https://www.prothomalony.com/

18263

opinion

অভিমত

কেনেডি থেকে ভিঞ্চি — এক উড়ালের গল্প

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:২৩

আমি ইতিহাসের ছাত্রী। পৃথিবীর ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস আমায় খুব টানে। আজ রওনা হয়েছি এক অবাক করা দেশের উদ্দেশে। অনেক গল্প আছে দেশটিকে ঘিরে। শহরে-বন্দরে ঘুরতে ঘুরতে কিংবা দেখতে দেখতে সেই গল্পগুলো, গল্পের ছবিগুলো সবার সাথে শেয়ার করব। যাতে আপনিও একঝলক দেখে নিতে পারেন দেশটি আসলে কেমন। গল্পের মানুষগুলো আদতে কেমন ছিল।

২ আগস্ট, ২০২৬ সাল। যাত্রা শুরুর দিন। প্রথম গন্তব্য কনি আইল্যান্ড থেকে জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। যানজট না থাকলে আমার বাসা থেকে আধা ঘণ্টার পথ। অমিত উবার কল করে দিয়েছে। আমাদের উবারে তুলে, বিদায় জানিয়ে, তবেই সে নিজের বাসায় ফিরে গেছে। আমাদের ইরানি উবার ড্রাইভার আমাদের নিয়ে মোটামুটি অনটাইমেই বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলেন। যাত্রাপথে ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল ত্রিমুখী লড়াই নিয়ে হালকাপাতলা আলাপ হলো তার সাথে। ইরান, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মধ্যকার এই ত্রিমুখী সংঘাত যে একটি কৌশলগত খেলা, তা সবার কাছেই এখন ওপেন সিক্রেট। বাহ্যিকভাবে আমেরিকা ও ইসরায়েল একপক্ষে থাকলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ আলাদা। বাকস্বাধীনতার দেশেও আমরা যেভাবে বাকরুদ্ধ হয়ে আছি, ইরানি চালকের সাথে আলোচনায় সেই বিষয়টি আমাদের উভয়কেই বিব্রত করে তুলেছিল।

যাইহোক, ভেতরে গিয়ে আমরা আইটিএ’র প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এরিয়ার লাইনে দাঁড়ালাম। সেখানে যাত্রীদের বুকিং, লাগেজ ওয়েটিং, ট্যাগিং এবং বেল্টে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

বাবুলের ক্যারিঅনের ওজন যথাযথ থাকলেও আমারটা বেশ ভারী ছিল। আমি শঙ্কিত ছিলাম, যাতে আমার ক্যারিঅনের ওপর চেক-ইন-অফিসারের বদনজর না লেগে যায়। এদিকে, পিঠের ওপরে যে ব্যাকপ্যাকটা বহন করছি, সেটিও মোটামুটি প্যাকড। যাকে বলে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থা।

আমাদের পালা আসতেই চেক-ইন-অফিসার মেলিসার দিকে আমাদের পাসপোর্ট দুটো এগিয়ে দিলাম। যতক্ষণ তিনি তার সামনের কম্পিউটারে কাজ করছেন, আমি নিরীহ মুখে দাঁড়িয়ে আমার সম্ভাব্য দুর্গতির কথা ভাবছি। বুকিং শেষ করে, বোর্ডিং পাস প্রিন্ট করে, তিনি আমার ক্যারিঅনের দিকে নজর দিলেন। ক্যারিঅনকে কনভেয়র বেল্ট স্কেলের ওপর তুলে দিতে নির্দেশ দিয়ে তিনি স্ক্রিনে চোখ রাখলেন। আমিও ‘আল্লাহ ভরসা’ বলে স্কেলের ওপর লাগেজ রাখলাম। আড়চোখে স্ক্রিন দেখলাম। নির্দেশকের কাঁটা ওভারওয়েট নির্দেশ না করলেও গর্ভবতী নারীর মতো ক্যারিঅনটা তার ঢাউস পেট নিয়ে ড্যাব ড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই অসহায় চাহনি আমাকে যারপরনাই বিব্রত করতে লাগল।

সুন্দরী চেক-ইন অফিসার মুখ তুলতেই আমি তার দিকে তাকিয়ে মধুরতর হাসলাম। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে তিনিও গালে টোল ফেলে হাসলেন। তারপর দরাজ গলায় বললেন, “তোমার ক্যারি-অনটা ফ্লাইটের ওভারহেড বিনে ঢোকাতে তুমি হিমশিম খাবে। তাছাড়া আমাদের প্যাকড ফ্লাইটে তুমি হয়তো পর্যাপ্ত জায়গাও পাবে না। তুমি কি চাও আমি তোমার লাগেজটা চেক-ইন করে দিই?”

আমি নিরীহ কণ্ঠে জানতে চাইলাম, আমাকে কি এর জন্য পে করতে হবে?

মেলিসা মিষ্টি হেসে বললেন, “না, পে করতে হবে না। ফ্রি অফ কস্ট।”

আমার বুক থেকে বিশাল পাথর নেমে গেল। আহা কী শান্তি! বললাম, ‘তথাস্তু। ইউ আর সো কাইন্ড। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ মেলিসা।’

তারপর বাবুলের পালা। তার লাগেজে কোনো ঘাপলা নেই। তবুও মিস মেলিসা বাবুলের ক্যারিঅনটাও চেকিংয়ের প্রস্তাব দিয়ে বললেন, “এটাও চেকিং করতে পারো। লাগেজ হাতে না থাকলে তোমরা রিলাক্সভাবে ফ্লাইটে উঠতে পারবে।”

সে আমাদের ক্যারিঅনের গলায় ট্যাগ লাগিয়ে দিল। ব্যাগেজ অ্যাকসেপ্টেন্স প্রক্রিয়া শেষ হতেই চেকড ব্যাগেজ প্রসেসিং শুরু হলো। স্যুটকেস দুটো ব্যাগেজ ড্রপ কনভেয়র বেল্টের ওপর উঠে আমাদের দিকে যেন চোখ টিপে দিল। তারপর নাচতে নাচতে ভেতরের মেক-আপ-এরিয়ায় চলে গেল। আমরা যখন ফ্লাইটের সিটে বসে রোমের দিকে যাব, তারাও প্লেনের পেটে বসে, অন্য লাগেজদের সাথে সুখ-দুঃখের গল্প করতে করতে রোম পৌঁছে যাবে।

নিউইয়র্ক থেকে রোম। আমরা যাচ্ছি, আইটিএ এয়ারওয়েজের ননস্টপ ফ্লাইটে। যথাসময়ে বোর্ডিং শুরু হতেই ফ্লাইটে উঠে বসলাম। সৌভাগ্যবশত জানালার পাশের কাঙ্ক্ষিত সিটটাই আমাকে বরাদ্দ করা হয়েছিল। মনে মনে অমিতকে ধন্যবাদ দিলাম। সে যখনই প্লেনের টিকিট কাটে, আমার জন্য জানালার পাশে সিট নেয়ার চেষ্টা করে।

বিকেল ৪ টা ৪৫ মিনিট। ‘ইতালিয়া ত্রাসপোর্তো আ-এরে-ও’ তার নির্ধারিত সময়ের খানিকটা পরে জেএফকে ছাড়ল। প্লেন ছাড়ার সমস্ত প্রস্তুতি শেষ হতেই ককপিট থেকে গমগমে কণ্ঠে পাইলটের অ্যানাউন্সমেন্ট ভেসে এলো, 'সিনিওরে এ সিনিওরি, বেনভেনুতি আ বোরদো...'। ইতালিয়ান না জানলেও ঘোষণাটা বুঝতে তেমন কষ্ট হলো না। 'বেনভেনুতি' শব্দটা বুকে লাগল — যেন কেউ অনেক দূর থেকে বলছে, “এসো। রোম তোমায় ডাকছে।”

এরপর এলো ইংরেজি অ্যানাউন্সমেন্ট। আট ঘণ্টা পঁচিশ মিনিটের ফ্লাইট। বাইরে এখন নিউইয়র্কের সন্ধ্যা। আমরা পরদিন সকাল সাতটায় টাইবার নদীর তীরের দেশ রোমে নামব।

ডিনার শেষ হতেই প্লেনের ভেতরের বড় আলোগুলো নিভে গেল। মাথার ওপরের আলোতে কিছুক্ষণ বই পড়ে, কিছুক্ষণ ফোন স্ক্রল করতে করতে একসময় চোখ লেগে এলো। এভাবেই ঘুমে-জাগরণে আমার আট ঘণ্টার আকাশযাত্রা শেষ হলো। ক্রাফট মাটি স্পর্শ করতেই এয়ারক্রুরা আমাদের ইতালিতে স্বাগত জানালেন। নতুন সকাল, নতুন দেশে!

গেট খুলতেই আমরা ক্রাফট থেকে নামলাম। ছুটলাম...

অভিমত থেকে আরো পড়ুন