https://www.prothomalony.com/

18260

opinion

অভিমত

এআই নিয়ে সহযোগিতা পারমাণবিক আলোচনার চেয়েও কঠিন

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:৪৮

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রযুক্তির গতি আর রাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রণক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা স্নায়ুযুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আলোচনার চেয়েও কঠিন হতে পারে।

কথাটি শুধু একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তার আশঙ্কা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে বর্তমান বিশ্বের একটি গভীর বাস্তবতা ধরা পড়ে। পারমাণবিক অস্ত্র ছিল রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত প্রযুক্তি। এআই তা নয়। এর গবেষণা, উন্নয়ন ও ব্যবহার রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানি, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, ছোট স্টার্টআপ এবং ক্রমেই ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের হাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পারমাণবিক অস্ত্রের মতো এআইকে কেবল কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি করে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি জটিল।

স্নায়ুযুদ্ধের পারমাণবিক বাস্তবতায় বিপদের উৎস ছিল তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। কোন রাষ্ট্রের কাছে কত ক্ষেপণাস্ত্র, কত পারমাণবিক ওয়ারহেড, কোথায় সামরিক স্থাপনা—এসবের ওপর নজরদারি, যাচাই ও চুক্তির কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএর মতো প্রতিষ্ঠানও পারমাণবিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।

এআইয়ের ক্ষেত্রে সমস্যাটি অনেক বেশি তরল।

আজ যে মডেলটি একটি নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, কয়েক মাস পর সেটিই হয়তো আরও শক্তিশালী কোনো সংস্করণে পরিণত হবে। সফটওয়্যার সীমান্ত মানে না। একটি দেশে তৈরি মডেল অন্য দেশে ব্যবহার করা যায়। ওপেন-সোর্স প্রযুক্তি আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে কোনো একটি রাষ্ট্র নিজেদের সীমারেখার ভেতরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও প্রযুক্তির বিস্তার পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়।

আর এখানেই পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এআই নিয়ন্ত্রণের মৌলিক পার্থক্য। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে বিপুল অবকাঠামো, বিশেষ উপকরণ ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা প্রয়োজন। কিন্তু উন্নত এআই ব্যবহারের সক্ষমতা ক্রমেই কম খরচে এবং বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে যাচ্ছে। এর সুফল যেমন বিশাল, ঝুঁকিও তেমনি বহুমাত্রিক।

এআই চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, বিজ্ঞান, শিল্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিল গেটস নিজেও এআইকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষির মতো ক্ষেত্রে ইতিবাচক কাজে ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন।
কিন্তু একই প্রযুক্তি ভুল হাতে গেলে ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। সাইবার আক্রমণ, প্রতারণা, ভুয়া তথ্য, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি, সামরিক প্রয়োগ এবং অন্যান্য ক্ষতিকর কাজে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গেটসের সাম্প্রতিক সতর্কতার মূল কথাও এখানেই—প্রযুক্তিকে থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং এর ব্যবহারের চারপাশে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা।

কিন্তু কে সেই নিয়ম তৈরি করবে? এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একই সঙ্গে সহযোগী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী। উন্নত এআই অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি দেশ যদি মনে করে অন্য দেশ নিয়ন্ত্রণের নামে তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থামিয়ে দিতে চাইছে, তাহলে সহযোগিতার জায়গায় প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো সমঝোতাও যথেষ্ট হবে না। এআইয়ের প্রভাব সারা বিশ্বের ওপর। ইউরোপ, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোরও এই আলোচনায় অংশগ্রহণের অধিকার ও স্বার্থ রয়েছে।

এই বাস্তবতাই জাতিসংঘকে এআই নিয়ে একটি বৈশ্বিক সংলাপের দিকে নিয়ে গেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জেনেভায় অনুষ্ঠিত প্রথম Global Dialogue on AI Governance-এ জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, একাডেমিয়া ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। জাতিসংঘ বলছে, কোনো একক দেশ, কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান একা এআই পরিচালনা করতে পারবে না; আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই। এআই নিয়ন্ত্রণকে শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে সমাধান পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, মানবাধিকার, নিরাপত্তা, শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রশ্ন।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—নিয়ন্ত্রণ যেন উদ্ভাবনের শত্রু না হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করতে পারে; আবার সম্পূর্ণ স্ব-নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গেটসও বলেছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্ব-নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয় এবং সরকার ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও নিরাপত্তা ও নজরদারির কাঠামো তৈরিতে অংশ নিতে হবে।

তাই সামনে সম্ভবত যে মডেলটি প্রয়োজন, সেটি কোনো একক বৈশ্বিক আইন নয়। বরং প্রয়োজন হতে পারে কয়েকটি স্তরের সমন্বিত ব্যবস্থা—আন্তর্জাতিক নীতিমালা, জাতীয় আইন, প্রযুক্তি কোম্পানির বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা মান, স্বাধীন পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, তথ্য বিনিময় এবং গুরুতর ঝুঁকির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত পারমাণবিক যুগ থেকেই আসতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরের প্রতি গভীর অবিশ্বাস সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথ খুঁজেছিল। কারণ তারা বুঝেছিল, কিছু ঝুঁকি এমন যে প্রতিযোগিতার মধ্যেও নিয়ম দরকার। এআইয়ের ক্ষেত্রেও সেই উপলব্ধি জরুরি।

প্রশ্নটি কে এআইয়ে প্রথম হবে—শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তিগত দৌড় চলার মধ্যেও পৃথিবী কীভাবে এমন কিছু ন্যূনতম নিয়মে একমত হবে, যাতে অগ্রগতি মানবকল্যাণের হাতিয়ার থাকে এবং বিপজ্জনক ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।

জাতিসংঘের বর্তমান উদ্যোগ দেখাচ্ছে যে সেই আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের কার্যালয়ও বলছে, এআইয়ের সুযোগ ও ঝুঁকি কোনো দেশ একা মোকাবিলা করতে পারবে না। বিল গেটসের সতর্কবার্তার তাৎপর্য তাই এআই থামানোর আহ্বানে নয়। বরং তার আসল তাৎপর্য হলো— প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকেও তত দ্রুত পরিণত হতে হবে।

পারমাণবিক যুগে মানবজাতি সহযোগিতা করতে বাধ্য হয়েছিল অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতার কারণে। এআই যুগে হয়তো আমাদের একই কাজ করতে হবে এমন একটি প্রযুক্তির কারণে, যার সম্ভাবনা অস্ত্রের চেয়ে অনেক বিস্তৃত—এবং যার নিয়ন্ত্রণের সীমারেখাও অনেক বেশি অস্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত এআই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি আমরা এআইয়ের বিকাশকে মানবিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করতে পারব—প্রশ্নটি আসলে সেখানেই।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন