমনকি পাইকারি পাঁচ টাকা দরে সংবাদপত্র কিনে মুহিবা সেই সংবাদপত্র আট টাকা দরে পাড়ার প্রতিবেশী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে বিক্রি করে। বছর সতেরো-আঠারোর মিলন নামের একটা ছেলে মুহিবাকে দোকানের এসব টুকিটাকি জিনিসপত্র কেনাকাটায় অনেক সাহায্য করে।
তবে মেয়েমানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য করে আয়-রোজগার করবে এই বিষয়টি আত্মীয়-প্রতিবেশীদের অনেকেই সহজভাবে নেয়নি। নানাজনে নানা কথা বলেছে। তবে মুহিবা সেসব কথা কানে না তুলে আপনমনে নিজের কাজ করে গিয়েছে।
একবার এলাকার রফিক সাহেব দুষ্টু লোক লাগিয়ে রাতের অন্ধকারে 'সাংসারিক'-এ অতর্কিত হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। সেই ধাক্কা সামলাতে মুহিবার অনেক কষ্ট হয়েছে।
পুলিশ-প্রশাসন নানান জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করে আসাদ ও তার পরিবার ঝক্কি সামলেছে, দিনের পর দিন না খেয়ে কখনও একবেলা খেয়ে, সুতো দিয়ে দুটো ডিম কেটে, কোনওমতে আলুসেদ্ধ ভাত খেয়ে দিন পার করেছে।
মুহিবার একমাত্র বৌমা শর্মী শান্ত স্বভাবের হলেও টাচস্ক্রিন স্মার্টফোনের প্রতি বরাবরই দূর্বল। একবার এই টানাটানির মধ্যেই মুদি দোকানের মাল-সামাল কেনার জন্য মুহিবা কিছু থোক টাকা গুছিয়ে আলমারির দেরাজে তুলে রেখেছিল। পাশের বাড়ির মুরুব্বী যয়তুন খালা মুহিবার সাথে দেখা করে বসার ঘরে যখন আলাপচারিতা চালাচ্ছিল সেই ফাঁকে শর্মী মুহিবার ঘরের আলমারির দেরাজ থেকে টাকাটা চুরি করে মোবাইলের দোকানে গিয়ে চট করে একটা মোটামুটি দামী স্মার্টফোন কিনে বাড়ি ফিরলো। লুকিয়ে লুকিয়ে কয়েকদিন মোবাইল ফোন ব্যবহার করলো, টুকটাক ছবি, সেলফি তুললো।
হঠাৎই একদিন মুহিবার সামনে ফোন বেজে উঠলো আর কি করা! পরে শর্মী অনেক অপরাধবোধে ভুগে কান্নাকাটি করে মুহিবার কাছে সমস্ত সত্যটা অকপটে স্বীকার করলো। তখন মুহিবা অনেক আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে শর্মীকে বোঝালো। তবে এতোগুলো টাকা কিভাবে নতুন করে যোগাড় করবে সেই চিন্তায় মুহিবা দুচোখের পাতা এক করতে পারছে না।
অবশেষে মুহিবার দূর সম্পর্কের এক চাচাতো বোনের ছেলে রুবাবের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে টুবান আর মুহিবা আস্তে আস্তে ঋণ পরিশোধ করলো।
এছাড়া আসাদের আপন ফুফাতো ভাইরা মনোয়ারা বেগমের আদি ভিটা আর মুদি দোকান নিজেদের নামে করার পাঁয়তারা করেছিল। মুহিবা সাফ ইনকার জানিয়ে দিয়েছে।
প্রবল ঝড়-ঝাপটার পরও মুহিবার কাছে 'সাংসারিক' তার তৃতীয় সন্তানের মতো। প্রতিদিন অনেকটা সময় কাটে এই 'সাংসারিক' এর সাথে। তাই তার মুদি দোকান, তৃতীয় সন্তানকে বুকের সবটুকু সাহস, শক্তি দিয়ে আগলে রাখতে মুহিবা সর্বদা তৎপর! তার স্বপ্ন শত বাঁধা-বিপত্তিতেও 'সাংসারিক' যেন সদা সচল থাকে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন