https://www.prothomalony.com/

14441

bangladesh

বাংলাদেশ

বন্ধ ৩৫৩টি কারখানা, লক্ষাধিক বেকার : অর্থনীতি, সমাজ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৫ ০৬:০৫

বাংলাদেশের শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প, দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভিত্তি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। এই খাত গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস, নারী শ্রমের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অসাধারণ অবদান রেখেছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি এবং আরও প্রায় দুই কোটি মানুষ পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। অথচ সম্প্রতি প্রকাশিত দৈনিক কালের কণ্ঠের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক অশনিসংকেতপূর্ণ চিত্র—মাত্র এক বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে মোট ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে সাভারে, যেখানে ২১৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, এর মধ্যে ১২২টি স্থায়ীভাবে এবং ৯২টি অস্থায়ীভাবে। প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক এখানে কাজ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ছেইন অ্যাপারেলস, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন ও সাফওয়ান আউটারওয়্যারের মতো বড় কারখানাও রয়েছে। গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৭৩ হাজারেরও বেশি শ্রমিক বেকার হয়েছেন, যেখানে বেক্সিমকো গ্রুপের ১৩টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামে ২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, ফলে ১০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন। এই অঞ্চলে ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৬০টি তৈরি পোশাক কারখানা ও ১৫৬টি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে ২৬টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে ৫,৩৪২ জন বেকার হয়েছেন, আর নরসিংদীতে ২০টি ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে ৫০০ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।

এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, ঋণ পুনঃতফসিলে কড়াকড়ি এবং এলসি খোলায় জটিলতা ও ডলার সংকট বড় ভূমিকা রেখেছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ঘাটতি, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ ও লোডশেডিং এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ফলে। বাজার ও কার্যাদেশে মন্দা এসেছে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার কারণে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক জটিলতা, শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও শিল্পাঞ্চলের অপর্যাপ্ত অবকাঠামো।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারের ওপর বাংলাদেশের অতিনির্ভরতা বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন, GSP সুবিধা পুনর্বহাল না হওয়া এবং কঠোর বাণিজ্য শর্তাবলী বাংলাদেশের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। শুল্ক সুবিধা না পেলে পণ্যের দাম বাড়বে, ফলে ক্রেতারা সস্তা বিকল্পে ঝুঁকবে, যা কার্যাদেশ কমিয়ে দেবে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। তাই সরকারের উচিত যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রধান বাজারের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করা।

কারখানা বন্ধের প্রভাব অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা—তিন দিকেই মারাত্মক। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ পোশাক খাত থেকে আসে। এত বড় সংখ্যক কারখানা বন্ধ হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাবে, রিজার্ভ সংকট তীব্র হবে এবং নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। সামাজিকভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে, দরিদ্রতা বাড়বে, শিশুদের স্কুল ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দেবে এবং শহর থেকে গ্রামে ফেরার ফলে গ্রামীণ বেকারত্ব ও সামাজিক চাপ বাড়বে। পারিবারিক অশান্তি, মানসিক অবসাদ ও সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। নিরাপত্তার দিক থেকেও ঝুঁকি রয়েছে—বেকার যুবকদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং শ্রমিক অসন্তোষ থেকে শিল্পাঞ্চল ও শহরে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। শিল্পখাতের জন্য স্বল্পসুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, ঋণ পুনঃতফসিলে নমনীয় নীতি ও ডলার সংকট মোকাবিলায় রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে ফেরানোর জন্য প্রণোদনা দেওয়া দরকার। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভর্তুকি দিতে হবে। রপ্তানি বাজার বৈচিত্র আনতে ইউরোপ–আমেরিকার বাইরে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে এবং বাণিজ্য চুক্তি ও কূটনৈতিক প্রচারণা জোরদার করতে হবে। বেকার শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শ্রম অধিকার নিশ্চয়তা অপরিহার্য।

শিল্প দেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। এই হৃদপিণ্ড দুর্বল হয়ে গেলে এর প্রভাব পড়বে শুধু অর্থনীতিতে নয়—সমাজ, রাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও। তাই শিল্প বন্ধ হওয়াকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এখনই বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। শিল্পকে বাঁচানো মানে কর্মসংস্থান রক্ষা, রপ্তানি শক্তিশালী করা এবং সমগ্র জাতিকে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নেওয়া।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন