https://www.prothomalony.com/

14264

opinion

অভিমত

পতনের পর আওয়ামী লীগ—হারিয়ে যাবে, না ফিরবে আবার?

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৫ ০১:৫৯

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বাংলাদেশে ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্র ও জনতার অভ্যুত্থানে পতনের মুখে পড়ে। এই পতনের পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানারকম ভবিষ্যদ্বাণী ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, আওয়ামী লীগ আর কখনোই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। কেউ কেউ বলছেন, অন্তত ২০ বছর আওয়ামী লীগের জন্য পথ বন্ধ। আবার কেউ তুলনা করছেন পাকিস্তানের মুসলিম লীগের সঙ্গে—এক সময় রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি, পরবর্তীকালে ইতিহাসের পাতায় বিলীন।

কিন্তু সত্যিই কি আওয়ামী লীগ হারিয়ে যাবে? নাকি রাজনীতির মাঠে আবারও শক্তিশালীভাবে ফিরে আসবে? এ নিয়ে আজকের লেখা :

রাজনীতি, আমার চোখে:

রাজনীতি আমার কাছে কেবল সংবাদপত্রের হেডলাইন নয়। একসময় সাপ্তাহিক "এখন" এবং "বিচিত্রা"-তে রাজনীতি নিয়ে নানা বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন লিখতাম। সেই সময় থেকে রাজনীতির ওঠানামা, দল ভাঙা-গড়ার বাস্তবতা, আদর্শচ্যুতি আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব—সবই আমার দেখা। তাই যখন ৫ আগস্টের পর অনেকে বললেন, “আওয়ামী লীগের আর ফেরার সুযোগ নেই,” তখন আমি তাদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম। যুক্তি দিয়েছিলাম—এই দেশেই তো দলটি ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও ফিরে এসেছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। সেই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শুধু একজন রাষ্ট্রনেতা নয়, এক আদর্শকেও হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ হয় নিষ্ক্রিয়, নেতৃত্ব হয় কোণঠাসা। দীর্ঘ ২১ বছর, দলটি রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে থাকে। কিন্তু তারপরও ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন—দল গঠনের ঠিক ৪৭ বছর পরে—শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই ফিরে আসা ছিল সংগঠিত প্রস্তুতির ফসল, সময়ের দাবি এবং মানুষের প্রত্যাশার জবাব।

বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন

বর্তমান বাস্তবতা ১৯৭৫ সালের চেয়ে অনেক ভিন্ন। এখন আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি বিস্তৃত সংগঠন, যার শেকড় তৃণমূলে। যদি বর্তমান সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ না করে, তাহলে আওয়ামী লীগ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই রাজনীতির মাঠে দৃশ্যমান হয়ে উঠবে—হয়তো প্রথমে বিরোধী দল হিসেবে, পরে আবারও ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে। আমার বিশ্লেষণ বলছে—আওয়ামী লীগ হয়তো পরবর্তী নির্বাচনে (২০২৬/২০২৭) অংশ নিতে পারবে না, তবে তার পরের নির্বাচনেই তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

কেন মনে হয়, তারা ফিরবে :

১. সাংগঠনিক ভিত্তি: একটানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে আর্থিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে।
২. তৃণমূল সংযোগ: স্থানীয় পর্যায়ে দলটির নেতাকর্মীরা এখনও সক্রিয় এবং জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত।
৩. বিএনপি উদাহরণ : বিএনপি ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি—তাহলে আওয়ামী লীগ আরও বড় রূপে ফিরে আসবে, এটাই স্বাভাবিক।

সম্ভাব্য সময়রেখা

যদি চলতি বছরের শেষে কিংবা আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়কালে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে ২০২৬–২০২৭ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারা। ২০৩১–২০৩২ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য সংসদীয় আসন পাওয়া এবং পরবর্তী নির্বাচনে ২০৩৬–২০৩৭ সরকার গঠন করার সমূহ সম্ভাবনা আমি দেখতে পাচ্ছি।

আমার সাথে হয়তো অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন যার যার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে। কিন্তু সময় এবং পরিসংখ্যান বলে দেবে দেশের রাজনীতির গতি পথ। আওয়ামী লীগ আজ যে জায়গায় আছে, তা নিছক কোনো জনপ্রিয়তার ফল নয়; এটি সময়, সংগঠন ও ইতিহাসের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারার ফল। কারণ দশ কিংবা পনেরো বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগ রাস্তায় কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারবে—তা নিশ্চয় গত আগস্টের পরপর কেউ চিন্তাই করেননি। কিন্তু চলতি মাসে গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ যে প্রতিরোধ কিংবা লড়াই চালিয়ে গেছে, তাতে করে অন্যান্য স্থানে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভয় কিংবা ঝিমিয়ে থাকা ভাব কাটাতে অবশ্যই নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই আজকের পতন মানেই চিরতরে বিদায় নয়।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন