https://www.prothomalony.com/
15104
decoration
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ০০:০৬
“দেশর ভাই শুক্কুর মোহাম্মদ!”—এই এক সংলাপে যেন ক্যালিফোর্নিয়ার নীল আকাশের দরজা খুলে গেল। আলিঙ্গনে টেনে নিলেন কালী প্রদীপ চৌধুরী—আমাদের দেশের ভাই, সিলেটের সন্তান, বাংলাদেশের গৌরব।

লস এঞ্জেলেসের বিকেলটা ছিল উষ্ণ অথচ প্রশান্ত। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের মিষ্টি রোদে বাতাসে শরতের হালকা গন্ধ। শহরের পশ্চিম প্রান্তের সোনালি আলোয় নরমভাবে ঝিলমিল করছিল বিলবোর্ড আর পামগাছের সারি। আমরা তিনজন—আমি, সাংবাদিক হেলাল উদ্দীন রানা, আর সঙ্গী সৈয়দ নাসির জেবুল। গন্তব্য এক কিংবদন্তি মানুষ, যার নামেই রয়েছে হেমেট শহরের এক মোড়ের নাম—“চৌধুরী সার্কেল।”
আমাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—দেখা করা সেই মানুষটির সঙ্গে, যিনি শুধু একজন সফল উদ্যোক্তা নন, তিনি এক প্রেরণা। সাফল্যের এক কিংবদন্তি উপাখ্যান—ড. কালী প্রদীপ চৌধুরী।
লস এঞ্জেলেস শহরেই বিশাল এক স্থাপনা—SoFi Stadium। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার আধুনিক স্থাপত্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। ৭০,০০০ আসনবিশিষ্ট এই স্টেডিয়ামটি যেন নিজেই এক নগর। যার ছাদে প্রতিদিন সূর্যের আলো গলে সোনালি পর্দা তৈরি করে। আমেরিকার ন্যাশনাল ফুটবল লিগ (NFL)-এর দুটি দল—লস এঞ্জেলেস র্যামস ও চার্জার্স—এখানেই খেলে। গ্লাস আর স্টিলের এই স্থাপত্য যেন ভবিষ্যতের নগরচিত্রের ইঙ্গিত। যেখানে আলো, শব্দ আর মানবসম্ভাবনা একসাথে নাচে। এর পাশেই গড়ে উঠছে নতুন স্থাপনা—‘কালী টাওয়ার’। সোফি স্টেডিয়ামের স্থাপত্য দৃশ্যকে যেন ম্লান করে উঠে দাঁড়িয়েছে এক বাংলাদেশির গর্বের টাওয়ার।
স্টেডিয়ামকে পেছনে ফেলে আমরা এগোচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন সাফল্যের কোনো দিগন্তে যাত্রা করছি। পথে জানতে পারলাম, ড. চৌধুরী আমাদের স্বাগত জানাতে নিজেই এস্কোর্ট পাঠিয়েছেন। এতটা যত্ন আর সৌজন্য কেবল প্রভাবের কারণে নয়—ভালোবাসা থেকেই। “দেশর ভাই আসছে”—এই খবর শুনে তিনি সেদিন লস এঞ্জেলেসের মেয়রের ডিনার বাতিল করেছিলেন।
দরজায় দাঁড়ানো মানুষটি যখন আমাদের সামনে এলেন, চোখে পড়ল এক প্রশান্ত মুখ। হাসিতে মিশে ছিল এক অদ্ভুত মমতা। বললেন, “দেশর ভাই আইছে, আমি কেমনে না দেখা করি?” তাঁর কণ্ঠে সিলেটি ভাষার মাধুর্য, যেন সেই টানেই সময় পেরিয়ে যাই শেকড়ের কাছে। বিনয় আর আভিজাত্যের সংমিশ্রণ তাঁর আচরণে।
কথা উঠল তাঁর তরুণ বয়সের, এমসি কলেজের দিনগুলোর। তিনি বললেন, “ওই সময়টা ছিল আমার শেকড় গজানোর সময়।” আমি হেসে বললাম, “আপনি কলেজে ভর্তি হন যখন, আমি তখন সবে জন্মেছি।”
পাশে বসা হেলাল রানা মজা করে বললেন, “তাহলে আপনি তো আমাদের তিন প্রজন্ম আগের মানুষ।”
নাসির জেবুল তাঁর শ্বশুরের বন্ধুত্বের গল্প তুলতেই আমি বললাম, “শ্বশুর পক্ষ থেকে পাওনার আশা করা হচ্ছে মনে হয়!”—হাসিতে ভরে গেল ঘর।
আমি তাকিয়ে দেখছিলাম—এই মানুষটি, যিনি সাফল্যের চূড়ায়, তবু বিনয়ের আলোয় দীপ্ত। তাঁর চোখে ছিল দীপ্তি, চিন্তায় তারুণ্য, কথায় আভিজাত্য। কালী প্রদীপ চৌধুরী জানালেন, “আমার ২৩ প্রজন্মের টিকুজি জানি আমি।” আমরা বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকালাম। যখন আমরা নিজেদের দুই-তিন প্রজন্মের তথ্যই ভুলে গেছি, তিনি একটিও নাম হারাননি। তাঁর কণ্ঠে ইতিহাসের ছন্দ—বাবা, ঠাকুরদাদা, জমিদার পূর্বপুরুষ—সবাই যেন তাঁর স্মৃতির মণিমুক্তা।
১৯৮৬ সালে বাবাকে হারান। সম্প্রতি প্রয়াত স্ত্রী সুনন্দা চৌধুরীর প্রসঙ্গ উঠলে চোখে নেমে এল এক নিঃশব্দ শোক। তারপরও তিনি বললেন, “দুঃখের কথা না বলি, সুখের কথাই বলি।” —এই এক বাক্যে যেন তাঁর জীবনের দর্শন ধরা পড়ে।

বাংলাদেশের সিলেট জেলার ঢাকাদক্ষিণ জমিদারবাড়িতে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই বড় কিছু করার স্বপ্ন।
এমসি কলেজের পর কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস, তারপর মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, কানাডা—শেষমেশ আমেরিকা। তখন তাঁর পকেটে ছিল মাত্র ৮ ডলার, কিন্তু মনে ছিল পাহাড়সম স্বপ্ন। তিনি একদিন এক হাসপাতালের প্রশাসককে বলেছিলেন, “একদিন এই হাসপাতালটা আমি কিনব।” প্রশাসক হেসেছিলেন। কিন্তু এগারো মাস পর, কালী প্রদীপ সেই হাসপাতালেরই কর্মী—এবং অচিরেই তার মালিক!
সেখান থেকেই শুরু KPC Group-এর যাত্রা। আজ তাঁর ব্যবসা বিস্তৃত ২৫টি খাতে—স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রিয়েল এস্টেট, কৃষি, প্রযুক্তি, শক্তি ও পরিবহনসহ। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মানবিক হৃদয়। ২০১৮ সালে অপরাধের শিকারদের সহায়তার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “Above and Beyond Resource Center,” যা তাঁকে এনে দেয় Above and Beyond Award।
২০০২ সালে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন তিনি। তখন স্মরণ করেছিলেন দাদুর গল্প—ব্রিটিশ ভারতে এক ভয়াবহ বন্যার পর দাদু ২০০০ একর জমি দান করে গড়েছিলেন “কালী কৃষ্ণপুর” গ্রাম। “দাদুর চোখের দ্যুতি আমি আজও দেখি,” বললেন তিনি। সেই উত্তরাধিকার থেকেই শিক্ষা নিয়েছিলেন। আজ তাঁর মালিকানায় ৬০০০ একর জমিতে গড়ে উঠছে এক নতুন শহর— “Kalifonia।” নিজের নামে শহর গড়ার সরকারি অনুমোদন পেয়েছেন তিনি—যা আমেরিকার ইতিহাসে এক বিরল সম্মান।
হলিউড পার্কে নির্মাণাধীন “Kali Hotel & Rooftop”-এর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এটি কেবল একটি হোটেল নয়—এক স্বপ্নবাজ মানুষের প্রতীক। ১৩ তলা ভবনে থাকবে ৩০০ কক্ষ, ৩৪টি স্যুইট, ২০,০০০ বর্গফুটের কনফারেন্স হল, তিনটি রেস্তোরাঁ, স্পা, যোগ ডেক ও আধুনিক ফিটনেস সেন্টার। ড. চৌধুরী বললেন, “আমরা একটি হোটেল নির্মান করছি, পাশাপাশি এক অভিজ্ঞতা গড়ে তুলছি। যেখানে লস এঞ্জেলেসের আত্মা, সংস্কৃতি আর শিল্প মিশে যাবে আতিথেয়তার প্রতিটি পরতে।”
সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছিল পশ্চিমে। কাঁচের দেয়ালে পড়া আলোয় ঝলমল করছিল ভবনটি। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিলাম—সেই আলোয় প্রতিফলিত কে পি চৌধুরীর মুখ। এক অদ্ভুত গর্বে ভরে উঠছিল মন। কেবল সাফল্যের নয়—এক মানুষের নিরব সাধনার প্রতিচ্ছবি যেন সেই আলোয় ফুটে উঠেছিল।
দেশের কথায় তাঁর চোখ ঝলমল করে উঠল। বললেন, “আমার শিকড় সিলেটের ঢাকাদক্ষিণে। গোলাপগঞ্জ উপজেলার দত্তরাইল গ্রামে। আমরা এখনো একান্নবর্তী পরিবার—৪০০ পরিবারের অনেকেই একসাথে থাকি, খাই, হাসি।” দেশের, পরিবারের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধরে রাখার এ এক অনন্য দৃষ্ঠান্ত।
পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বাতিলের প্রসঙ্গ এল আলোচনায়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথা স্মরণ করলেন শ্রদ্ধাভরে। তাঁর আহ্বানে দেশে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশে বিশ্বের উচ্চতম ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। এ পরিকল্পনা নিয়ে ৩৯ বার বাংলাদেশ সফর করেছেন। নানা বাঁধায় তাঁর সে উদ্যোগটি সফল হয়নি। দেশে স্বপ্নের ভবন না গড়ার প্রসঙ্গ উঠতেই নীরব হলেন। চোখে ভেসে উঠল চাপা বেদনা। তিনি কাউকে দোষারোপ করলেন না, কিন্তু বুঝিয়ে দিলেন—বাংলাদেশে ইচ্ছে করলেই, সামর্থ থাকলেই সব স্বপ্ন পূরণ করা যায় না। কাজটি কখনই সহজ নয়। আলাপের পুরো সময় জুড়ে ছিল তাঁর দেশের প্রতি ভালোবাসা, মাটির টান, আত্মীয়তার উষ্ণতা।
ক্যালিফোর্নিয়ার আলোচিত প্রকল্প Oceanwide Center–এর কথাও তুললেন তিনি। আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে এই বিলিয়ন ডলারের স্থাপনা এখন থমকে আছে। “It is big, it will be billions of dollars deal!”—বললেন তিনি আশাবাদী কণ্ঠে। চীনা কোম্পানি সরে যাওয়ায় প্রকল্পটি থমকে দাঁড়ায়। বিশ্বের ২৯ জন বিনিয়োগকারী প্রকল্পটি হাতে নেয়ার চেষ্টা করছেন। বাছাই পর্যায়ের মাত্র তিনজনের মধ্যে এখন শোভা পাচ্ছে কে পি চৌধুরীর নাম। এ প্রকল্পটিই হয়ে উঠতে পারে এক বাংলাদেশি আমেরিকান কালী প্রদীপ চৌধুরীর সিগনেচার অর্জন।
নিজের সাফল্য আর কর্ম নিয়ে প্রচার চান না। তাঁর কথা, “আমি বাংলাদেশি—এটাই আমার প্রথম ও শেষ পরিচয়।” এটি যেন শুধু উচ্চারণ নয়—এক বিশ্বাস, এক অঙ্গীকার। দুই ঘণ্টার বেশি সময় দিলেন। কোনো মার্কিন মিলিয়নেয়ারের কাছে “দেশর ভাই” পরিচয়ে এমন সময় প্রাপ্তি সত্যিই বিরল ঘটনা।
ফিরছিলাম আমরা। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল, লস এঞ্জেলেসের আলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে। গাড়ির জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম—কালী হোটেলের কাঁচের দেয়ালে পড়ছে দিনের শেষ রোদ। আমি তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, সাফল্য নয়, এই মানুষটির ছায়াটাই যেন লস এঞ্জেলেসের আকাশে বাংলাদেশের নাম লিখে দিচ্ছে।
সোফি স্টেডিয়ামের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন খর্বকায় এক বাংলাদেশি—কিন্তু তাঁর ছায়া আকাশ ছুঁয়েছে।
ড. কালী প্রদীপ চৌধুরী—আবারও বলছিলেন, “আমি বাংলাদেশি, এটাই আমার প্রথম ও শেষ পরিচয়।”
সাজসজ্জা থেকে আরো পড়ুন