https://www.prothomalony.com/
14718
opinion
সম্প্রতি বাংলাদেশে নুরাল পাগলা নামে এক ব্যক্তিকে তৌহিদী জনতার হাতে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে কবর থেকে তুলে লাশের মুখে লাথি মেরে আগুনে পুড়ানো হয়েছে। ‘হেরেসির’ জন্য এমনকি সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল কায়েতানো রিপোলকে ১৮২৬ সালে, যিনি ছিলেন কাতালান একজন শিক্ষক এবং তার অপরাধ ছিল, তিনি স্পেনে নিজের শিক্ষার্থীদের দেইজম শিক্ষা দিচ্ছিলেন। খ্রিস্টধর্মে—বিশ্বাসের মূল কোনো মতবাদ বা ধর্মমতের সরাসরি অস্বীকৃতি বা সন্দেহ প্রকাশ করাকে হেরেসি বলা হয়, যা এক বা একাধিক খ্রিস্টান চার্চ দ্বারা সংজ্ঞায়িত। যারা হেরেসিতে পড়তেন, তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বহিষ্কার, ইনকুইজিশন, এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত প্রয়োগ করা হতো।
মধ্যযুগীয় ইউরোপে “হেরেসি” দমন ছিল ব্যাপক। ৮৯৭ সালে রোমের সেন্ট জন ল্যাটেরান ব্যাসিলিকায় অনুষ্ঠিত ক্যাডেভার ট্রায়াল-এ প্রায় নয় মাস আগে মারা যাওয়া পোপ ফর্মোসাসকে সমাধি থেকে তুলে আদালতে আনা হয়। তাকে দোষী সাব্যস্ত করে কব্জির আঙুল কেটে ফেলা হয়, পোশাক ছিঁড়ে ফেলে লাশ নদীতে ফেলা দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে ধর্মপ্রচার করেছেন, ক্যানন আইন লঙ্ঘন করেছেন, মিথ্যা শপথ দিয়ে একজন সাধারণ মানুষ থাকাকালীন বিশপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৪শ শতকে (১৩৭৭) রিফর্মেশন বিষয়ক তত্ত্ববিদ জন উইক্লিফ বাইবেলকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার কারণে লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের বিচারের মুখোমুখি হন। এরপর তার মৃত্যুর প্রায় ৪০ বছর পর (১৪২৮ সালে) দোষী সাব্যস্ত হলে তার হাড় কবর থেকে তুলে আগুনে পোড়ানো হয়, এবং ছাই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
১৫শ শতকের বোহেমিয়ার ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক, চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার জন হুসকেও আগুনে পোড়ানো হয়। তার অপরাধ ছিল, ক্যাথলিক পাদ্রি হবার পর তিনি প্রাগে প্রচার করতে শুরু করেন এবং বোহেমিয়ার ক্যাথলিক চার্চের অনেক দিকের বিরোধিতা করেন, যেমন চার্চের কাঠামো, অর্থের মাধ্যমে ধর্মীয় পদবী কেনা, প্রভুদের ভোজন এবং অন্যান্য ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়। কনস্ট্যান্স কাউন্সিলে হুসকে তার মতামত উপস্থাপনের জন্য ডেকে নিয়ে গ্রেফতার করা হয়। কাউন্সিলের সামনে মত বদলাতে চাপ দেওয়া হলেও তিনি অস্বীকার করেন এবং পরে ৬ জুলাই ১৪১৫ সালে তাকে আগুনে পোড়ানো হয়।
জীবিত কিংবা কবর থেকে মৃতদেহ তুলে পোড়ানোর বর্বরতা শুধু ইউরোপের মধ্যযুগে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ধর্মীয় উন্মাদনা, অজ্ঞতা এবং সামাজিক আতঙ্ক ছড়ানোর একটি নৃশংস হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। আজকের বাংলাদেশেও নুরাল পাগলার মৃতদেহ আগুনে পোড়ানো—যুগযুগ ধরে মানুষের অমানবিকতা ও ধর্মান্ধতার চেহারাকেই স্মরণ করায়।
বলা হচ্ছে, ৮০-এর দশকে নুরাল পাগলা নিজেকে ‘ইমাম মাহদী’ দাবি করে গড়ে তুলেছিলেন দরবার শরীফ। বানিয়েছিলেন নতুন কালেমা: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মাহদী রাসূলুল্লাহ”। কেউ বলছেন, নুরাল পাগলা ধর্মীয় অবমাননা করেছেন, গুনাহ করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত ধর্মীয় অনুভূতি এবং প্রচলিত সামাজিক নিয়মের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। এ নিয়ে বহু ইসলামী বক্তা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।
ইসলামী বক্তা মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরি বলেছেন, “নুরাল পাগলার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ন্যক্কারজনক ঘটনা। জীবনে যদি কোনো ভুল বা ধর্ম অবমাননার কাজ করেই থাকতেন, আইনের মাধ্যমে মামলা করে গ্রেপ্তার করানোই মুসলিম হিসেবে সঠিক কাজ হত। কিন্তু সে মারা যাওয়ার পর, কবর থেকে তার লাশ বের করে লাঠি মেরে, উল্লাস করে এবং তাকবিরের স্লোগান দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের বর্বরতা বাংলাদেশে আগে কখনও ঘটেনি।”
এ বিষয়ে নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেছেন, “নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে কথিত ‘ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’র লোকজন পুড়িয়ে দিয়েছে। নুরুল হক এখন মৃত। তার জীবদ্দশায় যা কিছু করেছেন তার জন্য তিনি আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবেন। কিন্তু এভাবে লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়া ইসলাম অনুমোদন করে না। এ ঘটনার মাধ্যমে মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ লঙ্ঘিত হয়েছে।”
তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজবাড়ী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অ্যাডভোকেট মো. নুরুল ইসলাম। তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “এ ঘটনা ন্যক্কারজনক। লাশ মাটি থেকে তুলে পোড়ানো আমার জীবনে আমি শুনিও নাই, দেখিও নাই। এ ঘটনাকে আমি ধিক্কার জানাই। মৃত মানুষকে পোড়ানো বা বাড়িঘর লুট করা এটা সম্পূর্ণ অন্যায় ও অমানবিক।”
কেউ কেউ বলছেন, গণঅভূত্থানের পর এই ধরনের বর্বরতা প্রতিবিপ্লবের অংশ। আমরা জানি, সমাজ যখন দীর্ঘ সময়ের শোষণ, নিপীড়ন ও অসাম্যের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে, তখন ভেতরের রোষ ও ভয় এক অদৃশ্য চাপের মতো জমে। এ সময় কিছু মানুষ মনে করে অতীতের অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়া এবং নিজেকে শক্তিশালী প্রমাণ করা জরুরি।
কিন্তু ছাত্র জনতার গণঅভূত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে এক বছর হয়ে গেল। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। এমন একজন মানুষ ক্ষমতায় আছেন যার খ্যাতি রয়েছে বহির্বিশ্বে। এই দারুণ পরিবর্তনের মধ্যেও আমরা কি দেখছি?
আমরা জানি, যখন কোনো বিপ্লব সমাজে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাসীন শ্রেণির বিরুদ্ধে তাদের শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে এবং নতুন সামাজিক বা রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করে, তখন সেই ক্ষমতাচ্যুত শ্রেণি এবং তার সমর্থকরা পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার চেষ্টায় আন্দোলন বা সহিংসতা ঘটায়। এই ধরনের প্রতিক্রিয়াই প্রতিবিপ্লব, যা মূলত বিপ্লবের বিরোধী শক্তির পুনরুত্থানের প্রচেষ্টা হিসেবে ঘটে।
আ’লীগ শাসনামলে তৌহিদী জনতার অবস্থানও ইতিহাসে পরিচিত। ২০১৩ সালে তারা সরকারের কাছে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নিজেদের উপর হওয়া নির্যাতন বন্ধের দাবি করেছিল। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে কাবা শরীফের বিকৃত ছবি শেয়ারকারীর শাস্তি দাবি করে বিক্ষোভ ও পদযাত্রা চালায়। সেই বছরের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত ভাস্কর্য (যার সাথে গ্রিক পৌত্তলিক ধর্মের ন্যায়বিচারের দেবী থেমিসের সাদৃশ্য ছিল) অপসারণের দাবী জানায় তারা এবং পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সেটি অপসারণ করা হয়।
২০১৯ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু যুবকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে তারা, যেখানে পুলিশি হামলার ঘটনা ঘটে। তৌহিদী জনতার উপর পুলিশি হামলার ব্যবস্থা না নিলে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ শাপলা চত্বরে দখলের হুমকি প্রদর্শন করে। ২০২০ সালে ধোলাইরপাড় চত্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে তারা এবং শাপলা চত্বরে আবার বিক্ষোভের হুমকি প্রদর্শন করে। ২০২১ সালে কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কুরআন পাওয়ার ঘটনা ও বান্দরবানে হরিমন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলার মাধ্যমে তারা সহিংসতার ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখায়।
২০২৪ সালে চট্টগ্রামে অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরীর অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান করে তারা এবং সিলেটে শাহ সুফি আবদুল কাইউম চিশতিয়ার মাজারে হামলা করে, মহতি সাধুসঙ্গ ও লালন মেলা বন্ধ করার জন্য বিক্ষোভের মাধ্যমে তারা আবারও সক্রিয় হয়।
ইতিহাস দেখায়, নুরাল পাগলার লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া ঘটনার ক্ষেত্রে মূলত ধর্মান্ধতা, উগ্রতা এবং সামাজিক উত্তেজনা কাজ করছে, যা ব্যক্তি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়ার ফল। এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন বা ক্ষমতাচ্যুত শ্রেণির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা—যা প্রতিবিপ্লবের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত—এর সঙ্গে প্রমাণিতভাবে সম্পর্কিত নয়।
বাস্তবতা হলো, নুরাল পাগলাকে যে বিচার বা শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা কোনো ন্যায় বা আইনের প্রমাণের ওপর নয়; বরং সামাজিক উত্তেজনা ও ধর্মান্ধতার উদ্দীপনায় জন্মানো বর্বরতা—যেখানে প্রকাশ পাচ্ছে মব জাস্টিসের ঘৃণ্য চেহারা।
সাধারণ মানুষ বা উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী আইনকে পাশ কাটিয়ে নিজের হাতে বিচার নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় মানবিক নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নিয়মকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার যথাযথভাবে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে; নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার বা দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেখা গেছে চরম অপ্রতুলতা। এমনকি দেখা যায়, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেকক্ষেত্রে মব জাস্টিসের সঙ্গে সংহতি বা সমর্থন দেখিয়েছে, যা রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, সমাজে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি জনগণের আস্থাকে ধ্বংস করছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি সমাজে ভয়, বিভাজন এবং উগ্রতা ছড়ানোর একটি পথ তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে আরও অনিয়ন্ত্রিত ও হিংসাত্মক কার্যকলাপকে উস্কে দিতে পারে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন