https://www.prothomalony.com/
14027
opinion
গ্রীষ্ম মানেই উত্তর আমেরিকার শহরগুলোতে প্রাণের জোয়ার। বরফে ঢাকা লম্বা শীতের পর মানুষ যেন হঠাৎই মুক্ত আকাশের নিচে ফিরে আসে। শিশুরা স্কুল ছুটিতে, বড়রা ছুটির পরিকল্পনায়। কেউ ছুটে যান পাহাড়ের পথে, কেউ বেছে নেন সমুদ্রতীরের প্রশান্তি। শহরের পার্কগুলোতে দেখা যায় পিকনিকের উৎসব, ব্যাকইয়ার্ডে আয়োজন হয় বিবিকিউয়ের। বলা যায়, এই সময়টা হলো উত্তরের জীবনের এক আনন্দময় পুনর্জন্ম।
তবে এ আনন্দের মধ্যেও লুকিয়ে আছে কিছু ঝুঁকি, কিছু অবহেলাজনিত দুর্ঘটনার আশঙ্কা। গ্রীষ্মের আউটডোর জীবন যেমন প্রাণবন্ত, তেমনি কিছুটা খামখেয়ালিও হয়ে ওঠে অনেকের। ফলত, এই সময়টায় বাড়ে হিট স্ট্রোক, পানিতে ডুবে যাওয়া, ত্বক পুড়ে যাওয়া, গাড়ি দুর্ঘটনা, বনে আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনার হার। কাজেই, সচেতন থাকা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জরুরি দায়িত্ব।
প্রথমেই বলা যাক তাপদাহ বা হিট ওয়েভ নিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অংশে তাপমাত্রা বেড়েছে মারাত্মকভাবে। ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা, টেক্সাস কিংবা এমনকি কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার মতো অঞ্চলেও দেখা গেছে প্রাণঘাতী হিট ডোমের প্রভাব। অনেক সময় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, যা শীতপ্রধান এই অঞ্চলের জন্য অস্বাভাবিক। যারা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকেন বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিক, বয়স্ক নাগরিক, শিশু ও গর্ভবতী নারীরা তাদের জন্য হিট স্ট্রোক হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী।
তাই হিট প্রটেকশন প্ল্যান থাকা জরুরি। দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা, সরাসরি রোদে না গিয়ে ছায়ায় থাকার চেষ্টা করা, হালকা রঙের ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা, প্রয়োজনে ছাতা বা হ্যাট ব্যবহার করা উচিত। যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাদেরও গরমের সময় রুটিন পরিবর্তন করে ভোরবেলা বা সন্ধ্যার সময় ব্যায়াম করা উত্তম।
এরপর আসে পানিতে দুর্ঘটনার বিষয়টি। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে পরিবারগুলো প্রায়শই সি বিচ, লেক, নদী বা সুইমিং পুলে যান। কিন্তু প্রতি বছরই এই সব জায়গায় ডুবে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিশুরা এ সময় ঝুঁকিতে থাকে বেশি। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ডুবে মৃত্যুর হার গ্রীষ্মে সবচেয়ে বেশি হয়।
তাই কিছু নিরাপত্তা বিধি অতি জরুরি। যেমন: শিশুরা যেন কখনোই একা পানির ধারে না যায়; লাইফ জ্যাকেট ছাড়া লেকে বা নদীতে নামা অনুচিত; প্রাপ্তবয়স্কদের উচিত কমপক্ষে প্রাথমিক সাঁতার জ্ঞান রাখা এবং সিপিআর শেখা; পুলে কিংবা লেকে নিরাপত্তা চিহ্ন মেনে চলা উচিত।
তৃতীয়ত, গ্রীষ্মে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির তীব্রতা বেড়ে যায়। সানবার্ন, সানস্ট্রোক, এমনকি স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই বাইরে বের হওয়ার সময় কমপক্ষে এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। যারা পাহাড়ে বা উঁচু অঞ্চলে ঘুরতে যান, তাদের জন্য এ সতর্কতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বনভূমিতে ক্যাম্পিং, হাইকিং বা আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা গ্রীষ্মের জনপ্রিয় কার্যক্রম। তবে অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিসংযোগ থেকে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ দাবানল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, কানাডার আলবার্টা বা ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় প্রতি গ্রীষ্মেই লাখ লাখ হেক্টর বন পুড়ে যায়। এর ফলে পরিবেশগত বিপর্যয় যেমন হয়, তেমনি হাজারো মানুষ গৃহহীনও হন। তাই জঙ্গলে আগুন জ্বালানোর আগে স্থানীয় নিয়ম-কানুন জানা ও তা মেনে চলা নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
আরেকটি বিষয়, গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের সময় অনেকেই দীর্ঘ ড্রাইভে যান। এই সময়ে ক্লান্তি, ঘুম ঘুম ভাব, হাইওয়েতে অতিরিক্ত গতি কিংবা ফোকাসের অভাবে দুর্ঘটনা ঘটে। কাজেই লং ড্রাইভের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া, নির্দিষ্ট বিরতিতে গাড়ি থামিয়ে বিশ্রাম করা, এবং কখনোই ড্রিংক করে বা ঘুম না পূর্ণ করে গাড়ি না চালানো উচিত।
এই নিরাপত্তাবোধ শুধু নিজের জন্য নয়, এটি পরিবার, প্রতিবেশী ও বৃহত্তর সমাজের জন্যও। গ্রীষ্মের এই আনন্দের সময়টুকু যেন একজনের অবহেলায় অন্যের জন্য কান্নার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় সেদিকে খেয়াল রাখাটাই সভ্য নাগরিকের পরিচয়।
সবশেষে, মনে রাখতে হবে গ্রীষ্মের সূর্য যেমন আমাদের আলো দেয়, তেমনি অসতর্কতা হলে পুড়িয়ে দিতে পারে জীবনের স্বাভাবিকতা। অতএব আনন্দ করো, ঘুরে বেড়াও, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করো। তবে দায়িত্বের সঙ্গে। যেন এ গ্রীষ্ম শেষে তোমার স্মৃতি হয়ে থাকে একরাশ রোদেলা দিন, কোনো ম্লানতা নয়।
নিরাপদ গ্রীষ্ম কামনা করি।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন