https://www.prothomalony.com/
13912
opinion
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৫ ০০:১৭
মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছে—তারা দেশটির বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৩৬ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে, যারা ‘আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের আদলে’ একটি সেল গঠনের চেষ্টা করছিল। বলা হয়েছে, এরা আইএস মতাদর্শে অনুপ্রাণিত, নতুন সদস্য সংগ্রহ ও চাঁদা সংগ্রহে লিপ্ত, এবং ভবিষ্যতে সহিংস তৎপরতা চালানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। এই তথ্য শুধু আমাদের বিস্মিত করে না, গভীর উদ্বেগও তৈরি করে।
প্রথমেই মনে রাখা দরকার—মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখের কাছাকাছি, কারও মনে এ সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি হতে পারে। এসব মানুষের অধিকাংশই দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে পরিবার চালান, দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যোগান দেন। কিন্তু এই বিশাল জনসংখ্যার ভেতর থেকে ৩৬ জন যদি সত্যিই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত বিপথগামিতার বিষয় নয়—বরং প্রবাসী সমাজ ও জাতীয় ভাবমূর্তির ওপর এক সরাসরি আঘাত।
গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি বলেছেন, তারা দেশটিকে কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের ঘাঁটি হতে দেবেন না। সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এখানেই আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্ন জেগে ওঠে—এই ৩৬ জন কেন, কীভাবে, এবং কোন পরিস্থিতিতে এমন চিন্তাভাবনার দিকে ধাবিত হলো? এটি কি শুধুই ধর্মীয় উগ্রতা, না কি হতাশা, বঞ্চনা, কিংবা পরিচয়ের সংকট?
সাধারণত যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া, দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তায় প্রবাসে থাকেন—তারা চরমপন্থী চিন্তার জন্য সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠেন। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ধর্মীয় বক্তৃতার মাধ্যমে এসব মানুষকে চিহ্নিত করে। হতাশা, পিছুটান, এবং ‘নতুন পরিচয়’ খোঁজার এক মানসিক দুর্বলতায় পড়ে কেউ কেউ এমন মরণফাঁদে পা রাখেন। এই মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গে আছে রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি।
মালয়েশিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষত ২০১৫ সালের Prevention of Terrorism Act (POTA), সন্দেহভাজন কাউকে বিচার ছাড়াই দুই বছর পর্যন্ত আটক রাখার ক্ষমতা রাখে। এই আইন অনেক সময় নিরীহ মানুষকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। তবে এবার মালয়েশিয়া দাবি করছে, গোয়েন্দা তথ্য ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েই তারা গ্রেপ্তার করেছে। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পনেরো জনকে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে, আর বাকিদের তদন্ত চলছে। বিষয়টি তাই একপাশে কঠোর নিরাপত্তার বার্তা দেয়, অন্যদিকে অভিবাসী বাংলাদেশিদের আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
এই ঘটনার আলোকপাত করে আমাদের আরও বড় প্রশ্ন তোলা উচিত—বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে কী ধরনের মূল্যবোধ কাজ করছে? রাষ্ট্র, পরিবার ও প্রবাসী সংগঠনগুলোর কি কোনো দায় নেই এইসব মানুষদের কাছে পৌঁছানোর? সন্ত্রাসবাদ শুধু ধর্মীয় উগ্রতার বিষয় নয়, বরং এটি এক সামাজিক, মানসিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতার প্রকাশ। তাই এর প্রতিকারও হতে হবে বহুমাত্রিক।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে, মালয়েশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা এবং এই ঘটনার পূর্ণ তদন্তে সহায়তা করা। একই সঙ্গে, দেশের অভ্যন্তরে ও প্রবাসে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করতে হবে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জঙ্গি প্রচারণা, চাঁদাবাজি কিংবা সন্দেহজনক ধর্মীয় জালিয়াতি বিষয়ে প্রবাসীদের সতর্ক করে দিতে হবে। অভিবাসী কল্যাণ মিশনগুলোকে হতে হবে আরও সক্রিয়।
মালয়েশিয়া শুধু বাংলাদেশিদের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের কর্মস্থল। এর মতো দেশে যদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের এমন ঘটনায় জড়িয়ে পড়া বাড়তে থাকে, তাহলে এর ভবিষ্যৎ প্রভাব হতে পারে আরও ভয়াবহ। কাজের অনুমতি পাওয়া কঠিন হবে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ঝুঁকিতে পড়বে, আর সাধারণ মানুষ—যারা দিনরাত শ্রম দিচ্ছে—তাদের ওপরও চোখ রাঙানি বাড়বে।
এই ঘটনার দায় শুধু ওই ৩৬ জনের নয়। এটি একটি বৃহত্তর ব্যর্থতার দিকচিহ্ন। এটি আমাদের বলে দেয়—আমরা কোথাও ভুল করছি, কোথাও কিছু বাদ পড়ে যাচ্ছে। এখনই সময় রাষ্ট্র, প্রবাসী সমাজ, অভিভাবকগণ এবং সম্প্রদায় নেতাদের একত্রে বসে নতুন করে ভাবার—কীভাবে এই স্রোত ঠেকানো যায়।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অস্ত্র বা গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে হয় না। এর বিরুদ্ধে লড়াই হয় স্বচ্ছতা, সচেতনতা, এবং মূল্যবোধের ভিত্তিতে। আর সেই ভিত্তি তৈরি করতে হলে—প্রবাসে থাকা প্রতিটি বাংলাদেশির হৃদয়ে প্রোথিত করতে হবে একটি বোধ: “আমি শুধু নিজের জন্য নই, আমি দেশের প্রতিনিধিও।”
তবেই হয়তো, আমরা ভবিষ্যতে আর এমন খবর শুনতে চাইব না।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন