https://www.prothomalony.com/
15134
literature
প্রথম পাতা(কবি ও কবিতাঃ কবিতার একপাতা)
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ ০১:২০
কবিতার একপাতার জন্য আমার ভালোবাসা
কুমার চক্রবর্তী
(কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক)
কবিতার এক পাতা হলো কবি ফারুক ফয়সলের একটি কাব্যাভিসার, একটি কবিস্বপ্ন, বা বলা যায় কবিতা বিষয়ে তাঁর স্বকীয়চিন্তার একটি সিগনেচার, যার বাস্তবায়ন তিনি নিয়ত করে চলেছেন নিউইয়র্কে বসে। সাপ্তাহিক প্রথম আলো নর্থ আমেরিকা প্রকাশিত বাংলা কবিতার মাসিক বিশেষ আয়োজন ‘কবিতার একপাতা’ একটি বিশেষত্বকে ধারণ করে চলছে: সারা বিশ্বের বাংলা কবিতার একটি চলন্তিকা হিসেবে সকল বাঙালি কবিদের কবিতাকে প্রকাশ করে এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে তা একটি স্বাতন্ত্র্যে পৌঁছে গেছে। কবি ফারুক ফয়সল একজন স্বাধীন ও স্বকীয়মাত্রার মানুষ, তাই এই প্রচেষ্টার সম্পাদন তাঁর হাত দিয়েই ঘটে চলছে।
বাংলা কবিতার মহাপ্রাণের প্রসারতায় এ কাজটি অনন্য। কারণ কবিতা শুধু একজন ব্যক্তির কৃত্যাদিই নয়, তা একটি ভাষার ও ভূগোলের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের পরিচায়কও। একটি জাতির মননের খবর জানতে হলে তার কবিতাকে জানা জরুরী। সুতরাং বাংলা কবিতার যে সমকালীন গতিবিকাশ, তাকে বুঝতে গেলে এ ধরণের কাগজের প্রয়োজনকে অস্বীকার করার জো নেই। বরং কবিতার ঐশ্বর্যকে বোঝার জন্য এ ধরণের ‘গৃহিণীপনা’র একান্ত প্রয়োজন।
‘কবিতার একপাতা’র সপ্তম বর্ষপূর্তি সংখ্যার প্রকাশক্ষণে আমি তার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
শুভেচ্ছাবার্তা
রাজু আলাউদ্দীন
( কবি , প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক)
‘কবিতার এক পাতা’ নামে কবি ফারুক ফয়সলের সম্পাদনায় ৭ বছর ধরে যে সাহিত্য সাময়িকীটি সাপ্তাহিক ‘প্রথম আলো নর্থ আমেরিকা’ থেকে বেরুচ্ছে, সেটি কেবল একটি কবিতাপত্র নয়। এটি প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ বছর এর ৭ বছর পূর্ণ হলো। কবি ও প্রাবন্ধিক ফারুক ফয়সল প্রবাসজীবনের নানা ব্যস্ততার মধ্যেও ভিন্নভাষী এক দেশে বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন এবং বাংলাভাষীদের মধ্যে সেই ভালোবাসা সংক্রমিত করে যাচ্ছেন—এটা আমাদের সবার জন্যই খুব গৌরবের। যে-কোনো মানুষের জাতিগত ও সংস্কৃতিক পরিচয়টি বেঁচে থাকে তার ভাষার মাধ্যমে আর জাতির শিল্পরুচির প্রকাশ ঘটে ভাষাশ্রয়ী সাহিত্যের মাধ্যমে। জাতি ও শিল্পরুচির পরিচয়ের মুখপত্র ‘কবিতার এক পাতা’র লেখকসম্প্রদায়কে আমি অভিনন্দন জানাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্প্রসারণে গৌরবময় ভূমিকা পালনের জন্য। এই পত্রিকার ৭ বছর পূর্তিতে অভিনন্দন কবি ও সম্পাদক ফারুক ফয়সলকে। পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক সাংবাদিক ও লেখক ইব্রাহীম চৌধুরীকে, আমাদের প্রিয় কবিতাপত্রটি প্রকাশ তিনি অব্যাহত রাখুন-এই কামনা করি।
নতুন পঙ্ক্তির পাতা
রাকীব হাসান
( কবি ও চিত্রশিল্পী )
কবিতায় আমি কবে ডুবেছি তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না, তবে প্রথম কবিতায় ডুবেছি মায়ের আঁচলে, শরতের পূর্ণিমায়, কামারের লোহা পিটানোর উত্তাপে, জেলেদের নৌকা বাওয়ার জীবন দেখে। আর কবিতা প্রকাশ করার সাহস আমি প্রথম প্রেমে পড়ে যে পেয়েছি, তা না বললে নিজের জীবনের গল্পের পৃষ্ঠা সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয় না।
শব্দ যখন ভাব ও আবেগের ছন্দে দুলে ওঠে, তখন কবিতার এক একটি পঙ্ক্তির জন্ম হয়। ছবি আঁকতে অসংখ্য রেখা যেমন মিলেমিশে ছবির একটি কম্পোজিশন সৃষ্টি করে, তেমন করেই বিভিন্ন পঙ্ক্তি একত্রিত হয়ে একটি কবিতাকে আকার দেয়। কবিতা লেখার কোন সংজ্ঞা নেই কিন্তু স্বতন্ত্র কবির কাছে কবিতাকে কবির শাসন মানতে হয়। কবিতা সাহিত্যের আদিতম শাখা এবং মূলত মানুষের নিজের মননে এক একটা মূর্তি বানানোর খেলা!
কবিতা পড়ার এবং শোনারও পাঠক-শ্রোতা চাই। না হলে কবিতার জন্মই বৃথা হয়ে যায়।
কবিতা প্রকাশিত হওয়ার জন্য কবিতার মতোই সুন্দর-অনুসঙ্গের মাধ্যম চাই। একটি কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পৃষ্ঠাটি যিনি সম্পাদনা করেন, তিনি কাব্যচিন্তা এবং শৈল্পিক ভাবনা দিয়ে কবিতাকে পাঠকের সামনে নতুন মাত্রা দিয়ে প্রকাশ করেন। কবিতার জন্য প্রকাশের এই জায়গাটি কেবল একজন যোগ্য সম্পাদক সৃষ্টি করতে পারেন।
নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘প্রথম আলো নর্থ আমেরিকা’র ‘কবিতার এক পাতা’ সম্পাদনা করে আসছেন কবি, লেখক এবং সম্পাদক ফারুক ফয়সল। এখানে একটি কথা বলে আমি ঋণমুক্ত হতে চাই যে, আমার বেশ কিছু কবিতা লেখা হয়েছে তাঁর তাগাদা এবং এই পাতাটির গুরুত্বের কারণে।
কবিতার শৈল্পিক এই পাতাটির দীর্ঘায়ু হোক, দেশের বাইরে এমন একটি জায়গা বাংলা কবিতার জন্য সমৃদ্ধ এবং নতুন পঙ্ক্তির পাতা।
কবিতার একপাতা : ছোট পরিসরে বড় আয়োজন
তুষার গায়েন
( কবি ও প্রাবন্ধিক )
বাংলাভাষা ও সাহিত্যের চর্চা এখন বাঙালির ভৌগলিক সীমানা নির্ধারিত দেশ ও অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বে যেখানেই বাঙালির পদচিহ্ন পড়েছে। বাঙালির রক্তস্নাত ভাষাপ্রেম অন্তর্জালের কল্যাণে, স্বদেশমৃত্তিকা থেকে বারো হাজার মাইল দূরে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে শ্রুতি, মুদ্রণ ও দৃশ্যমাধ্যমে। এই আবহে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত, 'প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা’র আয়োজনে প্রকাশিত ‘কবিতার একপাতা' গভীর অভিনিবেশ, মেধা ও মমতার স্বাক্ষর নিয়ে প্রতি মাসে উদিত হচ্ছে সতেজ, বহুবর্ণিল একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে যার গুণী সম্পাদক, লেখক-কবি ফারুক ফয়সল। উত্তর আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে আসা দেশের প্রতিষ্ঠিত কবি এবং অনেকেই যারা এখানে আসার পর কাব্যক্ষেত্রে নিজেদের মেধা-স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্ণিত করেছেন; কিন্তু দূরত্ব, অপরিচিতি এবং সংযোগহীনতার কারণে দেশের সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পান নি—'কবিতার একপাতা' সেই শূন্যতাকে বহুলাংশে পূরণ করেছে বলা যায়। ধীমান ও দূরদর্শী সম্পাদক এই পাতাটিকে শুধু উত্তর আমেরিকা নিবাসী কবিদের জন্য সীমাবদ্ধ রাখেন নি; পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ওজস্বী কবিদের পাশাপাশি স্বদেশের সতীর্থ কবিদের স্থান সংকুলানের ব্যবস্থাও করেছেন। তাই একই সময় পরিধিতে, দেশে বিদেশে বাংলা কবিতা কত রূপবৈচিত্র্যে বিকশিত হচ্ছে, তার একটা হদিশ এখানে পাওয়া যায়। সম্পাদক প্রায় প্রতিটি সংখ্যার জন্য একটি থিম অনুযায়ী কবিদের কাছে কবিতা আহ্ববান করেন যা নতুন কবিতার পথ প্রশস্ত করেছে।
একটি ছোট পরিসরকে যে সৃজন-মনন-সংকল্প দিয়ে গুরুত্ববাহী প্রকাশনা করে তোলা যায়, ফারুক ফয়সল ভাই সেটা প্রমাণ করেছেন।
কবি ও কবিতার নিবিড় পাঠকের সংযোগ
মোস্তাক আহমাদ দীন
(কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক)
বক্ষ্যমান কথাগুলি এই সময়ের সম্পাদকদের ভালো লাগবে কি না জানি না, তবু আমি আজ একথা বলতে বাধ্য যে, এখন অধিকাংশ সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক তার পত্রিকাকে
ঋদ্ধ করবার জন্যে যে মাধ্যমকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তা হলো গদ্য। তথ্যনিষ্ঠ, তত্ত্ববাহিত এবং বিচিত্র বিষয়ের, বিচিত্র আঙ্গিকের গদ্য। আমরা বলছি না, এ-ধরণের গদ্য পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করে না, গদ্যকঠিন এই যুগের লেখক গদ্যকে ধারণ করবেন তাই স্বাভাবিক, কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলে না যে, চিন্তাধর্মী গদ্য একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ক্রিয়াশীল, এরপর তার আবেদন কমে যেতে বাধ্য, আর একটি সৃষ্টিশীল লেখা— বিশেষত একটি উৎকৃষ্ট কবিতা— কালনিরপেক্ষ এবং যুগে যুগে নবজন্মের প্রতীক্ষা করে। অন্যরা যখন এই বিশেষ মাধ্যমের রচনাকে অর্থাৎ কবিতাকে নির্বিচার প্রকাশে ব্যস্ত, সেখানে কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক ফারুক ফয়সল এই বিশেষ মাধ্যমকে বিশেষ যত্ন ও পরিকল্পনায় প্রকাশ করতে আগ্রহী। এর জন্য তাঁর সাবধানী নির্বাচন এবং পত্রিকার দৃষ্টিনন্দন বিন্যাস, কবি ও কবিতার নিবিড় পাঠক—উভয়কেই আকৃষ্ট করে। একারণেই কেবল কবিতা নিয়ে বিন্যস্ত একটি পাতা সাত-সাতটি বছর টিকে আছে।
আমি নিজে এই পাতার একজন মনোযোগী পাঠক এবং লেখক। তাই পাতাটি ভবিষ্যতেও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে কবিতাচর্চায় ভূমিকা রাখবে— এই আশা করছি।
দ্বিতীয় পাতা (বাংলাদেশের কবিদের কবিতা)
——————————————————————
আজগুবি স্বপ্ন
ঝর্না রহমান
একটা আজগুবি স্বপ্ন এসে মায়ের মাথাটা খারাপ করে দিল
রোজই ঐ স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। এমন কি জেগে জেগেও একই স্বপ্ন দেখতেন।
বলতেন, যুদ্ধ লেগে গেছে। দুনিয়া জুড়ে কী সুন্দর যুদ্ধ!
ভালোবাসার যুদ্ধ লেগে গেছে! মানুষ ভালোবাসার জন্য পাগল হয়ে গেছে
কে কত ভালোবাসতে পারে দেশে দেশে সেই প্রতিযোগিতা চলছে।
আকাশ ঢেকে গেছে হৃদয়াকৃতি ঘুড়িতে; সেখানে ভালোবাসার নীল কবিতা মুদ্রিত করা
শিশুদের কপালে টিপ দেওয়ার জন্য লোকে চাঁদের বাগান করতে লেগেছে
রাস্তার ধারে মানুষ নিজের কলিজা হাতে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।
ভালোবাসার কলিজা! উষ্ণ আর লাল!
মা কাঁদতে শুরু করলেন, আমার কলিজাটা তো কবেই তোদের দিয়ে দিয়েছি,
এখন আমি কলিজা কোথায় পাই? কী নিয়ে যাই আমি মানবিক মিছিলে
আমি কি স্বার্থপরের মতো কিছু না দিয়েই মরে যাবো!
সবাই যখন ভালোবাসার উৎসবে মেতে উঠেছে, আহা,
সে সময় আমার কলিজাটা পৃথিবীর হাতে তুলে দিতে পারলাম না
মা ভালোবাসার পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে দেখতে কেমন পাগলপারা হয়ে গেলেন।
ছটফট করতে করতে তিনি বুক চাপড়াতে লাগলেন। অতঃপর চোখ বুজলেন।
ততক্ষণে আশেপাশে একজন আরেকজনের কলিজা ছিঁড়ে নেয়ার উৎসবে মেতে উঠেছে।
পৃথিবীর মাটি ভরে গিয়েছে থকথকে ছিন্ন ভিন্ন কলিজায়।
হাসছে জোকার পর্লামেন্ট
হেনরী স্বপন
নিষিদ্ধ রাজনীতির মতো
ব্রা পেন্টি পেটিকোট
এইসব অন্তর্বাস:
খুলে বেরুচ্ছে বর্বরতা—
নকল মোড়কে
লিঙ্গের উত্থান ছড়াচ্ছে
উত্তেজিত যৌনতার সেন্ট!
পুরনো যে বিপ্লব ঝুলে আছে,
বেওয়ারিশ লাশের কাঁধে—
নকশাল পাহাড়;
ডাইনোসর যুগ দেখে—
হাসছে জোকার পর্লামেন্ট…!
অন্ধত্ব
জিললুর রহমান
সবসময় বিভ্রম জাগায় দৃষ্টি।
যতটুকু দেখি, তার দূরের জগত
সম্পর্কেই আমি অন্ধ।
অথচ দূর আকাশে জেগে ওঠা চাঁদ
কিংবা তারা নজর এড়ায়নি।
চশমা নিয়ে যতটুকু দেখি,
চশমা খুললে তার অনেক কিছুই
দেখতে পাওয়া যায় না।
ত্রিমাত্রিক জগতে নিবাস,
দেখি না চতুর্মাত্রার সময়-ভ্রমণ,
অথবা পঞ্চম ষষ্ঠ মাত্রা —
যেখানে নিজের অন্য জীবনের সাথে
দেখা হতে পারতো নতুন জীবনের।
প্রস্তর বা মিসাইল ক্ষেপণ যেমন দেখা যায়
অভাব তেমন করে দর্শনীয় হয় না কখনো।
শিউলি ও শেফালি
শিবলী মোকতাদির
কোনো লুকোচুরি নেই,
স্থানে অস্থানে পড়ে আছে পঙ্ক্তিনির্ভর সজ্জিত শরৎ।
দূরে স্থাপত্য যুদ্ধের উসকানি, বাতাসে গুলির শব্দ
শিশির ভেদ করে ছুটে যাচ্ছে সীসা।
স্থির থাকো, কাউকে দিয়ো না গুপ্তহত্যার নথি।
এখনো জাগেনি গোলাপ,
সংগীত ভেঙে সুরের সহস্র ধারায়
ধীরে ধীরে আমার প্রচ্ছদে নেমে আসো।
প্রযত্নে যা-কিছু পাঠাই— চাঁদ জানে ।
প্রলয়সন্ধ্যা আলোকিত করে ফিরেছে কোরক
রাশি রাশি পরিযায়ী পাখির স্বরূপে।
আশ্বিন—এ কেমন আশ্চর্য ঠিকানা তোমার !
দুঃস্বপ্নেও যদি বৃষ্টি নামে,
বনপুলকের গন্ধে কোথায় লুকাবে মুখ বিভ্রান্ত বালক!
দপ্তরবিহীন আলাভোলা এই ঋতু
তবু দোষ দেবে— শিউলি কেন শেফালি হয়ে ঝরে?
দাদীমার কথা
খলিল মজিদ
তার মৃত্যুর দুই যুগ পর জন্ম আমার
আর তাকে অনুভবে পেতে কেটে যায় আরো এক দীর্ঘ যুগ
ততদিনে তার কবরের ঘাস অচিহ্নিত সাধারণ
গুল্মের মর্যাদা পেয়ে যায়, ততদিনে বজরার গলুই থেকে
পিতলের চকচকে ময়ুরগুলো মজে যায়
তার না থাকারও একটা বর্ণ আছে
কোনো কোনো ভোরে হালকা বেগুনী রঙের কুয়াশা
আমাদের বাড়ি ঘিরে থাকে,
যেন সে অস্তিত্বমান অর্ধশতাব্দীর শরৎকাল জুড়ে
যেন সে আগের জন্মের ভগ্নি আমার
যে জন্ম ফুটেছিল নিরব সবুজে, ঘাসে, জ্যোৎস্নায়—
সাংসারিক টানাপোড়েনের মধ্যে তিনি হয়তো
খুব ধীরে ধীরে তার যৌবন হারিয়েছিলেন।
তার হারিয়ে যাওয়া নামের ভস্ম থেকে
হঠাৎ কোন স্ফূলিঙ্গ জ্বলে ওঠে যদি
জোছনায় নিহত গোলাপের ভূতপূর্ব বিবাহবাসরের সুগন্ধ
যদি ছড়িয়ে পড়ে অসমাপ্ত বসন্তের গুঞ্জনে,
তবে আসন্ন হেমন্তে তাকে আমি পেয়ে যাব
অগ্রিম শীতের আকুতিতে।
মৃত্যুর তিন যুগ পরেও স্ত্রীলিঙ্গ ঘোচেনি তার
আজো তাকে আমরা কল্পনা করি
একটি মোমবাতির রূপকে, দাদার কবরে
যে সান্ধ্যপ্রদীপ হয়ে জ্বলে।
একটি স্লিপ
আলফ্রেড খোকন
অনন্তকাল, মৃত্যু এবং পুনুরুথ্থান নিয়ে
বড় কোনো অহংকারের দরকার নেই;
এই সময়ে এ কথাটি বলাই যথেষ্ট যে—
আমি তার হাতে সিনেমার টিকিটের মত
একটা স্লিপ—
যে কোনো মুহূর্তেই ছিঁড়ে ফেলা যায়
অনুগল্প
সেঁজুতি বড়ুয়া
তোমার জুতোর অন্তিমে
পায়ে পায়ে এগোয় ভবিষ্যত
খোলে অতীতের গিঁট
ক্রমাগত স্মৃতির অন্ধকারে
তোমার হাঁটার ত্রস্ত ভঙ্গিতে
ভিখারিনী, এলো চুল মহাকৌতুকে
‘ফু’ দেয় নিঃসঙ্গ বাতাসের পিঠে
যেন সে তোমার গোলাপ সুন্দরী!
সময় তখন ছিপ ফেলে জনশূন্য পথে
জাগতিক অনুগল্পে তুলে নেয় নিঃশব্দ স্মৃতি
আর তুমি হেঁটে যাও ঘৃণা, অনাদরে
পাগলিনী হেসে খুন, চোখে স্ফূলিঙ্গ ঝরে…
অকালের ঘুণ
রিমঝিম আহমেদ
গৃহচ্যুত হতে পারি
তবে কেনই বা হব?
সমস্ত ইশারা যদি ভ্রম হয়
কোথায় দাঁড়াব!
পাপড়ি আর ফুলে
কখনো বিবাদ হয়, ঝরে
যদি হয় চিরবৃন্তুচ্যুত
সবকিছুই অনধিকারে!
আম্রকুঞ্জের দিকে
চেয়ে আছে নিবিড় বিনাশ
হাওয়ার বিলাপে কাঁপে
চারদিকে সমবেত ঘাস
দৃষ্টি বহুদূর। আমি—
চৌকাঠ পেরিয়ে যাই থেমে
ঈশ্বরের একাকিত্ব ছুঁয়ে
অকপট ডাকে না পরমে…
তৃতীয় পাতা( বহির্বিশ্বে বসবাসরত বাংলাদেশি কবিদের কবিতা)
———————————————————————
মহাকর্ষীয় বিভব
কাজী আতীক
শুধু নাটাই হাতে বিমর্ষ, যেন বিঘ্ন সময়!
ঘুড়িটা হয়তো দমকা বাতাসে দিক্বিদিক
যখন আকাশজুড়ে নামছে আঁধার,
ভোকাট্টা ঘুড়িটা তাঁর খুঁজে পাওয়া দুরূহ এখন।
হায়! শখের ঘুড়িটা তার,
হয়তো ভরশূন্য থেকে ভরপ্রাপ্ত আবারও,
অন্ধকারে দৃষ্টিসীমাও সংকুচিত ক্রমশ,
সম্প্রসারণ সংকোচন প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম।
বস্তুত মহাকর্ষ আসলে এক সংরক্ষণশীল বল
যা কখনো গতিপথ নির্ভর নয়, অভিকর্ষও তাই,
তবে তা কেবল পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে ক্রিয়াশীল।
জানোই তো মহাকর্ষীয় বিভব কেবলই ঋণাত্মক হয়।
খাঁচা থেকে বেরিয়ে
তমিজ উদ্দীন লোদী
খাঁচা থেকে বেরিয়ে সে দেখলো উন্মুক্ত আকাশ
নিসর্গ নমিত , সবুজে সবুজময়
ঝাপসা লোহা গলতে শুরু করেছে, কোনো এক অদৃশ্য
উত্তাপে । প্রতিটি দণ্ডে এখন তরল সুর, যে সুরে জমাট
ভাঙে রাত্রির পাতালে।
খসে পড়া পালকের নিচে জমে আছে আলোর হিম
শূন্যের বুকে আঁকিবুকি একটি চঞ্চলতা, উড়ালের
প্রতিশ্রুতি।
চোখ এখন আগুনের ভাষা শেখে, পাখা মেলে না,
তবুও গণনা করে দূরত্ব । আকাশ এখন শুধু রং নয়,
একটি শ্বাস, একটি স্পন্দন, একটি মুক্ত বর্ণমালা।
খাঁচার দরজায় কোন চাবি থাকে না, থাকে শুধু এক
গভীর ইচ্ছার নিশ্বাস । যে নিশ্বাসে গলে যায় লোহার
শিকল, আর মিলিয়ে যায় সীমানার সব সংজ্ঞা।
মৃত্যু
মাসুদ খান
এই শরতে অবাক-করা মেঘের গতিবেগ
আকাশ জুড়ে হঠাৎ ঘন মেঘের সমাবেশ।
তাদের মাঝে মুখচোরা এক পাহাড়চারী মেঘ--
ওটাই আসল, বাদবাকি সব মেঘের অবশেষ।
সেই মেঘটি, বুক ভরা যার বিনম্র বিদ্যুৎ
সেই তো আমার মেঘাস্পদ। মেঘের বিস্ফোরণ
ভাসিয়ে নেবে হড়পা বানে হঠাৎ ঢলের ভূত
গভীর গিরিখাতেই লেখা আমার সে-মরণ।
মরণ ব’লে কিচ্ছুটি নেই মেঘের সংবিধানে
মরণ থাকে অনেক নিচের বাস্তুসংস্থানে।
জীবন জাগে বারে বারে-- বদ্ধ, চক্রাকার
আপাতত মরণই সার-- স্পষ্ট, পরিষ্কার।
নিষাদপুত্র আমি
তাপস গায়েন
কাল অতিক্রম করে চলেছে মহাকাল
যেভাবে খর্ব হয়ে চলেছি আমি এই পৃথিবীতে,
আর দুঃস্বপ্ন পাড়ি দিয়ে চলেছে এই আমাকেই
পথভ্রষ্ট আমি, হারিয়ে ফেলেছি পাসপোর্ট—
যেন কখনোই দেশে ফেরা হবে না আমার
হস্তচ্যুত আমার গাড়ি ছুটে চলেছে জনারণ্যে
আমি যেন খুনের আসামী এক—
কারা যেন খুঁজে ফিরছে এই আমাকেই
দিগন্তের দর্পণে প্রতিফলিত হয়ে
এই নগরীর নাভিমূলে হেঁটে চলেছি আমি, আর
সুর্যসন্তান, যারা ছিল দীপ্ত বহুযুগ আগে
যাদের তীরে দীর্ণ ছিল এই পৃথিবী
তাদের সাথে কখনোই দেখা হয়নি আমার
আমি নই একলব্য কিংবা অহল্যার ক্রন্দন—
জেনেছি প্রতিটি ভোর
প্রতিটি কফিশপের মতোই উজ্জ্বল, প্রাতিস্বিক
হারিয়ে ফেলেছি আমি তোমার অবয়ব—
যেন এক অসমাপ্ত মহাকাল
নিষাদপুত্র আমি—
দৃশ্যান্তরে করে যাব ঈগলের কাছে এই চক্ষুদান…
দৃশ্যতঃ অদৃশ্য ক্যানভাস
শাহানা আকতার মহুয়া
গল্পগুলো অন্যরকম হতে পারত।
হয়তো রোদটা আরেকটু কম তুখোড় হতো,
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আরেকটু গভীর এবং সংবেদনশীল।
হয়তো বুকের ভেতরের এই নীরব শহরটা এমন একলা হতো না আজ।
হঠাৎ হঠাৎ পুরনো সব রোদ এসে
আড়ি পাতে শরতের জানালায় ; এবং
অনুবাদহীন সময়েরা ভীষণভাবে নিয়ে যেতে চায় তাহাদের আপন ভুবনে ----
জানালায় গাল ঠেকিয়ে দেখি আমি দূর দিগন্তরেখা ধরে হেঁটে যাওয়া একফালি মানুষ
যার ছায়া আটকে আছে
দু'টো আকাশের মাঝখানে।
জন্মান্তর
নাহার মনিকা
খোলাচুল মেয়ে তুমি আবার জন্মাও!
অধিত্যকার ব্যাস ছাড়িয়ে অমল ঝর্ণায়
পলিমাটি মেজে ধোও লীলাময় কেশ
লহমায় টান দাও ধেয়ে আসা বিষ,
তোমার সহিস-
চড়িয়েছে ঘোড়া এই নাব্য নদীর খাঁজে খাঁজে,
উষ্ণীষে খুঁজে নাও শ্বাসরোধী নোনতা প্রনয়,
জানোই তো-
স্নানে ও সঙ্গীতে তাই জীয়নকাঠির কথা হয়!
চুলখোলা মেয়ে তুমি বাক্সবন্দী আলো
মরে গিয়ে বেঁচে ওঠো, শুষে নিচ্ছো রাত,
চাঁদ, সোজা নির্বিকারে মোহনা ভাসালো!
তুমিই তো তান-
বাণমারা থাবার এই ধারাপাত খেলা,
চুলখোলা মেয়ে তুমি ষোল ঘরে গুটি
চৌখোপে নেচে নেচে ঋতু গুনে যাও…
বিভোরের বিষ ফুঁড়ে এসো মেয়ে, আবার জন্মাও!
পটুয়া
মুজিব ইরম
তোমার সুরেলা দেহ
মুখের আদল
কতোনা এঁকেছি আমি দেশি রঙে
রাত জেগে
পটচিত্রে
নিজস্ব নিয়মে…
কাঁধে নিয়ে এই সব ছবিসুর
সুরের সুরত
গ্রামে গ্রামে গেয়ে চলি
কাহিনী জানাই…
একদিন তোমাদের ঘরে
পটচিত্রগ্রামে
পৌঁছে যাবো জানি
ডাকিবে আদর করে পটচিত্রকর
দিবে তুমি সিঁদুর কাজল
দিবে তুমি আলতার শিশি
পটের জমিন…
তোমাকে গাইবো আমি
লোকেরা বলবে হেসে দেবী কই
এতো দেখি চিরচেনা মুখ…
এই সব টিটকারি হজম করিবো আমি
আঁকিবো সুরেলা হাসি, চুলের ইশারা
আঁকিবো বিনাশী চোখ, চোখের টিশারা…
মনখারাপের দৃশ্য
রুদ্রশংকর
বৃষ্টি নেমেছে শান্ত শহরের ওপর ।
সাইনবোর্ডে ভিজে যাচ্ছে তোমার নাম
ঠিক সেই সময়
আমাদের ইচ্ছে-পাঁচিল পেরিয়ে
সন্ধ্যা আলো বুকে নিয়ে তুমি হাঁটছ।
হাঁটতে হাঁটতে, হটাৎ
রাস্তাগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে
একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে ।
আমি দেখি, প্রতিটি ফুল, প্রতিটি পাতা
আমার মনখারাপে ছড়িয়ে থাকা
ছোট ছোট আয়না ;
যেখানে আমি অন্য কেউ,
অন্য কোনও পরিচয়ে বেঁচে আছি
আর আমার মুখ, আমার ভালোবাসা
বৃষ্টিভেজা কুয়াশায় ধীরে ধীরে
‘তুমি’ হয়ে উঠছে।
চতুর্থ পাতা(২ টি দীর্ঘ কবিতা এবং সম্পাদকের ধন্যবাদ জ্ঞাপন)
———————————————————————
ডাকবাক্সের ঠিকানা
শামীম আজাদ
তোমার ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে
সেই কবে যাত্রা করে-
পায়ে পায়ে প্যাডেল মেরে
চনমনে ঢাকার চাঁনখাঁ’র পুল থেকে
লন্ডনের লেগুনে এসে গেছি!
ইতোমধ্যে কতজন এলো গেলো
তারা কী পরম পেলো বা পেলো না
আমারই ঘটে গেলো এ দূর্ঘটনা।
হাওয়াতে ছিল প্রচণ্ড হুজ্জতি
গাছের নিচে মাছের চোখের মতো
লাল লাল চেরী গড়াচ্ছিলো
তাড়াহুড়োতে পা হড়কে গেলো।
ঘাস খুবলে ধরতেই ...
শিশিরের বদলে এক সুশ্রী সরীসৃপ
আমার মুঠো গলে পাতা পেরিয়ে
পৎপতিয়ে নিষ্কালো
উপরে, ঐ উঁচুতেই এবং মুহূর্তেই
গা থেকে লাল সিঁদুর ছেড়ে দিয়ে
বারোয়ারী এ বৃক্ষে নিজ ঠিকানা এঁকে
আমাকে উদ্বাস্তু করে দিলো।
এখন কোথায় যাবো বলো?
কতকাল ধরে এই লিলুয়া লী নদীতীরে
আমার ইচ্ছের ফুষ্কুরিগুলো
টকটকে চেরীর মতো সুপক্ক হয়ে আছে -
বালিশের নিচে সঞ্চিত হয়েছে
বিস্তর বিহ্বলতার বিন্দু আর
সোনার সেমিজ বিরহরসে
ভিজে জবজবে হয়ে গেছে!
মনে কি পড়ে, কী ছিলো শেষ কথাটা?
বিচ্ছেদের বিরান মাঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলে,
-ভালো থেকো, আমাকে পত্র দিও,
লিখো তোমার মত করে যা তা!
মনে মনে বলেছিলাম,
-তুমি বললে বলেই আমি ভাল থাকব কিনা
সেটাও তো কথা!
সেই থেকে আমাদের দু’জনের উপরেই কিন্তু
একই আকাশ ছাদ হয়ে আছে ।
সঙ্গে আরো কত শত কোটি কোটি মানুষ
তবে এই পুরাতন আকাশই একমাত্র ঠিকানা।
তাই কি আমার চিঠি
তোমাকে খুঁজে পায়নি, প্রিয়তম?
তাহ’লে তুমিই বরং লেখো না আমাকে,
ধরে নাও এই আমার পরগনা।
তুমি লিখলেই,
এই শতবর্ষজীবী সিকামোর অথবা
পিঠের পেছনের ঐ প্লাটানস
যে কেউ আমার ডাকবাক্স হয়ে যাবে।
তোমার দানিয়ূব আমার দরিয়া হবে
এই পূরবী হবে ঐ বিভাস,
তোমার ঘুরন্ত ঘুড়ি মৌলিক ঠিকানা পাবে।
সুতোর ঐ প্রান্ত ছিঁড়ে নিলেই
উড়তে উড়তে ঠিক এসে
আটকে যাবে আমার খোঁচা খোঁচা ন্যাটেলে,
এ রক্তগাছের আশেপাশে
মানুষ ফিরে যাবে আবার
চিঠি লেখার বিস্মৃত অভ্যাসে।
ভুল হবার আশংকা নেই
পৃথিবীতে এরকম গাছ এখন একটিই,
যার নিচে নিরানব্বুই বছর ধরে
একজন আহত কবি পড়ে আছে।।
ছোট কবিতা
শামস আল মমীন
সাহিত্য সম্পাদক বললেন, ’ছোট একটা কবিতা দিয়েন কবি।’
দিন না পেরোতেই চারিদিক রাষ্ট্র হয়ে গেলো,
“বন্দুকের সামনে বুক পেতে আছে আবু সাঈদ।”
চওড়া রাস্তাটি ভয়ে জনশূন্য, বহুদিন আগে, বীর দর্পে
এই পথ হেঁটে গেছে নূরল দীন।
গন্জে গন্জে শ্লোগান ওঠে- আমার ভাই মরলো কেন?
শহরে শহরে শ্লোগান ওঠে- আমার ভাই মরলো কেন?
রংপুরে আহাজারি- অয় তো কোন দোষ করে নাই।
মায়ের পরাণ থেকে বেদনার সুর ওঠে-
” মোর বেটাক ওমরা গুলি করিল ক্যান?”
চারিদিক থেকে পায়ের আওয়াজ আসে-
ওরা আওয়াজ তোলে প্রধান সড়কে
ওরা হাঁটতে থাকে
ক্যান্টনমেন্টের প্রধান ফটক পার হয়ে গনভবনের দিকে-
সামনে এসে দাঁড়ায় ’মুগ্ধ’,” পানি লাগবে, পানি,”
মুগ্ধ ছুটতে থাকে…
টং দোকানি আর কয়েকজন রিক্সাঅলা কিছু না বুঝেই
বহমান মিছিলের দিকে তাকিয়ে থাকে,
দিন আনে দিন খায় এরকম একজন ডালাভরা সিঙারা দেখিয়ে কয়,
“খান ভাই, পয়সা লাগবে না।”
অনেকের মা এসেছে ছেলের হাত ধরে
বাবা এসেছে মেয়ের পাওনা বুঝে নিতে,
আর লক্ষ মানুষ বিভুই বিদেশে কিছু করতে না পারার
বেদনায় উদ্বিগ্ন-
পুলিশেরা যাকে ইচ্ছা ভ্যান-এ তুলছে
হাতজোড় করে বলে এক উঠতি যুবক
”বাসায় ছোট্ট একটা বোন আছে,
আমারে ছাইড়া দেন, ভাই”
বারো বছরের ’সুফি’ কি বুঝে কবিতায় লিখেছে,
” এখানে কি সব শেষ?”
পুলিশ ভ্যানে জ্যাম-প্যাক বন্দীদের ছবি এঁকে দেশ-বিদেশে
পৌঁছে দিয়েছে কিশোরী চারুলতা।
আমি কি বলে বোঝাবো ওদের, চারিদিকে-
এইসব কি হইতেছে।
যারা নিজেদের ঈশ্বর ভেবেছিল
ওরাও পালিয়েছে ভয়ে।
সকাল না হতেই, কি মমতায় ওরা গ্রাফিতি আঁকে
মেট্রোরেলের পিলারে,
দেয়ালে দেয়ালে,
শহরের গোল চত্বরে।
সম্পাদক সাহেব, কোন কোন পঙক্তি ছেটে ফেলে দিলে এই কবিতাটি
আপনার মনের মতো হয়ে উঠবে,
দয়া করে বলবেন কি?
সম্পাদকের কলম
———————————
ইব্রাহীম চৌধুরী
সম্পাদক, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা
বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে শুরু হয়েছিল 'কবিতার একপাতা'র যাত্রা। কবিতার প্রতি ভালোবাসা থেকে আমার স্বপ্ন দেখা ছিল 'প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা' পত্রিকায় একটি শুদ্ধ সুন্দর কবিতা পাতার নিয়মিত প্রকাশনা। বাংলা কবিতার বিশ্বায়ন নিয়ে লেখক, চিন্তক, কবি ফারুক ফয়সলের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। এই মেধাবী কবিতা-সংলগ্ন মানুষটির প্রতিদিনের যত্ন, চিন্তা ও শ্রম একে সাফল্যের প্রান্তে নিয়ে গেছে, নির্দ্বিধায় বলা যায়। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে বসবাসরত প্রতিভাবান কবিগণ তাঁদের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা নিয়ে আমাদের পাশে থেকেছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা যাঁদের মেধা ও নিরলস শ্রমে ‘কবিতার এক পাতা’র অঙ্গসৌষ্ঠব এত নিখুঁত সৌন্দর্যে সজ্জিত হয়ে আসছে। কৃতজ্ঞতা ‘প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা’র কার্যনির্বাহী সম্পাদক জনাব, মঞ্জুরুল হক সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে। সর্বোপরি আছেন আমাদের বিদগ্ধ পাঠক সমাজ, যাঁরা এই আয়োজনকে সার্থক করে তোলেন। আপনাদের সকলকে আমাদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
এক বুক ভালোবাসা
ফারুক ফয়সল
সম্পাদক, কবিতার একপাতা
‘কবিতার একপাতা'র সপ্তম বর্ষপূর্তি হচ্ছে চলতি সংখ্যাটি প্রকাশের মাধ্যমে। মহাকালের কাছে সাত বছর সময় কিছুই নয়। কেউ কেউ মনে করতেই পারেন, মাসে একবার, একটি মাত্র পাতা, বছরে বর্ষপূর্তিসহ গোটা তিন, চারেক স্পেশাল ইস্যু, এ আর এমন কি? সত্যিই খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু বাংলা কবিতার এই এক পাতা হাতে নিয়ে বিশ্ব কবিতার দরবারে নিয়ত কড়া নাড়ার কাজটি নিশ্চয়ই সহজসাধ্য নয়।
স্বদেশ থেকে বহুদূর সাত সমুদ্র পাড় হয়ে এক বহুজাতিক ও বহু ভাষাভাষীর দেশে এক কঠিন
বাস্তবের পাথর শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব বাংলায় বাংলা কবি ও কবিতার সম্মিলন ঘটানোর স্বপ্ন দেখেছিলাম। পথটি সরল ও মসৃণ নয়। নানা বাধা বিঘ্ন পায়ে পায়ে। আমরা দমিনি। তার প্রমাণ গত সাত বছর। বাংলা ভাষার সেরা কবিগণ আমাদের যাত্রাসঙ্গী। তাঁদেরকে আমাদের ভালোবাসার আলিঙ্গন। বন্ধু প্রাবন্ধিক ও গবেষক-আহমাদ মাযহার এবং ‘নিসর্গ’ সম্পাদক সরকার আশরাফকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ধন্যবাদ। বাংলা কবিতার অগ্রসর পাঠক ও ‘কবিতার একপাতা’র শুভাকাঙ্খীদেরকে ভালোবাসা ও নিরন্তর শুভ কামনা।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন