https://www.prothomalony.com/
14840
opinion
ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য সফর: সম্পর্ক, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৩:৪৫
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফা যুক্তরাজ্য সফর। এ সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক, বাণিজ্য, সমাজ ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ঠান্ডা যুদ্ধ, ন্যাটো জোট কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি বিনিময়—সবক্ষেত্রেই এই দুই রাষ্ট্রকে একসাথে দেখা যায়। তবে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনৈতিক শূন্যতা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার থেকে বেরিয়ে এসে লন্ডন নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্র সেই জায়গা পূরণ করতে পারে। ট্রাম্প এ সফরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে চুক্তি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে নানা জটিলতা। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ব্রিটিশ কৃষি বাজার ও স্বাস্থ্য খাতকে উন্মুক্ত করা হোক। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য বিশেষ করে তাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) কে কোনোভাবেই মার্কিন করপোরেশনের হাতে তুলে দিতে চায় না।
এই দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। কারণ বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশ নেয়, তখন গার্মেন্টস, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা ওষুধশিল্পের মতো কৌশলগত খাতকে রক্ষা করা জরুরি। যুক্তরাজ্যের মতো আমাদেরও জানতে হবে কোন খাতে আপস করা যায়, আর কোন খাত একেবারেই অর্পণযোগ্য নয়।
ট্রাম্পের সফর ব্রিটিশ সমাজকেও নাড়া দিয়েছে। তরুণ ও প্রগতিশীল অংশের বড় অংশ তাকে স্বাগত জানায়নি। তারা মনে করে, ট্রাম্প বিশ্ব রাজনীতিকে বিভক্ত করছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে অবহেলা করছে। অন্যদিকে রক্ষণশীল ও প্রবাসী সমাজের কিছু অংশ তাকে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক মনে করে। এই বিভক্ত প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়—কোনো নেতার জনপ্রিয়তা বা অজনপ্রিয়তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক নির্ভর করে পারস্পরিক স্বার্থ ও জনগণের প্রত্যাশার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য এ জায়গাটাও শিক্ষা। আমরা যেসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই, সেখানে কেবল সরকারের সঙ্গে নয়, বরং জনগণের ভেতরও ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করা প্রয়োজন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা সেখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এক বিশাল শক্তি। তাঁদের উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ককে গভীর করতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিক থেকেও এই সফর তাৎপর্যপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার আগ্রাসন এবং চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একই কাতারে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্য শেষ পর্যন্ত আমেরিকার চাপ মেনে হুয়াওয়ের ৫জি প্রযুক্তি বাতিল করেছে। এখানেও বাংলাদেশের শিক্ষা নেওয়ার জায়গা আছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বে আমাদেরও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখতে হচ্ছে। একদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), অন্যদিকে মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল—এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা ছাড়া বিকল্প নেই।
তবে সমস্যা কম নয়। ট্রাম্পের নীতির অনিশ্চয়তা ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন করছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ ইস্যুতে আমেরিকার উদাসীনতা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি করছে। বাণিজ্যে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। আর ব্রিটিশ জনগণের ভেতরে ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব সম্পর্ককে আরও জটিল করছে।
তবুও সম্ভাবনার জায়গা অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনীতির শূন্যতা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বড় সহায়ক হতে পারে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও প্রযুক্তি বিনিময় আরও বাড়তে পারে। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য যৌথ উদ্যোগ নিতে পারে। বৈশ্বিক সংকটে দুই দেশ একসাথে নেতৃত্ব দিলে বিশ্বের ভারসাম্য আরও সুদৃঢ় হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখানে কিছু সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যত দৃঢ় হবে, প্রবাসী বাংলাদেশিরা তত বেশি উপকৃত হবেন। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশও মধ্যস্থতাকারী বা সরবরাহকারী দেশ হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে। তৃতীয়ত, বড় শক্তির দ্বন্দ্বে কৌশলগত অবস্থান ঠিক রাখলে আমরা দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারি।
ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য সফর শুধুই ওয়াশিংটন ও লন্ডনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়। এটি বৈশ্বিক রাজনীতির একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে যেমন সমস্যা আছে, তেমনি সম্ভাবনাও আছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য মূল শিক্ষা হলো—আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আবেগ দিয়ে নয়, বরং দূরদর্শিতা, হিসাব-নিকাশ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে এগোতে হয়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন