https://www.prothomalony.com/
14956
new-york
নিউ ইয়র্কে শহরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বা আইনশৃঙ্খলা লঙ্ঘন করা-কতটা যুক্তিগত, তা বোধকরি একজন সাধারণ মানুষকেও ভাবতে বাধ্য করবে। এই শহর বহু জাতি ও সংস্কৃতির মিলনস্থল, যেখানে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকৃত। তারপরও আমাদের কেন ডিম নিক্ষেপ, গালাগালি বা হাতাহাতি করে বিরোধীদের প্রতিহত বা প্রতিরোধ করতে হয়?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র আসেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বিএনপির পক্ষ থেকে ড. মোহাম্মদ ইউনূসকে স্বাগত জানানো এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নিউইয়র্কে তাকে প্রতিহত করাকে কেন্দ্র করেই সহিংসতার সূত্রপাত। জেএফকে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ওপর ডিম নিক্ষেপ করেন আ'লীগ কর্মীরা। সেইসাথে অকথ্য গালাগালি, বাদ পড়েননি ডাক্তার তাসনিম জারা। সেই থেকেই জাতিসংঘ সদরদপ্তরের সামনে, জ্যাকসন হাইটস-এ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা-লজ্জাকর বিনোদনে পরিণত হয়। বাংলার সাধু চলিত এমন কেনো গালি বাকি নেই যা তারা ব্যবহার করেননি। মারামারি পর্যন্ত গড়িয়ে অবশেষে দুই/তিনজন গ্রেফতারও হন।
জুলাই বিপ্লবে ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর আ'লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে এসেছেন ড.ইউনূস। এখন তাকে হটিয়ে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে আ'লীগ। এতে ভারতে বসে সহিংসতা উসকে দিচ্ছেন জুলাইয়ের গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে,বি্এনপি ক্ষমতায় বসতে এক পা এগিয়ে। নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টায়, জামাতের সমর্থন কোন দিকে গড়ায় বলা মুশকিল। এদিকে, বিগত এক বছরেও আসেনি জণগনের প্রত্যাশিত সংস্কার। এমন পরিস্থিতিতে, দেশে যেমন উত্তেজনা বিরাজ করছে, নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও উত্তেজনা আছে, মতপার্থক্য আছে-এটাই স্বাভাবিক। লীগ পরিবর্তন চাচ্ছে, তাদের অধিকার আছে নিজ নেত্রীকে ফিরিয়ে আনতে মিছিল সভা প্রচারের। আবার যাদের কাছে একই নেত্রি বর্বর বলে প্রমাণিত, তাদেরও অধিকার আছে সমালেচনা করার।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আমরা নিউ ইয়র্কে কেন সহিংস হচ্ছি? আমরা যারা বিদেশে বাস করি, তারা কেবল নিজেদের ব্যক্তি বা দলের পরিচয় বহন করি না, বরং বাংলাদেশ এবং বাঙালি সংস্কৃতি-এর প্রতিনিধি। নিউ ইয়র্কের মতো জায়গায় আমাদের প্রতিবাদ, সমাবেশ বা মতবিনিময়ে গণতন্ত্র, সহনশীলতা, ও যুক্তির প্রতিফলন থাকা উচিত। আমাদের কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে বাঙালিরা শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম।
তা না করে আমরা রাজনৈতিক প্রতিবাদের নামে হামলা, ভাঙচুর এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছি যা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। প্রবাসী হিসাবে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো স্থানীয় আইনকে শ্রদ্ধা করা। ভিনদেশে সহিংসতা করে আমরা আন্তর্জাতিক মহলে শুধু দেশের সম্মানই নয়, প্রবাসী বাঙালি সমাজের সুনামও ক্ষুণ্ণ করছি। এটি প্রমাণ করে যে আমরা ভিনদেশে থেকেও গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের মত প্রকাশ করতে শিখিনি।
জারার প্রসঙ্গ টানতেই হয়। লীগকর্মী "পুরুষ" ভাইদের মুখে তাকে "খা*ন*কি-মা*গী" বলা-আমাকে অবাক করেছে। আমার জানামতে এই শব্দটি সাধারণত যৌনকর্মী বা পতিতা বোঝাতে ব্যবহৃত হত। পরে এই শব্দগুলোকে সামাজিক অপমান করার অস্ত্র বানানো হয়েছে, বিশেষ করে নারীদের উদ্দেশে। যদি যৌক্তিক দিক থেকে বলি, তবে এই শব্দের সাথে জারার ব্যক্তিত্ব, স্বভাব, চরিত্র কোনটারই মিল নেই। যদি নৈতিক ও মানবিক দিক থেকে বলি, তবে কোনো ভদ্র, শিক্ষিত এবং সভ্য মানুষ এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে পারে না। এই শব্দ অত্যন্ত অশ্লীল ও নারীবিদ্বেষী গালি। সবশেষে, কোন যৌনকর্মীকেও এই গালি দেবার অধিকার আমাদের কারো নেই।
বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণা থেকে জানা যায়, ওভার-স্টিমুলেশন, রাগ, হতাশা, দলীয় বিভাজন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক-সামাজিক অপমানের সংস্কৃতি এবং "আমিত্ব" বা পরিচয় সংকটে মানুষ বেশি অপমানসূচক ভাষা(গালি) ব্যবহার করেন। আরো উল্লেখযোগ্য হল-নার্ভ-স্ট্রেস। মানসিক চাপ, ফ্লাইট-অর-ফাইট প্রতিক্রিয়া, হতাশা আপোষহীন ও আগ্রাসী ভাষায় ওঠে আসে গালি। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, "বিষয়বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত আবেগ, দলীয় মোহ কিংবা সামাজিক প্রতিফলন" একত্রে হতাশা, ক্ষোভ, ও নোংরা ভাষার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। যারা গালি দেন, তারা নিজের অক্ষমতা, আত্মঘাত, বা কম সংযম প্রকাশ করেন-এটাই বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের যৌথ ব্যাখ্যা।
মনোবিজ্ঞানীরা গালিগালাজ ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, এই ভাষাটি আমাদের মস্তিষ্কে স্বাভাবিক ভাষার প্রক্রিয়াকরণের চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করে, অর্থাৎ গালিগালাজ আসলে মানুষকে শারীরিক ব্যথা সহ্য করতে সাহায্য করতে পারে। আঘাত পেলে বা প্রচণ্ড চাপে গালি দিলে তা মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলে, যা 'ফাইট-অর-ফ্লাইট' প্রতিক্রিয়াকে জাগায় এবং এটি অ্যাড্রেনালিন এবং এন্ডোরফিন (ব্যথা উপশমকারী প্রাকৃতিক উপাদান) নিঃসরণ ঘটাতে পারে। অপ্রত্যাশিত, হতাশাজনক বা চাপের পরিস্থিতিতে গালিগালাজ তাই মানুষের রাগ, হতাশা বা ভয়কে দ্রুত বাইরে প্রকাশ করে-যা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হয়।
মনোবিজ্ঞানের গবেষণায়, আমরা পরিবারের মধ্যে এমন একটি পুনরাবৃত্ত আচরণপ্যাটার্নে জন্মগ্রহণ করি, যা আমাদের শিখায় কিভাবে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়। ফ্যামিলি থেরাপিস্ট ডেভিড ক্যান্টর তাঁর গবেষণায় এই ধারণাটি নিয়ে বলেছেন, প্যাটার্নগুলো মূলত পরিবারকে সমর্থন করার জন্য তৈরি হলেও অনেক সময় এগুলো তাদের আসল উদ্দেশ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয়-যা পরিবারে দুঃখ, লজ্জা, হতাশা ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই অনুভূতিগুলো আমাদের মস্তিষ্কের 'থ্রেট ব্রেন' থেকে উদ্ভূত হয়, যা অসংগঠিত, বিরক্তিকর ও বিরোধপূর্ণ আচরণের কারণে সৃষ্টি হয় এবং আমরা এই প্যাটার্নগুলো অবচেতন বা ইমপ্লিসিট মেমরিতে ধারণ করি যা বৃদ্ধ বেলায়ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে।
সাইকিয়াট্রিস্ট রনি লেইং তাঁর বই "The Politics of the Family" এ উল্লেখ করেছেন, যে পরিবারে এই জাতীয় আচরণ আসলে ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অর্থাৎ, পরিবারে গালির রেওয়াজ থাকা মানে সেই পরিবারে নেতিবাচক সম্পর্কের মাত্রা বেশি থাকা এবং পারস্পরিক যোগাযোগের অস্বাস্থ্যকর প্যাটার্ন গড়ে ওঠার প্রভাব থাকে। গালি সাধারণত রাগ, অবমাননা বা হতাশার আবেগপ্রকাশের মাধ্যম হলেও, অনেক সময্ এটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগের অভাবের দিক নির্দেশ করে। এটি ঘটে যখন পরিবারে সদস্যরা নিজেদের আবেগ এবং চাহিদা সুস্থভাবে প্রকাশ করতে পারে না, ফলে তারা গালি বা অপমানজনক ভাষাকে নিজেদের রক্ষা বা নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন। এই ক্রমিক 'অস্বাস্থ্যকর পুনরাবৃত্ত আচরণ' পারিবারিক বন্ধনকে যেমন দুর্বল করে, সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মধ্যেও দূরত্ব তৈরি করে এবং মানুষের মধ্যে অপরাধবোধ, শাস্তির চেতনা, হতাশা ও বিষণ্নতা বৃদ্ধি করে।
মনেবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, গালির রেওয়াজ পরিবারে মানসিক চাপ, আতঙ্ক-প্রতিক্রিয়া এবং বড় ধরনের মানসিক রোগের উদ্ভাবন ঘটাতে পারে, কারণ এটি ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তাবোধ হ্রাস করে এবং 'থ্রেট ব্রেন' সক্রিয় রাখে, যা জীবনে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমন পরিবেশে মানুষ তার নিজের পরিচয় ও মূল্যায়ন নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, যা ভবিষ্যতে তার সম্পর্ক ও যোগাযোগের গুণগত মান কমিয়ে দেয়।
সারমর্ম হল-রাজনৈতিক প্রতিবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্রতিবাদের ভাষা কেমন হবে, তা আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। একটি শক্তিশালী প্রতিবাদ হলো যা তথ্য, যুক্তি, এবং মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা চালিত হয়। প্রতিবাদের ভাষা হতে হবে মার্জিত, তীক্ষ্ণ এবং লক্ষ্যভেদী, কিন্তু কখনোই অশালীন বা আক্রমণাত্মক নয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে বহুজাতিক সভা-সমাবেশে, প্রতিবাদের ভাষা হয় যুক্তিনির্ভর, শালীন এবং সুস্পষ্ট। প্রবাসে অবস্থানরত রাজনৈতিক কর্মীরা তাদের দাবী ও মত প্রকাশে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, বৈধ স্লোগান, যুক্তিবিন্যাস এবং লিখিত বিবৃতির মাধ্যম ব্যবহার করেন।
কিন্তু আমাদের বাঙালি কমিউনিটিতে, দুই দলের সদস্যরা কটূক্তি, গালি ও সরাসরি হতাহাতি করেছেন। গালিগালাজ ও নোংরা ভাষা ব্যবহারে 'শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ' কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়ছে এবং ব্যক্তির দৈন্যতা, অসহিষ্ণুতা ও যুক্তির অভাব প্রকাশ পাচ্ছে। এসব কেবল রাজনৈতিক সংস্কারকে বিতর্কিত করছে না, বরং বাঙালি জাতির সামাজিক এবং নৈতিক মানদণ্ডকে নিচু করছে,বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিপত্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
সাম্প্রতিক নিউইয়র্কের সহিংস ঘটনা রাজনৈতিক আদর্শগত বিভাজনের বহিঃপ্রকাশ হলেও, যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিবাদ বা মতবিনিময়ের মানদণ্ড থেকে যথেষ্ট দূরে। প্রবাসী বাঙালিরা শান্তিপূর্ণ এবং যুক্তিশীল প্রতিবাদের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে দেশের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন। মনে রাখা দরকার যে, অশ্লীল ভাষা, গালিগালাজ বা শারীরিক সংঘাতের মাধ্যমে কোনও শক্ত অবস্থান বা ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং নিজেদের অসহিষ্ণুতা ও অনৈতিহাসিক চরিত্রের পরিচয় তুলে ধরা হয়, যা জাতিগতভাবে ক্ষতিকর।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন